Skip to main content

Full text of "Asadharan"

See other formats







তিন টাক। 


মিত্রালয়, ১৭ নং শ্তামাচরণ দে ষাট হইতে গৌরীশঙ্কর ভটাচাধ্য কর্তৃক প্রকাশিত এবং মানসী 
প্রেস, ৭৩ নং মানিকতলা দ্ীট, 'কলিকাত। হইতে শত্তুনাথ বন্দ্যোপাধ্যাঘ কর্তৃক মুদ্রিত 


উৎসর্গ 


স্বনামখ্যাত বন্ধু 
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 
করকমলে 


র্‌ অসাধারণ 


ত্রিশ বত্রিশের বেশি হইবে না। মেয়েটির পরনে তালিলাগানো শাডী, কিন্ত 
ময়লা নয়_মুখণ্রী একসময় বেশ ভালোই ছিল বোঝ! যাষ, দেহ খুব সম্ভবত 
অনাহারে ও ম্যালেরিয়া শীর্ণ । 

মেয়েটি বারান্দার প্রান্তে ঈাড়াইয়া বলল--ও ডাত্ত!রবাবু-- 

সীতানাথ ডাক্তার উহাদের দিকে একটু তাচ্ছিলোর ভঙ্গিতে চাহিয়া! বলিলেন 
-কি চান? 

--বাবু, একে একটুখানি দেখতি হবে। 

সীতানাথ ডাক্তার বুঝিয়াছিলেন ইহাদের দ্বারা বিশেষ কোনে! অর্থাগমের 
আশা নাই- যত বড় কঠিন অন্থথই হউক না কেন। ছুভিঙ্গপীডিত চেহারা । 
পরনে তে৷ ওই কাপড় । মাথ৷ তৈলাভাবে রুক্ষ । রোগীর মধ্যে গণ্য করিয়া 
উৎফুল্ল হইবার কোনে কারণ নাই । 

তামাক টানিতে টানিতে বলিলেন-হরেচে কি? মেয়েটি বলিল- হবে 
আর কি। গুর জর ছাড়ে না আজ ছু'মাস। তার ওপর মেহ। শরীর 
একেবারে ভেঙে দিয়েচে। আমার উনি ছাডা আর কেউ নেই। আপনি দয়! 
করে দেখুন ।...বলিয়া মেঘেটি প্রা কাদিয়। ফেলিল। নীতানাথ ডাক্তার 
বলিলেন-_সবে এসে। এদিকে - 

পরে রোগী পরীক্ষা করিয়া বলিলে- হাঁ, দেখবো কি, এর মধ্যে অনেক 
রোগ । কর্দিন এমন হথেচে ? 

পুরুষটি এবার শ্ষীণন্থরে বলিল--তা৷ বাবু অনেক দিন। আমি আজ তিন- 
চার মাস ভূগচি। আর এই কাশি এ বিছুতি যাচ্ছে না 

মেয়েটি হাত তুলিয়৷ অধৈধ্যের স্থরে বলিল_ তুমি চুপ করো দিকিনি! খুব 
খ্যামোতা তোমার! আমার হাড় মাস জালিয়ে থেলে তুমি- তিন মাস ওর 
অস্থখ_ 

তাহার পর আমাদের দিকে ফিরিয়া বলিল-_ গুর কথা শোনবেন না। শুর 


অসাধারণ ৩ 


কি কিছুঠিক থাকে? নিজের দিকে শুর কোনো খেয়াল নেই_-এই শুনুন তবে 
আমার কাছে 

কথাটা শোনাইল এভাবের যেন লোকটি দার্শনিক কিংবা কবি, অথবা 
ব্হ্মদর্শী--সাংসারিক তুচ্ছ ব্ষিয়ে স্বভাবতই ইনি অনাসক্ত। বোধ হয় ঈর্ধ্যা- 
প্রণোদিত হইয়াই সীতানাথ ডাক্তার পুরুষটিকে জিজ্ঞাসা করিয়া বসিলেন-- 
তোমার গনোরিয়। হয়েচে কতদিন ? 

_-তা বাবু চার পাচ মাস হবে| সেবার যখন***মেয়েটি ঝঙ্কার দিয়! উঠিয়া 
বলিল তুমি তো। সব জানো কিনা! চুপ করো। না বাবু, ছু'বছর হয়ে গেল। 
আমার হাড মাস ভাজা করে খেলে ওই মিন্মে। কি জালায় যে পড়েচি আমি, 
মরণ হয় তো হাড় জুড়িয়ে যায় আমার । 

কাহার মরণ হইলে তাহার হাড় জুড়ায়, কথার ভাবে ঠিক ধরিতে পারিলাম না। 

সীতানাথ ডাক্তার বলিলেন -বাড়ী কোথায়? 

মেয়েটি বলিল-_বাড়ী এই ঝিটকিপোতায়। আমরা হাড়ি। 

--ও! বিটকিপোতা'য় হাড়ির বাস আছে নাকি? 

__ন] বাবুঃ দেশে দেশে ভেসে বেড়াচ্ছি এই ওনারে নিয়ে। বিয়ে করা 
সোয়ামী, ফেলতে তো পারিনে। আজ দুটি বছর উনি বিছেনেয় পড়ে । উঠতি 
হাটতি পারেন না । কত অস্থ্দ বিষুদ করলাম আমাদের দেশে ঘরে, যে য! বলে 
তাই করি, কিন্তু কিছুতেই সারাতি পারলাম না, দিন দিন যেন মানুষ উঠতি 
পারে নাঃ খেতি পারে না। তাই আজ বলি--ডাক্তার বাবুর কাছে নিয়ে যাই 
--একটু দেখুন আপনি ভাল করে, আমার আর কেউ নেই-- 

আমি এতক্ষণ বসিয়া বসিয়া দেখিতেছিলাম । এইবার বলিলাম---তোমার 
স্বামী কি কাজ করে? 

মেয়েটি ঝংকার দরিয়া বলিয়া উঠিল--কাজ ! ওরে আমার কাজের শিরোমণি 
রে! ও করবে কাজ? সেদিন পূবের স্থয্যু পশ্চিম পানে ওঠবে না? 


৪ অসাধারণ 


পুরুষটি লজ্জিতভাবে বলিল---না বাবু, কাজ আমি করিনে। সে ক্ষ্যামতা 
নেই তে করবো কি। ও-ই ধান ভেনে দাইগিরি করে সংসার চাঁলায়। তা 
এই বাজারে বড্ড কষ্ট হয়েচে বাবু। 

মেয়েটি বলিল- তুমি থামবে বাপু, না বকে যাবে? বাবু শুনুন তবে বলি। 
কষ্ট দুক্ষুর বার্ত। ও কি জানে । সংসারের কোন খোজ রাখে ও? 

কৃতজ্ঞতার আবেগ বোধ হয় অসংবরণীয্ব হইর। উঠিল পুরুষটির। সে পুনরায় 
নত্রন্থরে বলিল--তা যা বলে ও সে কথা সত্যি বটে। ও আমাকে জানতি গ্যায় 
না1। নিজি সব করবে । আমি তো খাটতি পারিনে-_ আমার এই ডান পাডা 
একটু খোঁড়া, হাটতি পারিনে-_-এই দেখুন বাবু এই পাডা-_ 

মেয়েটি আচল দিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে বলিল-_নাও, আর বাবুদের দমনে 
তোমার পা বার করতি হবে না-_ 

কিন্ত দেখিলাম মেয়েটির চোথ ছল ছল করিরা উঠিয়াছে। এই গনোরিযা- 
গ্রস্ত খোঁড়া অকর্মণ্য বৃদ্ধের প্রতি এতট। দবদ ওর । দেখিয়া বিস্মত হইলাম । 

সীতানাথ ভাক্তার বলিলেন- তুমি ধাইয়ের কাঁজ জানো বললে না? 

পুরুষটি একথার উত্তর দিল। বলিল--খুব ভাল ধাই ! তা যে বাঁভীযাবে” 
এক কাঠ করে চাল, একখান! করে কাপড, একটি করে টাকা-ও-ই খরচ করে 
আমায় চিকিচ্ছে করাচ্চে বাকু। 

মেয়েটি উহাকে থামাইর বলিল--তুমি চুপ করে৷ দিকিনি ! তুমি কি জানো। 
ও-সবের। বাবু, ধাইয়ের রোজগার আগে চলতো ভালোই । এখন আপনাদের 
এখানে হাসপাতাল হরেছে পোয়'তিদের জধ্যি। সব লোক এখানে আসে। 
আমাদের কাছে কেডা যাবে? ধান ভেনে যাহয়। ছু'মণ ধান ভানলি পাঁচ- 
কাঠা চাল পাওয়া যায়-_কিস্তু বাবু, অস্গখে ভুগে ভুগে আমার গতর গিয়েছে» 
আর তেমন খাটতি পারিনে। ধান ভান] বড খাটুনির কাজ। যেদিন ধান 
ভানি, আজকাল রাত্তিরি বড্ড প। কামড়ায়-- 


অসাধারণ € 


'আমি বলিল।ম--তোঁমার কে কে আছে আর? 

মেয়েটি সাফ উত্তর দিল--যম। 

-_জাতে হাড়ি বল্লে না? 

_হ্যা বাবু। 

_বিটকিপোত! থেকে এলে কি করে? সে তো৷ অনেক দুর । 

-_-নৌকো করে এ্যালাম বাবু। 

__ভাড়াটে নৌকে1? 

_ অনেক কেঁদে হাতে পাঁয়ে ধরে তেরে! গণ্ডা পয়সা ঠিক হয়েন। ওই 
ঘ্াামাদের গাঁয়ের রতন মাজি। আমি তাঁকে ধরম বাপ বলে ডেকেচি। 

-_ ধানের চাষ কর? 

__ন| বাবু, ঘর-ছোর নেই তার ধাুনব জর্ম। ব্চিলির ছাউনি একখানা 
ঘর, তা এবার খসে পড়ছে। না খুটি দিলি এবার বর্ষায় সে ঘরে থাক! 
যাবে না। 

বেলা হইয়াছিল। সেদিন চলি আদিলাম। ইহার পর হইতে প্রায়ই 
হুদদিন অন্তর মেফেটি উহার স্বামীর হাত ধরির' ডাক্তারথানায় হাজির হয়। কখনে। 
'উমধের দাম কমাইবার জন্য সীতানাথ ডাক্তারের হাতে পায়ে পড়ে, কোনোদিন 
স্বামীর সম্বন্ধে নানারূপ ওশ্র কবে, কবে বোগ সারিবে, নৌকা ভাড়া দিয়া আর 
পারে না সে-__ইত্যাদি। 

দেখিয়া শুনিয়া সীতানাথ ভাত্বারকে জিজ্ঞাসা করিলাম -ওকে কেমন 
দেখেন ? ওর রোগ সারবে? সীতানাথ ভাক্তার হামিয়। বলিলেন_ বিশ্বাস তো 
হয় না। নানান উপসর্গ। ওর শরীরে কিছু নেই--তবে চেষ্টা করছি, এই যা। 

অবশ্ঠ উহাদের সাক্ষাতে একথা হয় নাই। 

মাসখানেক পরে একদিন ভাক্তারখানায় বসিয়া আছি, মেয়েটি আরও শীর্ণ 
হইয়া গিয়াছে। আর কিছুদিন এমনধার1 চলিলে ইহারই চিকিৎসার প্রয়োজন 


৬ অসাধারণ 


হইবে। হয়তো নিজে আধপেটা খাইযা স্বামীর উষধপধ্য ও নৌকাভাড়া 
জোগাইতেছে। পরনের বস্ত্রও জীর্ণতব হইয়া উঠিযাছে। লেদিনের কাজ শেষ করিয়া 
তাহার! যখন চলিয়া যায় তখন মেখেটিকে ড কিবা বলিলাম __শোনে৷ এদিকে ! 

--কি বাবু? 

-__ধাইয়ের কাজ করতে পাববে? 

সে হাসিয়৷ বলিল--এঁ কাজই তো৷ কবি বাবু । তা আর পারবো না? 

আমি উহাদেব সঙ্গে রাস্তায় বাহিব হইযা পডিলাম | উদ্দেশ্ট আমার বাপাটা 
তাহাকে চিনাইযা দেওয়া । সে মাসেই আমার বাসাতে ধাত্রীব প্রয়োজন উপস্থিত 
হইবে। পথে মেয়েটি বণিল-দিন না বাবু একটা কাজ জুটিযে। বহু কষ্টে 
পড়িচি এনাকে নিয়ে । এক এক শিশি ওষুধ পাচ সিকে দেড টাকা । আমার 
রোজগার বড্ড মন্দা হয়ে গিয়েচে । আব চালাতি পাবচি নে। দিন একটা 
জুটিয়ে, য| দেবে তাই নেবো । এক কাঠা চাল, একখানা কাপড়, আব ন৷ হয় 
আট আন! পঞ্সা দেবে_তাই নেবো । আমাব খাই নেই বাবু অন্ত ধাইবের 
মত। তা বাবু আমি বাত্তিরি আাতুডে থাকবে» সেক তাপ কববো, ছানা 
কাপড় কাচবো-- 

অন্ুনয়ের স্বরে বলিল--দিন একট| কাজ জুটিয়ে_ 

আমি বলিলাম__-ওই আমাব বাসা। আর দিন আটেক পরে আমাৰ 
বাসাতে দরকার হবে ধাইযেব। চলো আমার সঙ্গে, দেখিযে আনি । ওকে 
এখানে বসিয়ে রাখো । পুরুষটিকে বলিল!ম-_তুমি এই গাছতলাষ ছাযাৰ বসে 
থাকো, বুঝলে ? 

বাড়ীতে আনিয়া ধাইকে দেখানো:হইল। কিন্তু বাডীতে ও ধাই পছন্দ হইল 
না, অজুহাত অবস্ঠ পাভাগায়েব অশিক্ষিতা ধাই, উহাদের কি জ্ঞান আছে 
ইত্যাদি। কিন্তু আমার সন্দেহ হইল আসল কারণ মেয়েটি দেখিতে ভালো এবং 
'আমি সঙ্গে করিয়া আপিয়াছি বলিয়! । 


অসাধারণ ৭ 


পরদিন আবার রাস্তার দেখা তাহাদের সঙ্গে। ভাক্তারখানায় ছ'জনে 
চলিয়াছে। 

আমাকে দেখিয়া মেয়েটি ডাকিযা বলিল__-ও বাবু, শুনুন-_- 

আমি তাহার কিছু না করিতে পারিরা লজ্জিত ছিলাম । বলিলাম-_- 
বলো-_ 

- আপনার বাড়ীতে ভোলো না? 

_ ইয়ে--নীওদের সঙ্গে কমলা ধাইয়ের কথাবার্ডী আগেই হয়ে গিয়েছে 
কিনা? তাই 

_যাঁক্‌ গে বাবু। "আপনি অন্য এক জায়গায় ভুটিয়ে দিন না? 

- দেখবো । আরও এক জায়গায় সন্ধান আছে আমার । 

_-দেখুন। তিনিই দয়। করবেন । চরিত'মৃতে প্রভূ বলেচেন-.. 

হাড়ির মেয়ের মুখে এ-কথ শুনিয়া চমকিযা উঠিলাম। বলিলাম-_তুমি 
চৈতন্চরিতামুত পড়? লেখাপড়া জান নাকি? 

পুরুষটি বলিল--ও জানে । 

-" বইখানা আছে নাকি তোমাদের বাডী? 

--আছে বাবু, ও রোজ পড়ে অমোকে শোনায় । বই পড়ে আর কাদে । 

মেয়েটি সলজ্জ প্রতিবাদেব স্থরে বণিল--তোমার অত ব্যাখ্যানা করতি হবে 
না,চুপকর। নাবাবুঃং ওর কথা শোনবেন না। পড়ি একটু একটু সন্দে 
বেলাডা । তা ও বই পডে বোজবার মত অদেষ্ট কি আমাদের আছে বাবু? 

স্লেখাপড়া শিখলে কোথায়? 

উহার স্বামী বলিল-__ওর মামার বাড়ী ছেল ধরমপুকুর । শুয়োরের ব্যবসা 
ছেল মন্ত। অবস্থাও ছেল ভালো। এখন তাদের কেউ নেই, মরে হেজে 
গিয়েচে-নইলে আজ এমন দুর্দশা হবে কেন ওর বাবু? ও ছেলেবেলায় 
মামাদের কাছে থেকে ইস্কুলি নেকাপড়া করেল । 


৮ অসাধারণ 


-কি ইস্কুল? 

বৌটি ইহার উত্তর দিল, কারণ এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া পুকষটির সাধ্যাতীত । 
অতি জদটিল প্রশ্ন । 

- অপার প্রাইমারি ইস্কুল বাবু। 

- পাশ করেছিলে ? 

--ছঁ। এখানে এসে পরীক্ষ। দিয়ে গিইছিলাম। 

উহার স্বামী সপ্রশংস মুগ্ধ-দৃষ্টিতে স্ত্রীর মুখের দিকে চাহিয়া বজিল-__বাবুঃ 
ও পাশ করে দুটাকা ইস্কলাসি পেয়েল। 

বৌ ধমক দিয় উঠিল-_তুমি চুপ কবে! দিকিনি। 

পুরুষটি তখনও ঝোঁক সামলাইতে পারে নাই । বলিল-__বাবু, আমাৰ সঙ্গে 
বিয়ে হয়ে আর নেকাপডা হোল না ওর | মামারাও মরে হেজে গেল । ও যেমন 
মেয়ে, আমার হয়েচে সেই যাবে বলে-_বানরেব গলায় মুক্তোর মালা । সব 
অদেষ্টের ফল আর কি । আমি ওরে খেতি দেবো কি, আমি অস্থখে পড়ে 
পজ্জন্ত ওই আমারে থেতি ছ্য,য। আমাব এই চিকিচ্ছেপত্তর ওই সব চালাচ্ছে। 
আজকাল তেমন রোজগার নেই ওর-_-পেট ভরে ছুটে থেতিও পাষ না - আমারে 
বলে, তুমি সেরে উঠলি আমার-»" 

বৌ আবার কড়া ধমক দিয়া উঠিল__আবার ! বাবুব সামনে ওই সব কথা? 
চলো! বাডী তুমি -ঝাঁটা মারবে। তোমার মুখি-_তোমার খুব মুরোদ !-"'মুবোদের 
আবার ব্যাখ্যান। হচ্চে লজ্জ! করে না তোমার? 

আমি মধ্যস্থতা করিয়া বাললাম-_কেন, ও তো ভালে!ই বলচে। ওর যা 
ভাল লেগেছে, ভাল বলবে না? 

বৌ সলঙ্জ সুরে বলিল__ন! বাঝু যেগনে সেখানে ওসব কথা কে বলতে 
বলেচে ওকে ? 

--তা বলুক । কোনো দোষ হয়নি। 


অপাধারণ ৯ 


স্-বাবু, আমারে দেন একটা কাজ জুটিয়ে-_- 

চেষ্টা করবো । একটু অপেক্ষা করো, দেখি ছু-একদিন । 

- কাজ না পেলি বড্ড কষ্ট হচ্চে। পান ভানতি শরীর আর বয় ন1। 
ছু-ম্ণ করে ধান না ভানলি এই যুধ্যুর বাজারে ভটো লোকের খাওথা হয়? তাও 
বাবু শুধু খাওয়া । পরা এ থেকে হয় ন। একখান কাপড়ে ঠেকেচে। একটা 
আতুড়ের কাজ জুটলি তবু একখান কাপড় পাবো। 

কয়েকদিন ধরিয়া তাহাদের আর “দেখিলাম না। কাজও কিছু জুটাইতে 
পরা গেল না। কাহার বাড়ীতে কে অন্তঃসত্ব(। আছে এ সংবাদ জোগাড় করা 
আমার কণ্ম নয় দেখিলাম । 


এই সময় মন্ন্তর সুরু হইধা গেল। চাউলের দাম আগুন হইয়া উঠিতেছে 
দ্রিন দিন। আমাদের এই ক্ষুদ্র টাউনের অ।শপাশের পল্লীগ্রাম হইতে দলে দলে 
কুধার্ত নরনারী হাড়ি ও মালসা হাতে ফ্যান ভিক্ষা করিবার জন্য ছুটিয়া আমিতে 
লাগিল। ক্রমে এমন হইল, যযানও অমিল। দশবিশ সের ফ্যান কোন গৃহস্থ 
বাড়ীতে থাকে না, যাহা আছে তাহ। প্রথম মহডাঁতেই ক্ষুধ। ব্লিষ্ট নরনাপীদের মধ্যে 
বিলি হইয়া যায়_একটু বেলায় যাহার আসে, তাহাদের শুধু হাতে ফিরিতে 
হয়। লোক দু-একটি করিরা মরিতে সুরু করিল ইহাদের মধ্যে । টাউনের 
কুওঁ বাবুরা ও 1 বাবুরা প্রতিদিন একশত দেঁড়শত লোককে খিচুড়ি খাওয়াইতে 
লাগিলেন। কিন্ত, অদ্ধোল্গ, অনশনক্রিষ্ট) দিশাহারা নরনারীদের সংখ্যার 
তুলনায় তাহা নিতান্তই অল্প। ইহার মধ্যে আবার ত্রিপুরা জেলা হইতে বছু 
নরনারী আ।সিয়! কোথা হইতে জুটিল, তাহাদের কথা ভাল বুঝিতে পার] যায় না 
বলিয়। যে গৃহস্থের দোরে যায়, তথা হইতে তাহারা বিতাড়িত হয়, কোথাও 
তাহার। তেমন সহানুভূতি পায় ন। 

এই মহাতু্যোগের হিড়িকে কত লোককে তলাইয়া যাইতে দেখিলাম। 


৯১৩ অসাধারণ 


কতবার মনে ভাবিয়াছি ওই মেয়েটির কথা। ধান ভানিয়া রুগ্ন স্বামীর চিকিৎসা 
চালাইত। নৌকো ভাড়া করিয়া হাত ধরিয়া লইয়া আসিত ভাক্তারখানার | 
€চতন্তচরিতামূতের কথা বণিত। তাহাদের আর পথে ঘাঁটে দেখি নাই 
অনেকদিন। সীতানাথ ড!ক্তারকে একদিন জিজ্ঞাসা করিলাম। সীতানাথ 
বলিলেন- না, তারা অনেকদিন আসেনি । আর আসবে কি, এই তো কাণ্ড! 
ওযুধের দাম দিতে পারে না_ক'শিশি ওযুধর দাম এখনো বাকি । অনেকদিন 
উহাদের দেখি নাই। প্রার ভুপিয়াই গিয়াছি। 

ভাব্রমাসের দিকে আমাদের মহকুমার রিলিফ কমিটির যত্বে লঙ্গরথানা খুলা 
হইল। সেখানে প্রত্যহ বহু দুঃস্থ নরনারী লঙ্গরখান।র খিচুড়ি খাইতে অ।সিত। 
উহাদের মধ্যে একদিন আবার মেয়েটিকে দেখিলাম । একটা মালসার করির! 
লঙ্গরখানার খিচুড়ি লইয়া কোথায় যাইতেছে | 

আমি ডাকিয়া বলিলাম-_তুমি কে।থার এসেছিলে? 

আমায় দেখিয়া সে লজ্জিত হইল। 

বলিল-_এই-- 

--তোমার স্ব'মী কোথায়? 

__ওই পুরানে! ভাকঘরের পেছনে বটতলার। আজকাল ইটতি পারে ন। 
মোটে। 

- চলো দেখে আসি। 

কৌতুহল হইল দেখিবার ভন্য, তাই গিয়াছিলাম। গিয়া মনে হইল ন। 
আদিলে আমাকে বড় ঠকিতে হইত-_কারণ যে দৃশ্য দেখিলাম» তাহা সচরাচর 
চোখে পড়ে না। 

পুরানে। পোরষ্টাফিসের পিছনে যেখানে গব্ণমেন্টের কলের। ওয়ার্ডের ঘর, তার 
সামনে বটতলায় এক ছেঁড়! চাটাই পাতিয়া বৌটির খোঁড়া খ্বামা শুইয়া আছে। 
মনে হইল লোকটা চাটাইয়ের সঙ্গে মিশিয়া আছে এত রুগ্ণ। মেঞ্সেট তার 


অসাধারণ ১১ 


পাশে বসিয়া লঙ্গরখানার খিচুড়ি তাহাকে খাওয়াইতেছে ৷ ছুপুর বেলা) রাস্তা 
দিয়া অনেক লোক যাতায়াত করিতেছে, কেহ চাহিয়া দেখিতেছে, কেহ 
দেখিতেছে না। খাওধানে। শেষ হইলে নে কলেরা ওয়ার্ডের কম্পাউগ্ডের 
টিউবওয়েল হইতে শত্রছিন্ন শাীব আচল ভিজাইঘ জল আনিয়া স্বামীর মুখে 
নিংড়াইর়! দিল। লোকটা ই! করিয়া ছু'ঢোক জল গিলিযা বলিল-_-ঘার একটু 
থাবে-- 

মেয়েটি আবার গেল টিউবওয়েলের কাছে, আবার শাডীর আচল ভিজাইয়! 
জল আনিঘা ওর মুখে দিল। আমি কখনে। এমন দৃণ্ত দেখি নাই। 

বলিলাম-_অমন করে জল আনচো কেন? 

মেয়েটি ব! হাত দিয়া কপালের ঘাম মুছয়া বলিল_-ঘটি বাটি কিছু নেই। 
কিমে জল আনি? 

_-কেন মালসাট]? 

সে মালসাটা তুপিয়া আমার কাছে আনিয়া দেখাইল। বলিল--সবটা খেতে 
পারেনি । আধ মালসা রযষেচে। রাত্তিরে দেবো । খাওয়া কমে গিয়েছে 
একেবারে ॥ 

তারপর মালসাট] যথাস্থানে রাখির। আপিবা! বলিল-_-বড্ড কষ্ট হয়েচে বাবু_ 
দিন না একটা কাজটাজ জুটিষে? এককাঠ' চাল শুধু-খুব কমের মধ্যে করে 
দেবো-- 

এই তাহার সহিত আমার শেষ সাক্ষাৎ । 





' নদীর ধারের বাঁড়ি 


শ্তামলীদের বাসা ছিল পীতান্বর লেনে । ছু'নম্বর পীতাম্বর চৌধুবীর লেন। 
€সেকেলে পুরনো বাড়ি, দোতলার ছ'টি ঘরে ছ'টি পরিবারের বাস। কলত্লায় 
ছুটিবেলা৷ সমানে ঝগড়া চলে জল তোলা নিয়ে। শ্ামণী ওর মধ্যে একটু 
দেখতে ভালো» বয়েস ঠিশেস সামান্ত ওপরে, ছু'এক বছর ওপরে। চার 
সন্তানের মা, ছুটি মেয়ে, ছুটি ছেলে। 

বেলা দশটা বাজে । 

শ্তামলীর স্বামী খেতে বসেচে। শ্ামলী ডালের বাটিতে হাত ডুবিয়ে সামনে 
বসে আছে। 

শ্তামলী বলে -ফিরবে কখন? 

শ্যামলীর শ্বামীর নাম যছ্ুনাথ ভট্টাচাধ্য । যছুনাথ একটা সওদাগরি আফিসে 
সত্তর টাক মাইনের চাকুরী করে। যুদ্ধের বাজারে তাতে চলে না। খাওয়। 
দাওয়ার অসীম কষ্ট। ছেলেমেয়েগুলো ছুধ খেতে পায় না; ছুটো শুকনো মুড়ি 
চিবোয় স্কুল থেকে এসে। 

যছুনাথ বল্লে-ফিরতে সাতটার পরে। 

-আর একটা বাড়ি গ্াখো, বুঝলে? 

-_ সে তো বুঝলাম, বাঁড়ি মিলচে কই ? খুঁজতে কি কম করচি? 

--এ বাড়িতে আর টেকা যায় না। 

--ঝালও ঝগড়! হয়েছিল ? 

-কবে না হয়? বিশ্বেস গিন্সির সঙ্গে মির মা'র ঝগড়া কালও খুব। 
অভয়ার সঙ্গে রাম বাবুর বৌয়ের ঝগড়া। 

স্পজল তোলা নিয়ে? 


অসাধারণ ১৩) 


--ত1 আবার কি নিয়ে? ও তো। রোজকার ঘটন] লেগেই আছে। রোজ 
রোঁজ এ ইতরুমি আর ভালে! লাগে না । অসহা হয়ে উঠেচে। 

যহুনাথ চলে গেল। শ্টামলীর ছেলেমেয়ের। খেয়ে দেয়ে স্কুলে চলে 
গিয়েছিল ; ছেলে ছুটিই বড়, তারা হাই-স্থলে পড়ে। মেয়ে টি পড়ে মোড়ের 
কর্পোরেশন স্কুলে । ছোট রান্নাঘর, একটি লোক কায়ক্লেশে বসে ছুটি আহার 
করতে পারে । আজ ন'ট বছর এ বালার, বড় মেয়ে লীলার বয়েস। এই 
বাসাতেই লীলার আতুড হয়েছিল । রান্নাঘরের সামনে খোলা ড্রেনে তরকারির 
খোসা, ফেন, শাকের ভণটা, চিংড়ি মাছের খোঁসা জমে ডর্গন্ধ বার হচ্চে। এই 
দুর্গন্ধ আর এই কুশ্রী। দৃশ্ঠ আজ ন"বছর ধরে সহা করতে করতে নাক অল্গাড় হয়ে 
গিয়েচে, এখন আর ছুগন্ধকে দুর্গন্ধ বলে মনে হয় ন!। ৰ 

বীণ! ওপরের তলার মনোরগ্ুন বাবুর মেরে। সে গ্তামলীকে ভালবাসে ॥ 
কাছ ঘেঁসে ্রাড়িরে বলে কাকিমা কি রাধলে? 

_মুস্তরির ডাল অর চচ্চড়ি। 

_মাছ আনেননি কাকাবাবু? 

--নাঃ| ছুটাক1 চিংড়ি মাছের সের । মাছ আর কি কেনবার জো৷ আছে ? 
উনি গিয়ে ফিরে এলেন । 

- এবার রেশনের চালে কাকর খুব কম, কাকিমা । আপনারা রেশন 
আনেন নি? 

বুধবার আসবে রেশন । এখনো আনা হয়নি । তোমার কাকা যেতে 
সময় পান নি। 

বিকেলে কলে জল আসতেই ওপরের ভাড়াটে গিন্নিরা বড় এক এক বালতি 
ঘড় বসিয়ে দিলেন কলের মুখে । একজন একটা তুলে নিয়ে যায় তো আর 
একজনে একটা বসায়, এইজন্তে চৌবাচ্চায় মোটে কয়েক ইঞ্চির বেশি জল 
জমতে পায় না। গা! ধোবার কি কষ্টবিকলে! এই গুমট গরমে নিগ্ধ জলে 


১৪ নদীর ধারের বাড়ি 


নান করতে পারলে কি আনন্দই পাওয়া যেতো। কিন্ত তা হওয়ার জো নেই। 
এক একজন ছোবড়া আর সাবান নিয়ে নামবে ওপর থেকে, আধ ঘণ্টা ধরে 
থাকবে। প্রথমে নামবে অভয়া, তারপর নামবে মতির দিদি, এর ছুজনেই 
ভীষণ ঝগড়াটে। যতক্ষণ তারা কলতলায় গা ধোবে, ততক্ষণ কলে এক ঘটি 
জল কারে? নেবার জে] নেই-_-তাহলেই বাবে ধুন্দুমার ঝগড়া। 

অভয় বাঙাল দেশের মেয়ে। বেশ সুন্দরী ও স্বাস্থ্যবতী | শ্বামলীকে 
ডেকে বলে--ও দিদি, কি হচ্চে? 

-_কুটনো কুটচি ভাই। 

-কি কুটনো? 

_বঝিঙে আর ঢেড়স। আলু তো বারো! আনা সের উঠেচে ! আমাদের 
সাধ্যিতে কুলোলে তো৷ কিনবে ! 

-রেশন এসেচে? 

_ নন] ভাই, বুধবারে আসবে । 

--আমায় আধপোয় চিনি দিতে পারবে দিদি তোমাদের রেশন থেকে ? 

--আম্ক আগে, দেখবো এখন | 

এদের মধ্যে সবাই সমান অবস্থার মান্ুষ। কেরাণীর বৌ। পরম্পরের 
সঙ্গে ঝগড়া ঘন্ব করে এদের দ্দিন কাটে । পান থেকে চুণ খসলেই আর নিস্তার 
নেই। বিশ্বাস গিন্নি দলের মোড়ল, ওপরের ভাড়াটেদের সর্দার । তিনি 
সকলের হয়ে ঝগড়া করতে এগিয়ে আসেন। তার সর্দীরিতে ওপরের মেয়ের! 
কোমর বাধে, তাদের মধ্যে একজন হচ্চে এই অভয়া। দেখতে সুন্দরী হলে, 
কী হবে, যেমনি স্বার্থপর তেমনি কুটিল মন। এই যে বলে চিনি দিতে হবে, 
“না” বল্লে আর রক্ষে আছে? কোন্‌ কালে এক বাটি নুন ধার দিয়েছিল, সেই 
ঘটনার উল্লেখ করে খোট! দিয়ে বলবে বরিশালের টানে-_ আমর! কি কোনদিন 
কিছু কাউকে দিই নাকি! সময়ে অসময়ে সন রে তেল রে-তা নিয়ে মনে 


অসাধারণ ১৫ 


থাকবে ক্যান ? ঘোর কলিযে! কাজের সময় কাজী, কাজ ফুরুলে পাজি 
-আচ্ছ! আমরাও কি আর কখনো কাজে লাগবো না। তখন যেন-- 
ইত্যাদি । 

এই বাসাটাতে কি গুমট গরম। দক্গিণ দিক চাপা, এতটুকু হাওয়া আসে 
না, প্রাণ আইঢাই করে গরমে । আজ ন* ব্ছর কষ্টভোগ চলচে। এই ঝগড়ার 
আবহাওযা আর এই দাকণ স্থনভাব। সকলের ওপরে এই অপরিষ্কার, নোংরা 
পরিবেশ। সাই সমান অশিক্ষিতা, ভালো বললেও এ বাড়িতে মন্দ হয়। 
সেদিন অপরাধের মধ্যে ও শনাবাবর স্ত্রীকে বলেছিল--দিদ্ি, 1চংড়ি মাছের 
খোসাগুলো৷ একেবারে সামনেই ফেললে, কলতুলায় সকলেরই যেতে আসতে 
হয়-সকলেরই তো অস্থবিধে | 

আর যাবি কোথায়! শ্রশীবাবুব বৌ চীৎকার জুডে দিলে--আমি কি একলা 
ফেলি নাকি, সবাই তো ফেলে, কেনই বা না ফেলবে ; ভাডা দিরে সবাই বাস 
করে, কারে| একার সম্পত্তি তো নয়; সবারই স্থবিধে এখানে দেখতে হবে-- 
যদ্দি তাতে অস্থবিধে হয় তবে গরীব ভাডাট্েদের সঙ্গে বাস কর! কেন, তাহোলে 
ছোতল৷ বাডি আলাদা ভাড়া নিয়ে বালিগঞ্জে গিয়ে বাস করলেই তো হয়-- 
ইত্যাদি। 

শ্তামণীও চুপ কবে থাকবার মেয়ে নয়, সে বল্লেদিদি, কি পাগলের মত 
বকচেন ? আপনি চিংভি মাছের খোমা দেলবেন তাতে কেউ বারণ করচে 
না, তবে আমারই রান্নাঘরের সামনে কেন ফেলবেন? বেন আমি তা ফেলতে 
দেবো ? 


_ফেলতে দেবে না তোমার কথায়? কি তুমি এমন লাট সায়েব এয়েচ 
রে বাপু। তুমি পাগল না আমি পাগল? রান্নাঘরের বাইরের জায়গা 
তোমারও য।, আমারও তা--তুমি বলতে আবার কে? 


১৬ নদীর ধারের বাড়ি 


--তা বলে পরের সুবিধে অস্থবিধে যারা না দেখে তারা আবার মান্ষ ? 
তাদের আমি ঘোর অমানুষ বলি। 


এই পধ্যন্ত গেল সাধারণ ভাবের কথা, একে ঝগডা বলে অভিহিত করা 
যাঁয় না। এরপর বাঁধলো আসল ঝগড়া যার নাম-_-। শ্তামলীও ছাড়লে না, 
শশীবাবুর বৌও নাউভয়পক্ষে বাধলো কুরুক্ষেত্র । তারপরে কথা একদম 
বন্ধ হয়ে গেল ছু'পক্ষেই । নান|রকম শক্রতা আরম্ভ করলেন শশীবাবুর প্রৌঢা 
স্ী। ছেলেমেয়ের হাত ধরে খোলা ড্রেনে বসিয়ে দিতে লাগলেন সকালবেলা, 
পায়খানা থাকা সত্তববেও। প্র!য় শ্ট/মলীর রান্নাঘরের সামনেই । কিছু বলবার 
জো নেই । ওই আর গোলমাল । একটি মাত্র পায়খানা শিচে। মেয়ে পুরুষ 
তাতে ফাবে। কি নোংর! করেই রাখে মাঝে মাঝে । ভোরে অন্ধকার ণাকতে 
থাকতে যদি ঘুম ভাঙে, তবে কল পায়খান] ব্যবহার করা যাবে সেদিন, নয়তো 
বেলা এগারোটা, পুরুষরা সবাই আফিসে বেরিয়ে গেলে। চৌবাচ্চায় তখন 
দু'ইঞ্চি মাত্র ভল থাকে কোনোদিন, কোনোদিন তারও কম। 


শ্যামলীর দম বন্ধ হরে আসে | "* 
এমন কি কোনো বাসা পাওয়। যার ন! যাতে অন্তত মেয়েদের একটা আলাদা 


নাইবার জায়গা! আছে?" 
আষাঢ় মাসের প্রথম । 
ফিরিওয়ালা গলির মধ্যে হকচে-_চাই ল্যাংড়া আম-_ ল্যাংড়া আ-আ-ম--। 


বটি এখনও নামেনি এবার। ভৈষ্ঠ্য মাসের গরম প্রায় সমান ভাবেই চলচে। 
মতির ছোট বোন এসে বললে: দশ পল! তেল ধার দেবেন কাকিম1? 


শ্টামলী বললে হবে না। তেল নেই। 


নদীর ধারের বাড়ি ১৭ 


-"আট পলাও হবে না? 

-কিছু নেই। 

মেয়েটা চলে গেল । শ্ঠামলী তেল দেবে কি, ওদের কোন আকেল নেই। 
শ্টামলী কি সাধে বিরক্ত হয়েচে? উনি খারাপ কলের তেল খেতে পারেন ন! 
বলে একনম্বর কানপুর কিনে আনেন গুঁর আফিসের রেশন বেচে। সে কী 
বী।জওয়াল] তেল। মত্তিরা এক কৌশল ধরেচে কি, বিশ পল। সেই ভালো তেল 
হপ্তায় ধার নেবে, আর ধার শে।ধ দেবে পাচ সিকে সেরের কলের তেল দিয়ে । 
উনি বলেন, ও তেল থেলে বেরিবেরি হয়। শ্যামলীদের ফি হপ্তায় বিশ পল। তেল 
অপব্যয়ে যায়। 

ওর] চালাক আছে। একবার নেবে দশ পলা, তারপর আর একদিন এসে 
নেবে দশ পলা । এক সঙ্গে নেবে না। একেবারে যেন মৌরসী পাট্টা করে 
বসেচে । দেবো না তেল, রোজ রোজ ও চালাকি খাটবে না আমার কাছে। 
দেখি কি হয়। 

কিন্ত মতির মায়ের কৌশল অন্যরকম। সে এতটুকু চটলো না, আবার 
একবার বাটি হাতে এসে হাজির স্বয়ং মতির মা। 

_ও শ্যামলী, দে দিকি ভাই একটু তেল। 

-_-তেল নেই দিদি। 

__দিতেই হবে। মাছ ভাজ! হচ্চে না, পাঁচ পলা তেল দে 

_যা আছে আমারই কুলোবে ন। দিদি-_ 

--দেখি তোর তেলের বোতল? দে ভাই আমায় পাঁচ পলা 

অগত্যা শ্তামলী উঠে গিয়ে তেল দেয়, ও আবার পরের কাছুনি মিনতি 
বেশিক্ষণ সহ্‌ করতে পারে না। ঠকচেই তো দেখাই যাচ্চে, ঠকুক। লোকে 
তাতে খুশি হয় হোক । 

কিন্তু এই সামান্ত ব্যাপার নিয়ে দোতলার ভাড়াঁটেদের মধ্যে মহা ঘৌট- 

২ 


১৮ অসাধারণ 


মঙ্গলের হৃষ্টি হোল। মত্ডির মা গিয়ে সাতখানা করে লাগিয়েচে তাদের কাছে। 
তেল থাকতেও দিতে চাচ্ছিল না, বোতল দেখতে চাইলুম, তাই তে দিলে। 
এমন ছোট নজর তো কখনো করতে পারিনে আমরা । এই যে সেদিন বোশেশ 
মাসে গুর পেটের ব্যথা ধরলো রাত্তিরে, যছুবাবু সৌড| চেয়ে নিয়ে যান শি 
আমাদের এখান থেকে । দিই নি আমবা? লোকের কাছে হাত পেতে যেমন 
নিতে হয়, তেমনি দিতেও হয়। তবে লোকে মানুষ বলে। 

তার পরের দিন আর কলতলায় যাওয়া যায় না। বড় বড বালতি, ঘডা আর 
টব পডলো একের পর এক সকাল থেকে । সে সব সরিয়ে এক বালতি রান্নার 
জল নিতে গেলেও ঝগড়ায় মুখর হয়ে উঠবে সারা বাড়িটা-_সেকথা' শ্যামলী ভাল 
বুকমেই জানে । অনেকবারের অভিজ্ঞতায় জানে । স্থতরাং আযাঢ় মাসের 
গুমট গরমে বেলা এগারোটা পধ্যস্থ তাকে অস্নাত অবস্থায় থাকতে হোল। 
এগারোটার পর কলের জল কখন চলে গেল। যখন সে নাইতে গেল, তখন 
চৌবাচ্চায় ইঞ্চি চারেক মাত্র জল। কাকের মুখ থেকে তার মধ্যে 
পড়েচে ভাত । 

৬এই সময়ে একদিন যছুবাবু এসে বল্লেন, ওগো শোনো, একটা সন্ধান পেয়েচি | 
রাণীঘাট থেকে নেমে যেতে হম প্রায় এগ!রো৷ মাইল উত্তরে, বল্লভপুন বলে 
পাড়াগী। সেখানে কলকাতার এক বড় লোকের জমিদাী কাছারি ছিল, বিক্রি 
করে ফেলেচে। জমিদারি বিক্রি হয়ে গিবেচে, কাছাপি বাডিটাও ওরা আলাদ। 
বিক্রি করবে। মাঝে মাঝে যেতো! বলে কাছারিবাড়ির সংলগ্ন দোতলা বাড়ি 
তৈরি করেছিল, ওপরে নিচে পাচখানা ঘর, বারান্দা, রান্নাঘব, নাইবার ঘর স্ব 
আছে। দশ বিঘে জমির ওপর কাচ্ারিবাড়ি, তাতে আম কঠালের গাছ, 
কলাগাছ আছে। বাঙির সেই জমির শিচে দিয়ে একটা ছোট নঙ্গী বযে যাচ্চে, 
তাতে জমিদার বাঁধানো ঘাটলা করে দিয়েচেন, বাড়ির মেয়েরা যখন গিয়ে 
থাকতো, তার্দের নাইবার স্বিধার জন্তে। সবস্থদ্ধ তিন হাজার সাড়ে তিন 


নদীর ধারের বাড়ি ১৯ 


হাজার টাকা হোলে বাড়িটা পাওয়া যায়--জমিশুদ্,--বিনবো? প্রভিডেণ্ট 
ফণ্তের টাক সব যদ্দি তুলে নিই-- 

_-অত কমে হবে? 

_-পাড়ার্গ!। কে সেখান খদ্দের হচ্চে? যদদর শুনলাম, চাষা গা। গীয়েও 
অত টাকা দিয়ে কেনবার লোক নেই। 

_ টাকা দেবে কোঁথা থেকে? 

_-প্রভিভেণ্ট ফণ্ডের টাকা সব তুলে নিই। তোমার গহনা কিছু দাও 
আর ইনসিওগ্ে কোম্পানীর কাছ থেকে কিছু ধার করি। আমার কাছেও 
সামান্য কিছু আছে। 

শ্তামলীর মন নেচে উঠলো । কতদিন সে পাড়াগায়ের মুখ দেখেনি । বাপের 
বাডি ছিল হুগলী জেলার তারকেশ্বর লইনে দাসপুর গ্রামে। €স বংশে 
বাতি দিতে কেউ নেই। জ্ঞাতি কাকার! পর্য্যস্ত উঠে এসে কলকাতা বাস 
করচেন, ঘোর ম্যালেরিয়া, চলে না সেখানে থাকা ॥ 

যদি এ সম্ভব হয়! 

ভগবান কি এত দয়া করবেন? তা কি তার কপালে সম্ভব হবে? 

খ্য/মলী বল্পে-_কিন্তু তুমি কোথায় থাকবে? 

- কেন, সেখানে । 

-আপিস? 

- চাকুরী ছেড়ে দেবো । একঘেরে হয়ে গিয়েচে এ জীবন। আর ভালে! 
লাগে না। স্বাস্থ্য যেতে বসেচে। একটু সাহস করে দেখি, যা আছে কপালে । 
ওখানে জায়গ। জমি নিয়ে চাষবাস করবো। 

--ছেলে ছটোর লেখাপড়া? 

__রাণাঘাটে বোভডিংয়ে থাকবে । সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে এখন। আর এ 
যা লেখাপড়া শিখচে, এ শিখে তো কেরাণী হবে? তার চেয়ে ভালো কাজ 


২০ অসাধারণ 


ওখানে শিখতে পারবে । বিলেত থেকে লোক গিয়ে আমেরিকায় বাস ক'রে 
আমেরিক। যুক্তরাজ্য স্থাপন করেছিল। অজানায় পাড়ি ন! দিলে মানুষ মানুষ 
হয়ে ওঠে না। জীবন উপভোগই যদি না করলুম, বেঁচে থেকে কি হবে? 
গ্রামের লোকদের কাছে ছুটো ভালো কথা বলবো । নাইট স্কুল করবো । বই 
পড়তে শেখাবো । এ আমার অনেক দিনের ইচ্ছা । 

স্বামী-স্ত্রীতে মিলে সারা বিকেল আর রাত ধরে পরামর্শ হোল। শ্যামলীর 
চোখে রীন স্বপ্ন ভেসে উঠেচে-_দূরের পাথী-ভাকা ফুল-ফোটা৷ স্থঘুখ জ্যোৎস্া 
রাত্রির প্রহরগুলি। কত অলস মধ্যাহ্ছে বনানীকোলে ঘুঘুর ডাক শোনা 
[বছানায় আধ-জাগরিত আধ-ঘুমস্ত অবস্থাব শুয়ে শুয়ে! কত আত্মমুকুলের গন্ধে 
স্থবাসিত সকাল-সন্ধ্যা ৷ 


দিনপনেরো পরে। 

যছুবাবুর সঙ্গে একটি প্রো ভদ্রলোক শ্য/মলীদের বাসায় ঢুকলেন। যছুবাবু 
বল্লেন, উনি এখানে খাবেন। 

শ্ঠ(মলীকে আড়ালে বল্পেন--উনি ওদের স্টেটের নায়েব, গুরও নাম যছুবাবু । 
তবে উনি কায়স্থ । আমাকে বলে কয়ে উনিই বাড়ি দেওয়াচ্ছেন ৷ অতি ভদ্রলোক । 
একটু ভাল করে খাওয়াও .দাওয়াও। সাড়ে তিনের মধ্যে হয়ে যাবে, আর সেই 
সঙ্গে জমিদারের খাস কিছু রোয়৷ ধানের জমি আছে, সেটাও ওই সঙ্গে হয়ে যাবে। 

আহারাদির পরে ভদ্রলোক অনেকক্ষণ কি পরামর্শ করলেন যছুবাবুর সঙ্গে। 
তারপর চ1 খেয়ে বিদায় নিলেন। এর তিনদিন পরে শ্যামলীকে যহবাঁবু বলেন, 
বাড়ি রেজেগ্রি কর! হয়ে গিয়েচে। 

আধাঢ় মাসের শেষের দিকে জিনিসপত্র গুছিয়ে শ্তামলীর৷ তার্দের নতুন কেন! 
বাড়িতে বাস করতে চললো । কলকাতার বাস] একেবারে উঠিয়ে দিলে ন', 
কিছু কিছু জিনিসপত্র ঘরে রেখে ঘর চাবিবদ্ধ করে গেল । 


নদীর ধারের বাঁড়ি ২১ 


রাখাঘাট থেকে ট্রেন বদলে বনর্গ1৷ লাইনের গাংনাপুর স্টেশনে ওরা বেলা 
দশটার সময় নামলো । আগে থেকে বন্দোবস্ত করার ফলে বল্লভপুর গ্রামের 
একখানা গরুর গাড়ি স্টেশনে উপস্থিত ছিল। 

মাঠ ও বনজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এ গ্রাম ও গ্রাম পেরিরে চললো গাড়ি । বেলা 
প্রায় ঘিনটের সময় সামনের একটা ঝাঁকড়া বটগাছ দেখিয়ে গাড়োয়ান বল্লে--ওই 
বু'দীপুরের বনবিবিতলা দেখা যাচ্চে--ওর পরেই বল্পভপুর । 

শ্তামলীর বুক লে উঠলো । কি ভাঁনি কেমন হবে এত আশা-স্থথে কেনা 
বাড়িটা, কেমন হবে সেখানকার জীবনখাত্রা! জানাকে ফেলে অজানাকে তো? 
আকডানে! হোল চোখ বুজে, এখন সেই অজানার প্ররুতি কি, সেটা এখুনি তো৷ 
বোবা যাবে আর একটু পরেই। কি গিরে দেখবে যে সেখানে, কি জানি? 
সর্বস্ব খুইয়ে তার বিনিময়ে কেনা। ত্রমে আরও আধঘণ্ট1 কেটে গেল। বেল! 
বেশ পড়ে এসেচে। এমন সময়ে গাড়োয়ান বলে-_এই যে বাবু বাড়ির সামনে 
এসে গিয়েচে গাড়ি । নামুন মাঠাকরুন এবার | 

ঢরু দুরু বক্ষে শ্তামলী নামলো সকলের আগে । ফদ্তবাবু বল্লেন- ন1 দেখে 
বাড়ি কেনা। এতগুলো! টাকা-_বলতে গেলে সর্বস্ব খুইয়ে_ এই দূর গাঁয়ে বাড়ি 
কেনা । তুমি আগে নেমে বাড়িতে ঢোকো। মেফ্চেরা ঘরের লক্ষ্মী কিনা, তুমি 
আগে ঢোকে]। আমার তো সাহস হচ্চে না, কি জানি কি রকম হবে! 
শামো আগে। 

_ হ্যাগো বাড়ি কি পরিষ্কার করা আছে, না একগল! ধুলো আর মাকড়সার 
জাল আর চামচিকের বাসা । গিয়ে এখন ঝাট দিতে হবে? চাবি কোথা? 

গাড়োয়ান শুনতে পেয়ে বলে-মা ঠাকরুন, বাড়িতেই আছে মুক্তোর ম৷ 
গয়লানী আর তার ছেলে। তারাই বাড়ি দেখাশুনো করে, নিচের একটা ঘরে 
আছে । চাৰি তে! নেই, বাড়ি খোলাই পড়ে আছে। 

কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে একটা বাশঝাড়ের আড়ালে একেবারে শ্টামলীর 


খ অসাধারণ 


সামনেই যে বাঁড়িটা পড়লো, সেটা! দেখে ও আনন্দে ও বিশ্বয়ে অবাক হয়ে 
দাড়িয়ে গেল। এই বাড়ি তাদের। এমন বাড়ি এই অজ পাড়াগীয়ে ! 

কলকাতায় এমনি হলদে রং কর! সবুজ রংয়ের জানালা খড়খড়িওয়ালা 
দোতল! বাড়ি দেখেচে দোতলাও নয়, বাড়িটা তেতলা--কিস্ত এমন বাড়িটা 
সত্যিই তাঁদের নিজস্ব ! 

শ্তামলী আনন্দে চেঁচিয়ে উঠে বল্লে-_-ওগো গাখো, এসে ঘ্াখো-- 

পরক্ষণেই ওর লজ্জা হোল। গাডোয়'নটা না জানি কি আদেখলেই মনে 
করলে ওকে ! ততক্ষণে যছুবাবু ও ছেলেমেয়ের! বাশঝাডের মোড় ছাড়িসে 
বাড়ির কাছে এসে গিয়েচে | যবাবু বল্লেন--বাঃ, বেশ-_বেশ-- 

রাস্তায় আসতে গাড়োয়ানকে য্ুবাবু বাড়ির কথ! বহুবার জিগ্যেস 
করেছিলেন। সে বলেছিল-_-চমৎকার বাড়ি বাবু। কলকাতার বাবুরা 
থাকবার জন্তি করলেন । তেতালা বাড়ি, দরাজ জায়গা, নদীর ধারে বীধাঘাট 
আছে» ফল পাকড়ের গাছ। গ্যাখবেন বাড়ির মত বাড়ি। 

কিন্ত ছোটলোকের সে কথায় আস্থা স্থাপন করতে পারেনি শ্যামলী বা তার 
স্বামী। এখন বাড়িটা দেখে মনে হোল গাড়োরান অনেক কমিয়ে বলেছিল। 
বাড়িটা সম্বন্ধে আসল কথা হচ্চে, অনেকথানি ফাক। জায়গার মধ্যে বাড়িট। 
্াড়িয়ে, অথচ ঠিক পাশেই গ্রামের বসতি । 

বনানীর ও মাঠের সবুজের মধ্যে হল্দে রংয়ের বাহার। 

ওর! হুড়মুড় করে সবাই গিয়ে বাড়ি টুকলো । নিচের ঘরে গিয়ে দেখলে 
সেখানে এক বুড়ি মাছুরের ওপর ঘুমিয়ে আছে। শ্যামলী ডাকলে--ও ঝি--কি 
যেন নাম ওর- মুক্তোর মা? ও মুক্তোর মা-- 

বুড়ি ধড়মড় করে জেগে উঠে বসলে! । তারপর ঘুমজড়ানো চেখে ওদের 
দিকে খুব সামান্য একটুখানি চেয়ে থেকে তাড়াতাড়ি মাদুর ছেড়ে উঠে এসে 
শ্তামলীর পায়ে গড় হয়ে প্রণাম করে বল্ে--পোড়াকপাল আমার মা, ঘুমিয়ে 


নদীর ধারের বাড়ি ২৩ 


পড়িচি এই অবেলায়। বেন্বেল! থেকে ওপরে নিচে সর ঘর ধোলাম, পৌঁছলাম, 
ছাদ ঝাঁট দেলাম, বলি মা ঠাকরুনর! আসচেন, বাবু আসচেন-_তা ছাদ তো নয় 
গড়ের মাঠ, এই হাতির মত বাড়ি ধোয়ানো সামলানো! কি এক দিনের কম্মো? 
আঁন্রন, মা ঠাকরুন, আসুন বাবা-- 

শ্যামলী বল্লে- তোমার নাম মুক্তোর মা? 

বলে সবাই। বলো না, অদেষ্টের মাথায় মারি সাত খ্যাংর৷ । নামটাই 
আছে বজার,ঃ যার জন্তি নাম গে আর নেই। তা হলি কি আজ আমার 
ভাবনা-- 

শ্যমলীর ওনমব কথা ভালে! লাগছিল ন1। তার ইচ্ছে হচ্ছিল এক দৌড়ে 
বাড়িটার ওপরে নিচে সব দেখে আমে । কিন্তু কী মনে করবে এরা । কী মনে 
করবে মুক্তোর মা । 

ওর সবাই মিলে নিচের ঘরগুলো৷ দেখলে । বড় বড় ছুটো ঘর, প্রশস্ত 
থামওয়াল ঝিলিমিলি বপানে। বারান্দা, ওদিকে অন্ত একট! ছোট রোক্াকের 
সামনে রান্নাঘর | শ্টামলীর বড় ছেলে কানাই বলে -_ম।, এ তো রান্নাঘর নয়, এ 
আমাদের কলকাতার বাসার ঘরের চেয়েও অনেক বড়। দ্য/খো কেমন আলমারি 
দেওয়ালের গায়ে ? 

বড মেয়ে ডলি বললে -কতগচলে? জানলা গ্যাখে। ম] রান্নাঘরে ! 

ওপরে সিঁডি বেষে ছুড়ছড় করে সবাই উঠলো । শ্ঠামলী বল্লে__ওগো, 
দ্যাখো কি সুন্দর মেজে। কীচের সাসি বসানে৷ জানালা ! 

কানাই ও ছোট ছেলে বলাই একসঙ্গে চেচিয়ে বল্লে-কি স্বন্দর সিনারি, 
দেখে যাও মা বারান্দা থেকে-ওই তো মাঠটার পরেই কেমন সুন্দর ছোট্র 
নদীটা, ওপারে সবুজ মাঠ, কেমন ঝোপ আর বাবলা! গাছ, গরু চরচে-__ও কি ফুল 
ফুটেচে ওপারের ক্ষেতে বাব? 

যছ্ববাবু বল্লেন__ও ঝিডের ফুল। বর্ষাকালে সন্দের সময় ঝিডের ফুল ফোটে 


২৪ অসাধারণ 


কিনা! সত্যি, ভারি সুন্দর সিনারিই বটে, ওগো, গ্ঘ/খে। ইবিকে এসে ! 
কি ফাকা! 

শ্যামলী বল্পে--তেতলার ঘরটা দেখে আসি চলো । 

তেতলার ঘরটি অপেক্ষাকৃত ছোট । কিন্তু খুব বড় বড় তিনট জানলা তিনটি 
দেওয়ালে । রাঁঙ। মাটির পালিশ করা মেজে। দরাজ ছাদ, ছাদের ওপর থেকে 
বহুদূরব্যাপী মুক্ত মাঠের সবুজ বাণী এই আধাঢ় সন্ধ্যায় ওদের অন্তর ম্পর্শ করলে। 
্টামলীর গোখে জল এলো । এ যে রূপকথার রাজবাড়ি তার কাছে, সে গরীব 
ঘরের মেয়ে, গরীব ঘরের বৌ, কলকাতার বাসার অন্ধকুদ্পে আজীবন কাটিয়ে 
আজ কি ভাগ্যে এমন বাড়িঘর নিজের মনে করবার অধিকার পেল। কানাই 
ইতিমধ্যে ছুটে এসে বল্পে--বাবধাঘাট দেখে এলাম মা। একটু ভেঙে ভেঙে ১টা 
উঠে গিয়েচে চাতালের। তবুও দিব্যি আরামে নাইতে পারবে । ওই তো-_দেখ! 
যাচ্চে_এই উঠেনট। পার হরেই--- 

যছুবাবু বলেন-_ নাঃ, সাড়ে তিন হাজার টাকা নিক। জিন্সের মত 
জিনিস। বাড়ির মত খাড়ি। ছেলেপুলে নিরে দরাজ জারগায় বাস করো। 
এই তো! পাশেই গীয়ের কি পাড়া । ডাক দ্রিলেই লোক পাবে। কোনে ভর 
নেই। আমি এখানেই একটা কিছু রবো। এত লোকের চলচে আর আমার 
চলবে ন1? খুব চলবে। তোমরা দাড়াও জিনিসশত্তর সব ওপরে নিয়ে আনি। 
কি কি গাছ আছে মুক্তোর মা? 

মুক্তোর মা বল্লে__তিনটে আমগাছ আছে, সাতটা কাণাল গাছ, একা 
পেয়ারা গাছ, একটা চালতে গাছ, একটা বিলিতি কুলগাছ, ছুঝাড় কল!গাছ, 
চারটে নারকেল গাছ। বাবুর নিজের হাতে সব লাগিয়েছিল থাকবে বলে। 
সখ করে কলকেভা থেকে চারা এনে এই ওবছরও ওই ছ্য/খো একটা চাপাফুলগাছ 
বসিয়ে গিয়েচে। 

একটু পরে সন্ধ্যা হয়ে অন্ধকার নামলো । শ্যামলীর ছুঃখ হোল, এখন আর 


নদীর ধারের বাড়ি ২৫ 


কিছু দেখা যাবে না। নতুনতর জীবনযাত্রার পথে নতুনতর দেশের প্রতি- 
পথঘাট চিনে নেওয়া যেতো, ভাল করে দেখ! যেতে! আলো ভরা দিনমানে | 
'মলী তাডাতাড়ি লঠন জাললে | ডাকলে-_মুক্তোর মা, ও মুক্তোর মী 
মুক্তোর ম| মালপত্র গাডি থেকে নামিয়ে এনে দোতলার তুলছিল। বল্লে-_- 
কিম? 

--জল আছে বাডিতে? 

_-জল তুলে রেখেচি একট] বালতিতে, আর তো৷ পংত্তব নেই মা তাই 
তুলতে পারিনি-- 

--সে কথ| বলশিনে, বাড়িতে জল আছে? কুরোটুয়ো- 

-বাধানো পাতকুষে। আছে। নাওয়ার ঘর আছে, রান্নাঘরের পেছনে । 
চলুন, আমি দেখিয়ে দি। বাবুদের বাড়ি কোন ক্রি ছিল না মা, আগাগোড। 
সান বাধানো। চৌবাচ্চ। আছে বাধানো। 

_-তাতে জল তুলে রাখে। নি? 

_নাইবেন দি তবে পাতকুধোর জলে কেন মা? দিব্যি বাধানো নদীর 
ঘাট, অসাগর জল নদীতে । এখন শোয়ার এসেচে, সব পৈঠেগ্ুলো। ডুব 
গিয়েচে ! চলুন গা ধুয়ে আসবেন । 

শ্য/মলী নদীর ঘাটেই নাইতে গেল। ঘাটের ঠিক পাশে কি একটা বড প্রাচীন 
গাছ। তার ছারা পড়েছে বাধাঘাটের পৈঠাগুলোতে। কি একটা পুষ্পের 
স্থবাস বাতাসে তৃরহ্ুর করচে । এই গাছ থেকেই আসচে। 

--কি ফুলের গন্ধ মুক্তোর মা? 

-কি একটা লতা এই গাছে উঠেচে মা, কাল সকালে দেখবেন সাদ। সাদা 
ফুল ফুটেচে। ভারি বাস বেরোয় রাত্তিরি। 

শ্যামলী জলে নামলো । আজ সে রূপকথার রাজকন্তে। সিপ্ধ জল, 
ওপারের দিক থেকে হাওয়া বইচে। সেই ফুলের স্থগন্ধ। তারাভরা আকাশ । 


৬ অসাধারণ 


এই বাঁধা ঘাট, এই প্রাচীন কি বনম্পতি, এই বনপুষ্প-স্থবাস--সব তাদের, তাদের 
নিজস্ব । তারা পয়সা দিয়ে কিনেচে। কলকাতায় সেই পচা ড্রেন, কলতলা» 
অভয়া, বিশ্বাস গিন্লি সব স্বপ্ন হয়ে গিয়েচে একদিনে । তাদের জন্তেই সত্যি 
কষ্ট হোল। বেচারী মতির ম1| বেচারী শশীবাবুব বৌ। ওদের একবার 
এখানে আনতে হবে। না, এও ন্বপ্র» এখনো যেন খিশ্বাস হয় না এত 
সৌভাগ্য । 

ডলি চেঁচিয়ে ডাকচে দোতলার বারান্দা গেকে- ওমা, ঈগগির গা ধুয়ে 
এসো-্বাঝ| চ৷ চাইচেএসো চট করে-_- 

শ্টামলী স্বপ্ললোক থেকে নেষে এল। সাঁধানেব বাঝ্সটা নেই। আনতে 
তুলে গিয়েছে তাডাতাডিতে। 

- মুক্তোর মা, ছুটে যাও ব্ডদিদিকে বলগে যাও ছোট তোরন্গের মধ্যে 
সাবানের বাঝ্সটা আছে, দিতে। 


(বিপদ , 


বাড়ি বসিয়া লিখিতেছিলাম। সকাল বেলাটায় কে আসিয়া ডাকিল- 
জ্যাঠামশাই ? একমনে লিখিতেছিলাম, একটু বিরক্ত হইয়া বলিলাম-_কে ? 

বালিকাকণ্ঠে কে বলিল-_এই আমি, হাজু। 

_হাজু? কেহাছু? 

বাহিরে আমসিলাম। একটি যোল সতেরো বছরের মলিন বস্ত্র পরনে 
মেয়ে একটি ছোট ছেলে কোলে দীড়াইয়া আছে। চিনিলাম না। গ্রামে 
অনেকদিন পরে.নতৃন আপিয়াছি, কত লোককে চিনি না। বলিলাম_-কে তুমি? 

মেয়েটি লাজুক স্থুরে বলিল-আমার বাবার নাম রামচরণ বোষ্টম। 
এইবার চিনিলাম। রামচণের সঙ্গে ছেলেবেলায় কড়ি খেলিতাম। সে 
আজ বছর পাঁচ ছয় হইল ইহলোকের মায়া কাটাইয় সাধনোচিত ধামে প্রস্থান 
করিয়াছে সে সংবাদও রাখি । কিন্তু তাহার সাংসারিক কোনো খবর বাখিতাম 
না। তাহার যে এতবড় মেয়ে আছে, তাহা এখনই জানিলাম । 

বলিলাম_ও! তুমি রামচরণের মেয়ে? বিয়ে হরেচে দেখচি। শ্বাশ্তর- 
বাড়ি কোথায়? 

-কালোপুর। 

-বেশ বেশ। এটি খোক। বুঝি? বয়েস কত হলো? 

--এই ছু'বছর | 

-বেশ। বেঁচে থাক। যাও বাড়ির মধ্যে যাও। 

-আপনার কাছে এইচি জ্যাঠামশাই। আপনি নোক রাখবেন? 

- লোক? না লোক তো আছে গয়না বৌ। আর লোকের দরকার নেই 
তো। কেন? থাকবেকে? 


৮ অসাধারণ 


-আমিই থাকতাম। আপনার মাইনে লাগবে না, আমাদের ছুটো খেতে 
দেবেন। 


--কেন তোমার শ্বশুরবাড়ি? 


মেয়েটি কোনো জবাব দিল না। অত শত হাঙ্গামাতে আমার দরকার 
কি? লেখার দেরী হইয়া যাইতেছে । সোজাসুজি বলিলাম_-না, লোকের 
এখন দরকার নেই আমার । 


তারপর মেয়েটি বাড়ির মধ্যে ঢুকিল এবং পরে শুনিলাম পে ভিক্ষা করিতে 
আসিয়াছিল। চাল লইয়া চলিব! গিয়'ছে। 

মেয়েটির কথা ভুলিয়া! গিয়াছিলাম, হঠাৎ একদিন দেখি, রায়েদের বাহিরের 
ঘরের পৈঠায় বসির সেই মেয়েটি হাউমাউ করিয়া! এক টুকরা তরমুজ খাইতেছে। 
যে ভাবে সে তরমুজের ট্ুকরাটি ধরিয়া কামড় মারিতেছে, “হাউমাউ” কথাটি 
কুষ্ঠ ভাবে সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং এ কথাটাই আমার মনে আল্িল। অতি 
মলিন বন্ত্র পরিধানে। ছেলেটি ওর সঙ্গে নাই। পাশে পৈঠার উপরে ভ্র-এক 
টুকরা পেঁপে ও একখণ্ড তালের গুড়ের পাটালি। অন্ুমানে বুঝিলাম আজ 
অক্ষয় তৃতীয়! উপলক্ষে রায়-বাঁডি কলসী-উৎসর্গ ছিল, এসব ফল্মূল ভিক্ষা করিতে 
গিয়! প্রাপ্ত । কারণ মেয়েটির পায়ের কাছে একট? পোটল৷ এবং সম্ভবত তাহাতে 
ভিক্ষায় পাওয়া চাল। 

সেদিন আমি কাহাকে যেন মেয়েটির সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলাম। শুনিলাম 
মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি যায় না, কারণ সেখানকার অবস্থা খুবই খারাপ, ছু'বেলা ভাত 
জোটে না। চালাইতে ন৷ পারিয়া মেয়েটির স্বামী উহাকে বাপের বাড়ি ফেলিয়! 
রাধিয়াছে, লইয়া! যাইবার নামও করে না। এদিকে বাপের বাড়ির অবস্থাও 
অতি খারাপ। রামচরণ বোষ্টমের বিধবা স্ত্রী লোকের বাড়ি বি-বৃত্তি করিয়া 
ছুটি আপোগণ্ড ছেলেমেয়েকে অতি কষ্টে লালন-পালন করে। মেয়েটি মায়ের 


বিপদ ২৯ 


ঘাড়ে পড়িয়া আছে আজ একবছর । মা কোথা হইতে চালাইবে, কাজেই 
মেয়েটিকে নিজের পথ নিজেই দেখিতে হয়। 

একদিন আমাদের বাড়ির ঝি গয়লা-বৌকে কথায় কথায় জিগ্যেস করাতে 
সে বলিল-_হাজু নাকি আপনার বাঁডি থাকবে বলেছিল? 

_হ্্যা। বলেছিল একদিন বটে । 

--খবরদার বাবু, ওকে বাড়িতে জায়গ। দেবেন না, ও চোর | 

--চোর? কি রকম চোর? 

_ যা সামনে পাবে, তাই চুরি করবে। মুখুজ্যেবাডি রাখেনি ওকে, যা তা 
চুরি করে খায়, চধ চুরি করে খায়, চাল চুরি কবে নিয়ে যায়_আর বড্ড খাই 
খাই-_কেবল খাবো আর খাবো । ওর হাতীর খোরাক জোগাতে ন1 পেরে 
হখুজ্যের] ছাড়িয়ে দ্িয়েচে । এখন পথে পথে বেডাঁয়। 

--ওব মা ওকে দেখে না? 

--সে নিজে পায়না পেট চালাতি। ওকে বলেছে, আমি কনে পাবে! ? 
তুই নিজেরটা নিজে করে খাঁ। তাই ও দোরে দোবে ঘোরে। 

সেই হইতে মেয়েটির উপব আমার দযা হইল। যখনই বাড়ি আসিত” 
চাল বা ডাল, দু-চারটে পয়সা দিতাম। বার ছুই ছুপুরে ভাত খাইয়াও গিয়াছে 
আমার বাড়ি হইতে । 

মাসখানেক পরে একদিন আমাব বাড়িব সামনে হাউ হাউ কান্না শুনিয়া 
বাহিরে গেলাম। দেখি, হাজু কাদিতে কাদিতে আমাদের বাডির দিকেই 
আসিতেছে । ব্যাপার কি? শুনিলাম মধু চক্রবর্তী নাকি তাহার আর কিছু 
রাখে নাই, তাহার হাতে একটা ঘটি ছিল, সেটিও কাড়িয়া রাখিয়। দিয়াছে-- 
তাহাদের বাড়িতে ভিক্ষা কবিতে গিয়াছিল, এই অপরাধে । 

রাগ হইল। আমি গ্রামের একজন মাতব্বব, এবং পলীমঙ্গল সমিতির 
সেক্রেটারী ; তখনই মধু চক্রবন্তীকে ডাকিয়া পাঠাইলাম। মধু একখানা রাঙা 


৩৩ অসাধারণ 


গামছা! কাধে হন্তদস্ত হইয়। আমার বাড়ি হাজির হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম-- 
ষধু, তুমি একে মেরেচ ? 

-) দাদা, এক ঘা মেরেচি ঠিকই । রাগ সামলাতে পারিনি, ও আন্ত 
চোর একটি। শুনুন আগে, আমাদের বাড়ি ভিক্ষে করতে গিয়েছে, গিয়ে 
উঠোনের লঙ্কা গাছ থেকে কৌচড় ভরে কাচ। পাকা ঝাল চুরি করেচে প্রায় 
পোয়াটাক। আর একদিন অমনি ভিক্ষে করতে এনে, দেখি বাইরের উঠোনের 
গাছ থেকে একট! পাক! পেঁপে ভাঙচে, সেদিন কিছু বলিনি-আজ আর রাগ 
সামলাতে পারিনি দাদা । মেরেচি এক চড়, আপনার কাছে মিথো 
বলবো ন1। 

__নাঁ, খুব অন্যায় করেচ। মেয়েমানুষের গায়ে হাত তোল! ওসব কি? 
ইতরের মত কাণ্ড । ছিঃ--যাও, ওর কি নিয়ে রেখেচ ফেরৎ দাও গে যাও। 

হাজুকেও বলিয়! দ্রিলাম, সে ঘেন আর কোনে।দিন মধু চক্রবর্তীর বড়ি ভিক্ষে 
করিতে না যায়। 

এই সময় আকাল স্থরু হইয়া গেল। ধান-চাল বাজারে মেলে নাঁ, ভিখিপীকে 
মুষ্টিভিক্ষা! দেওয়া বন্ধ-। এই সময় একদিন হাজুকে দেখিলাম ছেলে কোলে 
গোয়ালাপাড়ার রাস্তায় ভিক্ষা করিয়া! বেড়াইতেছে । আমাকে দেখিয়া নিবোধের 
মত চাহিয়া বলিল--এই যে জ্যাঠামশায়। যেন মস্ত একট! সংবাদ দিতে 
অনেকক্ষণ হইতেই আমাকে খু'ঁজিতেছে। | 

আমি একটু বিরক্তির সহিত বলিলাম-_কি ? 

-.এই ! আপনাদের বাড়িও যাবে! । 

--বেশ । আমাদের বাড়িতে প্রসাদ পাবি আজ--বুঝলি? 

হাজু খুব খুশি । খাইতে পাইলে মেয়েটা! খুব খুশি হয় জানি। কাটালতলার 
ছায়ায় রোয়াকে সে যখন খাইতে বসিল, তখন ছুজনের ভাত তাহার একার 
পাতে । নিছক খাওয়ার মধ্য ষে কি আনন্দ থাকিতে পারে তাহা জানিতে 


বিপদ ৩১ 


হুইলে হাক্গুর সেদিনকার খাওয়া দেখিতে হয়। স্ত্রীকে বলিয়! দ্রিলাম__একটু 
মাছটাছ বেশি করে দিয়ে ওকে খাওয়াও-** | 

একদিন বোষ্টমপাড়ার হরিদাস বৈরাগীকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমাদের 
পাড়ার হাজু শ্বশুরবাড়ি যায় না কেন? 

--ওকে নেয়না ওর স্বামী। 

--কারণ? 

-_-সে নানান্‌ কথা । ও নাকি মন্ত পেটুক, চুরি করে হাড়ি থেকে খার। 
দুধের সর বসবার জো নেই কড়ায়, সব চুরি করে খাবে। তাই গাড়িয়ে 
দিয়েচে। 

-_ এই শুধুদোষ? আর কিছুনা? 

-এই তো শুনিচি, আর হে কিছু শুনিনি । তারাও ভাল গেরস্ত না। 
তাহোলে কি আগ ঘরের বৌকে কেউ তাড়িয়ে দেয় খাওয়ার জন্তে? তারাও 
তেমনি। 

কিছুদিন আর হাজুকে রাস্তাঘাটে দেখা যায় নি। একদিন তাদের পাড়ার 
বোষ্টমবৌ বলিল-_ শুনেচেন কাও ? 

_কি? 

--সেই হাজু আমাদের পাড়ার, সে যে বনগারে গিয়ে নাম লিখিয়েচে। 

আমি ছুঃখিত হইলাম। এদেশে নাম লেখ!নো বলে বেশ্ত।বৃত্তি অবলম্বন 
করাকে । হাজ্ভ অবশেষে পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করিল। খুব আশ্চর্যোর বিষয় নয় 
এমন কিছু, তবু ছুংখ হয় গ্রামের মেয়ে বলিয়া । এখানেই এ ব্যপারের শেষ 
হইয়। যাইত হয়তো, কারণ গ্রামে সব সময়ে থাকি-ও না, থাকিলেও সকলের খবর 
সব সময় কানেও আসে না। 

_. পঞ্চাশের মন্বস্তর চলিয়া গেল। পথের পাশে এখানে ওখানে আজও দু-একটা 
কঙ্কাল দেখা যায়। ত্রিপুরা জেলা হইতে আগত বৃতুক্ষ নিঃস্ব হতভাগ্যে রা 


৩২ অসাধারণ 


পৃথিবীর বুকে চিহ্‌ রাখিয়া গিয়াছে । এ জেলায় মন্বস্তরের মৃত্তি অত তীব্র ছিল 
না। যে দেশে ছিল, সে দেশ হইতে নিংম্ব নরনারী এখানে আসিয়াছিল, আর 
ফিরিয়? যায় নাই। 

পৌষ মাসের দিন। খুব শীত পড়িয়াছে। মহকুমার শহরে একটা পাঠাগারের 
বাধিক উৎসব উপলক্ষে গিরাছি, ফিরিবার পথে একটা গলির মধ্যে দিয় বাজারে 
আসিয়া উঠিব ভাবিয়া! গলির মধ্যে ঢুকিয়া কয়েক পদ মাত্র অগ্রসব হইয়াছি, এমন 
সময়ে কে ডাকিল-_ও জ্যাঠামশায । 

বলিলাম কে? 

--এই যে আমি-_ 

আধ অন্ধকার গলিপথে ভাল করিয়! চাহিযা দেখিবার চেষ্টা করিলাম । একটা 
চালাঘরের সামনে পথের ধারে একটি মেয়ে র্ীন কাপঙ পরিয়া ঈ্াডাইয়া৷ আছে, 
কাপড়ের রঙ অন্ধকারের সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে, আমি শুধু তাহার মুখের 
আবছায়া আদল ও হাত দুটি দেখিতে পাইলাম । 

কাছে গিয়া বলিলাম-কে ? 

বারে, চিনতে পারলেন না? আমি হাজু। 

হাজু বকিলেও আমার মনে পডিল না কিছু । বলিলাল-_কে হান্তু? 

সে হাসিয়া! বলিল__আপনাঁদের গীয়ের। বারে, ভূলে গেলেন? আমার 
বাবার নাম রামচরণ বৈরাগী । আমি যে এই শহরে নটা হয়ে আছি। 

এমন স্থুরে সে শেষের কথাটি বলিল, যেন সে জীবনের পরম সার্থকতা লাভ 
করিয়াছে এবং সে জন্য সে গর্ব অন্বভব করে। অর্থাৎ এত বড় শহরে নটী হইবার 
সৌভাগ্য কি কম কথা, না যার তার ভাগ্যে তা ঘটে? গ্রামের লোক, দেখিয়া 
বুঝুন তার রুতিত্বের বহরখান]। 

আমি কিছু বলিবার পূর্বেই সে বলিন- আহুন না, দয়া করে আমার ঘরে । 

--না) এখন যেতে পারবো না। সময় নেই। 


বিপদ ৩৩ 


--কেন, কি করবেন? 

_বাঁড়ি যাবে! । 

সে আবদারের সুরে বলিল_-ন1। আসতেই হবে। পায়ের ধুলে৷ দিতেই 
হবে আমার ঘরে । আস্থন-_ 


কি ভাবিয! তাহার সঙ্গে ঢুকিরা পড়িলাম তাহার ঘরে । নিচু রোয়াক খড 
ছাওয়া, রোয়াক পার হইয়া মাঝারিধরণের একটি ঘর, ঘরে একথানা নিচু 
তক্তপোষের ওপব সাজানে৷ গোছানে! ফস চাদর পাতা! বিছানা । দেওয়ালে 
বিলিতি সিগারেটের বিজ্ঞাপনের ছবি ছু-তিনখানা । মেমসাহেব অমুক সিগারেট 
টানিতেছে। একখানা ছোট জলচৌকির ওপর খানকতক পিতল-কাসার বাসন 
রেড়ির তেলের প্রদীপের অল্প আলোয় ঝক্‌-ঝকৃ্‌ করিতেছে । মেজেতে একটা 
পুবনে। মাছুর পাতা । ঝেষ্টমের মেয়ে, একখানা কে্টঠাকুরের ছবিও দেওয়ালে 
ট।ঙানো৷ দেখিলাম । ঘরের এক কোণে ডুগিতবলা এক জোড়া, একটা হাঁক, 
টিকে-তামাকের মালসা, আরও কি কি। 


হাজু গর্বের স্বরে বলিল-_এই দেখুন আমার ঘর__ 

_ বাঃ, বেশ ঘর তো। কত ভাড়া দিতে হয়?“ 
সাড়ে সাত টাকা। 

_বেশ। 

হাজু একঘটি জল লইয়া আসিয়া বলিল-_-পা ধুয়ে নিন-__ 


_কেন? পা ধোয়ার এখন কোনো দরকার দেখচিনে। আমি এখুনি 
চলে যাবো । 

--একটু জল খেয়ে যেতে হবে কিন্ত এখানে জ্যাঠামশায়। 

এখানে জলযোগ করিবার প্রবৃত্তি হয় কখনো ? পতিতার ঘরদোর । গ! 
ঘিন্‌ ঘিন্‌ করিয়া উঠিল। বলিলাম--না, এখন কিছু খাবো না। সময় নেই-_ 


৩. 


৩৪ অসাধারণ 


হাজুসে কথা গায়ে না মাখিয়! বলিল--তা হবে না। সে আমি শুনচি 
নে কিছুতেই শুনবে! না-_বস্থন-_ 

তাহার পর সে উঠিয়া জলচৌকি হইতে একটা চারের পেয়ালা তুলি 
আনিয়া সযত্বে সেটা আচল দিয়া মুছিয়া আমাকে দ্রেখাইয়া৷ বলিল-_দেখুন, কিনিচি 
--আপনাকে চা করে খাওয়াবো এতে_ চা করতে শিখি চি। 

ড্রেসডেন চায়না নয়, অন্য কিছু নর, সামান্য একটা পেয়াল! । হাজুর মনস্তষ্টর 
জন্য বলিলাম-_-বেশ জিনিস, বাঃ__ 

ও উৎসাহ পাইয়া আমাকে ঘরের এ জিনিস ও জিনিস দেখাইতে আরম্ত 
করিল। একখানা আয়না, একটা টুকনি ঘটি, একটা স্ুদৃশ্ত কৌটা ইত্যাদি । 
এটা কেমন ? ওট। কেমন ? সে এসব কিনিয়াছে। তাহার খুশি ও আনন্দ দে খিয়। 
অতি তুচ্ছ জিনিসেরও প্রশংসা ন। করিয়া পারিলাম না । এতক্ষণ ভাবিতেছিলাম, 
ইহাকে এ পথে আসিবার জন্ত তিরস্কার করি এবং কিছু সহ্ূপদেশ দিয়া জ্যাঠা- 
মশায়ের কর্তব্য সমাপ্ত করি । কিন্তু হাজুর খুশি দেখিয়া! ওমব মুখে আসিল না । 

যে কখনো! ভোগ করে নাই, তাহাকে ত্যাগ করো! যে বলে, সে পরমহিটষী 
সাধু হইতে পারে ॥ কিন্তু সেজ্ঞাপী নয়। কাল ও ছিল ভিথার্দিণী, আজ এ পথে 

আসমিয়৷ ওর অন্নবস্ত্রের সমস্তা ঘুচিয়াছে, বাল যে পরের বাড়ি চাহিতে গিরা 
গ্রহার খাইয়াছিল, আজ সে নিজের ঘবে বসিয়৷ গ্রামের লোককে চ| 
খাওয়াইতেছে, নিজের পরণায় কেন! পেস্সালা৷ পিরিচে--বার বাবাও কোনোদিন 
শহরে বাস করে নাই ঝা পেয়ালার চা পান করে নাই । ওর জীবনের এই পরম 
সাফল্য ওর চোখে । তাহাকে তুচ্ছ করিয়া, ছোট করিয়া শিন্া করিবার ভাষ। 
আমার জোগাইল ন1। 

সহ্বল্প ঠিক রাখ। গেল না। হাজু চ। করিয়া আনিল। আর একখানা কাসাব 
মাজা রেকাবিতে স্থানীয় ভাল সন্দেশ ও পেঁপে কাটা। কত আগ্রহের সহিত সে 
আমার সামনে জলথাবারের রেকাবি রাখিল। 


বিপদ ৩৫ 


সত্যিই আমার গ! ঘিন্‌ ঘিন্‌ করিতেছিল। 

এমন জায়গায় বসিয়া কখনো খাই নাই। এমন বাড়িতে । 

কিন্তু হাজুর আগ্রহভরা সরল মুখের দিকে চাহিয়া! পাত্রে কিছু অবশিষ্ট 
রাখিলাম না। হাজু খুব খুশি হইয়াছে-_তাহার মুখের ভাবে বুঝিলাম। 

বলিল--কেমন চা করিচি জ্যাঠামশায়? 

চা মোটেই ভালো! হয় নাই--পাড়াগেঁয়ে চা, না গন্ধ, ন। আন্বাদ । বলিলাম-- 
কোথাকার চা? 

-_-এই বাজারের। 

তুই নিজে চাখাস? 

_্ ছুটি বেলা চা না খেলে সকালে কোনো কাজ করতে পারিনে, 
জ্যাঠামশায় । 

আমার হাসি পাইল। সেই হা !-****, 

ছবিটি যেন চোখের সামনে আবার ফুটিয়া উঠিল। রায়বাড়ির বাহিরের 
ঘরের গার কাছে বসিয়া খোলাস্থদ্ধ তরমুজের টুকরা হাউমাউ করিয়। 
চিবাইতেছে। সেই হাজু চা না খাইলে নাকি কোনো কাজে হাত দিতে 
পারে না। 

বলিলাম_-তা হোলে এখন উঠি হাজু। সন্দে উৎরে গেল। আবার 
অনেকথানি রাস্ত। যাবো । 

হাজুর দেখিলাম, এত শন্ত্র আমাকে যাইতে দিতে অনিচ্ছা । গ্রামের এ 
কেমন আছে, সে কেমন আছে, জিজ্ঞাসাবাদ করিল। বলিল--একটা কথা 
জ্যাঠামশায়, মাকে পাঁচটা টাক! দেবো, আপনি নিয়ে যাবেন? লুকিয়ে দিতে 
হবে কিন্ত টাকাটা । পাড়ার লোকে না জানতে পারে। মার বড় কষ্ট। আমি 
মাসে মাসে যা পারি মাকে দিই। গত মাসে একখান! কাপড় পাঠিয়ে দিলাম । 

--কার হাতে দিয়ে দিলি? 


৩৬ অসাধারণ 


- বিনোদ গোয়ালা এসেছিল, তার হাত দিয়ে লুকিয়ে পাঠালাম । 

- তোর ছেলেটা কোথায়? 

মার কাছেই আছে। ভাবচি, এখানে নিয়ে আসবো। সেখানে খেতে- 
পরতে পাচ্চে না। এখানে খাওয়ার ভাবন নেই জ্যাঠামশায়, দোকানের খাবার 
খেয়ে খেয়ে তো অছেদ্দা হোল। সিঙ্গেড়৷ বলুন, কচুরি বলুন, নিমকি বলুন-_-তা 
খুব। এমন আলুর দম করে ওই বটতলার খোট্টা দোকানদার, অমন আলুর দম 
কখনো খাই নি। এই এত বড় বড় এক একটা আলু--আর কত রকমের মশলা 
--আপনি আর একটু বসবেন? আমি গিয়ে আলুব দম আনাবো? খেয়ে 
দেখবেন। 

নাঃ, ইহার সবলত! দেখিয়াও হাসি পায়। রাগ হয় না ইহার উপর। 
বলিলাম _না, আমি এখন যাচ্চি। আর ওই টাকাটা আমি নিয়ে যাবো না, 
তূমি মনিঅর্ডার করে পাঠালেও তো পারো । অন্ত লোকে দেবে কি না দেবে-_ 
বিনোদ যে তোমার ম'কে টাক] দিয্লেচে কিনা, তার ঠিক কি? 

হাজুর এ সন্দেহ মনে উঠে নাই এতদ্িন। বলিল--ষা বলেচেন জ্যাঠামশ|ই, 
টাকাট। জিনিসটা তে। এর ওর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিই। মা পায় কি না পায় 
তা কিজানি। 

-_এ পর্যন্ত কত টাক] দিয়েচ ?' 

__তা কুড়ি পচিশ টাকার বেশি। আমি কি হিসেব জানি জ্যাঠামশাই ? 
মা কষ্ট পায়, আমার তা কি ভালো লাগে ? 

স্পকার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিস ? 

হাজু সলজ্জ মুখে চুপ করিয়া রহিল। বুঝিলাম আমাদের গ্রামের লোকজন 
ইহার নিকট যাতায়াত করে। 

বলিলাম- _আচ্ছা, দে সেই পাচটা টাকা । চলি - 


বিপদ ৩৭ 


_আঁবাঁর আসবেন জ্যাঠামশায়। বিদেশে থাকি, মাঝে মাঝে দেখে শুনে 
যাবেন এসে । 

গ্রামে ফিরিয়া হাজুর মায়ের সঙ্গে দেখ। করিয়া টাকা পাঁচটি তাহার হাতে 
দিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম-_-আ[র কেউ তোমাকে কোনে। টাক। দিয়েছিল? 

হাজুর মা আশ্চর্য হইয়া বলিল--কই না। কে দেবে টাকা? 

বিনোদ ঘোষের নাম করিতে পারিতাম। কিন্তু করিলে কথাটা জানাজানি 
হইয়া পড়িবে । বিনোদ ভাবিবে আমারও ওখানে যাতায়াত আছে এবং হাজুর 
প্রণয়ীদের দলে আমিও ভিড়িয় গিয়াছি এই বয়সে । কি গরজ আমার? 


-জম্মদিন 

আজ সকালের দিনটাই যেন কি রকম। 

যা-কিছু করবার ছিল, শেষ হয়ে গিয়েছে রায় বাহাদুরের, প্রথম যৌবনে যখন 
রাতুলপুর লালমোহন একাডেমির তিনি হেড-মাষ্টার__মাঁসিক বেতন ত্রিশ টাকা 
মাত্র, তখন সেই রাতুলপুরের স্কুলে পায়া-ভাঙা চেয়ারে বসে সম্মুণস্ত নিবিড বাঁশ- 
বনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে কত কি দেখতে পেতেন সিনেমার ছবির মত । 
দেখতেন, এ দুঃখ থাকবে না, জীবন আমচে সামনে; সে জীবনে কলকাতায় 
তাঁর ভিল! হবে বালিগণ্জে, মোটর থাকবে, কলিং-বেল টিপলে উদ্দিপর। খানসামা 
ঘরে ঢুকবে। তখন ছিল স্বপ্ন, শ্বপ্ন ছিল অপুর্ব রঙে রডীন। 

আজ তার বয়ে একফট্রি। আজ একষটিতে পা দিলেন। লেক প্লেসেব 
বাড়ীর, নতুন বাড়ীর তেতালায় যে ছোট ঘরটি তার শোবার ঘর, দে ঘবে আজ 
ভোরে জেগে উঠেই দেওয়ালের কা/লেগডাবের দিকে চোখ পডতেই রায বাহাছুর 
দেখলেন আজ সাত়াশে আধয|ট, তেরশে! বাহান্ন সাল। একষটি বছরে পড়লেন 
তিনি আজ। 

সকালটা! কিন্তু মেঘাচ্ছন্ন নয়। দিব্যি রোদ উঠেচে বাড়ার ছাদের মাথায়, 
পোদালি গাছগুলোর মগ-ডালে। মন কেমন চঞ্চল হয়ে উঠলে৷ চা-পানের পর 
বাডী থেকে বেরিয়ে পড়লেন। ছোট মেয়ে স্থমিতা বলেছিল--বাবা১ টোস্ট 
ভাজ! হচ্ছে, হুখান। খেয়ে যাও চায়ের সঙ্গে-- 

--নাঃ। ও কি মাখন ?, আজ-কাল মাখন বলে যা বিক্রি হয় ও-দিয়ে 
টোস্ট আমাদের ধাতে সয় না। তোরা খা 

বলে রায় বাহাছুর বেরিয়ে পড়েচেন। 

খানিকটা এ-দিক্‌ ও-দিক্‌ ঘুরে রায় বাহাদুর লেকের ধারের বেঞ্চিতে এসে 


জন্মদিন ৩৯ 


বসলেন। একখানা মিলিটারি বো কিছু দূরে ভাসাতে চেষ্টা করচে। একখানা 
লরি নিকটের রাস্তায় স্টার্ট দেওয়ার প্রচেষ্টায় প্রচুর গ্য/দ ও শব্দ ছাড়নে। নাঃ, 
কোথ।ও যদি একটু শাস্তি আছে। 

একষটি হোল তা হোলে । যখন তিনি ষোল সতের বছরের ছোলে, তখন 
মনে আছে কারো বয়েস বত্রিশ কি চৌত্রিশ বছর শুনলে তাঁকে প্রৌঢ় বলে মনে 
হোত। চগ্লিশ বছরের লোক তে ছিল বুদ্ধের মধ্যে গণ্য। আর এরই মধ্যে 
তার একঘট্টি ধছর বয়েস হয়ে গেল? নিজেকে খুব বেশি বুড়ো বলে মনে করতে 
পারছেন লা রায় বাহার । সে-দিনও তে। ধন্মতলার চুলকাটার সেলুনে বসে 
চুল ছাটিয়েছেন--কত দিন আর হবে? বাধ বাহাছবব মনে মনে একটা! মোটামুটি 
হিসেব করবার চেষ্টা করলেন। কাণী থেকে এসেচেন সে-বার। বেশ মনে 
আছে। লেসলির বাড়ীতে তার শালাকে সে-বার চাকুরী জুটিয়ে দিলেন গণেশ 
সরকারের সাহায্যে। গণেশ সরকার তার সহপাঠী, দু'জনে একসঙ্গে সে-কালের 
সিটি কলেজে পডেছিলেন, গণেশ সরকার লেমলির বাড়ী বড চাকরী করতো-_- 
এখন অবসর নিয়েচে। গণেশেরও বধেস তে৷ হোল যাট-একফটি । ছু'এক বছর 
কম বা ছ'এক বছর বেশি। ওতে কিছু যায় আসে না। 

সেটা হবে ১৯২৯ সাল, দেখছে, দেখতে পঁচিশ বছর হয়ে গেল-_নিতান্ত কমই 
বা কি? ভাবলে মনে হয়__সেদিনকার কথা। হিসেব করলে দেখা যায়, 
হাঁশুড়ার পুলের তলা দিয়ে অনেক জল চলে গিয়েচে তাঁর পর। 

তবে ওই যা ভাবছিলেন রার বাহাছর। বরেস হোলে কি হবে, আর পাঁচ 
জন বুড়োর মত তিনি নন। এমন কি পঞ্চান্ন ছাগ্সানন বছরের লোককে তিনি 
অনেক সময় বুড়ো বলে উল্লেখ করে থাকেন। নাতি ও ছেলেমেয়ের কাছে 
বলেন--সেই বুড়ো নাপিতটা আজ এসেছিল রে? নিজের চেয়ে দু'এক বছর 
কম বয়সের লোককে বলেন-_আরে একেবারে বুডে। মেরে গেলে যে! ছ্যা হ্যাঁ 
দাতগুলে৷ সব খুইয়েচ দেখচি। 


৪০ অসাধারণ 


তার ঈাত এখনো অটুট আছে। ফীীতেই নাকি যৌবন, তিনি মনে মনে 
ভারেন এবং পাচ জনকে বলেও বেড়ান। নিজের কাছে এই সত্যটা প্রমাণ 
করবার জন্তে তিনি মাঝে মাঝে পার্কে নির্জনে বসে চানাচুর ডাল-বাদাম-ভাজা 
কিনেও খেয়ে থাকেন। 

--এই, কি দিচ্ছি ও? ছুটে ডাল-ভাজা বেশি করে দ্িন্। টাকার 
ভাঙানি নেই? ব্যাটার সব ডাকাত । চার পয়দার ডাল বাদাম নিলাম, বলে 
কি না টাকার ভাঙানি নেই! এই নে- যা" 

বেশ জায়গা! করেচে এই লেক। এই বেঞ্চিখানা! বড় ভালো লাগে । মাঝে 
মাঝে এখানে এসে বসেন। নিজ্জনে বসে থাকতে ও ভাবতে বেশ লাগে। 
বাড়ীতে বড় গোলমাল, বসে ভাববার সময় নেই। ভাববার কথা অনেক কিন্তু 
বাইরের ঘরে ছেলে ও নাতিদের পড়ার মাস্টার এসে গিয়েচে এতক্ষণ__স্থমিতার 
ঘরে স্থমিতার বন্ধু অলোক] ও ডাক্তার বাবুর নাতনি বেল। এসে গিয়েচে। অত 
গজ-গুজ. ফুস্‌ ফুস্‌ কেন? স্মিতার মাথ। বিগড়ে দেবে ওই ডাক্তার বাবুর 
ধিঙ্গী নাতনীটা। কমিউনিস্ট! সেদিন কোথা থেকে একটি গাদা ওই সব 
কমিউনিস্ট বই-পত্বর স্থমিতার বিছানায় । আজকাল ক যে হচ্চে দেশে! 
মেয়েছেলেদের মধ্যেও কি ন1 ওই সব! 

এই তো! গেল বাইরের ঘরের কথা । যদি বাইরের বারান্দায় বেতের চেয়ারে 
বসবেন, তবে অমনি প্রতিবেশী বুদ্ধ ভুবন বাবু এসে জুটবে। 

-এই যে রায় বাহাছুর। বসে আছেন নাকি? তামাক খাবেন না 
সকালবেলা? আজ কাগজ দেখেননি এখনা.”ওকিনাওয়ার ব্যাপারটা 
দেখেচেন? ঘোল খাইয়ে ছাড়লে আমাদের বাবাজিদের। চা ?.*"তা হয় হোক, 
আপত্তি নেই। 

নয়তো অবিনাশ দালাল এসে বলবে রায় বাহাদুর, কেমন আছেন? বেশ, 
ভালো ভালো। শুনে খুশি হোলাম। আর আমাদের এখন- ইয়ে, একট! 


জন্মদিন ৪১ 


কথা। হরিশ মুখুজ্যে রোডের বাড়ীখান। একবার দেখবেন? আজই যেতে 
হয়। ওদের এটপিরা বড্ড প্রেদ করচে। কাল আপনাকে ভাবলাম একবার 
ফোন্‌ করি। কণটার সময় স্থুবিধে হবে? ওর চেয়ে ভালে আর পাবেন নাঁ_ 
তবে বায়নার আগে রেজিদ্রী আফিসগুলে৷ একবার সার্চ করতে হবে। সে আমি 
করিয়ে দেবো, আপন|কে কিছু করতে হবে না। চা? এত বেলার--আচ্ছা, 
তা-চিনি কম দিয়ে, হ্যা 


কিংব1 আসবে গলির জীবন মুখুজ্যে, ওর ভাইপোর একটা চাকরীর জ্ন্যে 
অনুরোধ করতে । তিনি যত বলেন আজকাল তার হাতে কিছু করবার নেই, 
চাকরী কোথা থেকে করে দেবেন_ততই তাকে আরও চেপে ধরে। বাড়ীর 
ভেতরে যে থাকবেন, সেখানেও বিপদ কম নয়। গৃহিণীর নানা রকম তাগাদা -- 
ভাগনে-জামাইয়ের বাড়ী তত্ব না পাঠালে নয়, ওপরের ঘরের পাখাখান। মেরামত 
করে দাও-_নানা ফৈজৎ। 

তাঁর চেয়ে এই বেশ আছেন। 

পাশের বেঞ্চিতে একজন বুদ্ধ লোক নাক টিপে বসে জপ কিংবা প্রাণায়াম 
করচে। ওদিকের বেঞ্িতে একটি যুবক বসে লেকের জলের দিকে চেয়ে রয়েচে। 
এত সকালে আর কোনে দিকে কোনো লোক নেই। 


হ্যা, যা ভাবছিলেন। জীবনটা যেন কি রকম হয়ে গেল। রাতুলপুরের 
সেই দিনগুলি এই সকালবেলার রোদের মত স্বপ্রমাথা ছিল। এখন সে স্বপ্নের 
আবেশও স্মৃতি থেকে টেনে আনতে পারেন না। সেই রাতুলপুরের স্কুলের চটা- 
ওঠা দেওয়ালটা। নবীন নাপিত চাকর ঘণ্টা বাজাতো।। তার জন্তে টিফিনের 
সময় বাজার থেকে নিমকি রসগোল্লা! এনে দিত। নবীনের ছেলেটি মার1 গেল 
টাইফয়েডে, ফ্রি পড়তো স্কুলের নিচের ক্লাসে । তার জন্তে একদিন স্কুল বন্ধ 
হোল। হেডমাস্টার ছিলেন গুরুচরণ সান্তাল। অনেক দিনের প্রবীণ শিক্ষক ॥ 
তাকে বলতেন, আপনি হচ্ছেন ইয়াংম্যান, কেশববাবু, এ সব স্কুলে আপনার 


৪২ অসাধারণ 


পোষাবে না। এ সব কাজ কাদের জানেন, যাদের ভবিদ্যৎ বলে কিছু নেই। 
যেমন ধরুন আমাদের । এ বয়েসে কোথায় যাচ্চি বলুন! 

বেরিয়েছিলেন রাতুলপুর স্কুল থেকে তার পরের বছরেই। ভবিষ্যতের 
সন্ধানে। ভবিষ্যৎ তাকে একেবারে প্রতারণা করেশি। অনেকের চেয়ে তার 
সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেচে। কিন্তু আজ মনে হচ্চে, সব দিয়েও ভবিষ্যৎ তাকে 
যেন কিছুই দেয়নি । তার স্বপ্রকে কেডে নিষেচে, আশাকে কেড়ে নিয়েছে, 
ফুরিয়ে গিয়েচেন ছিনি, নিঃশেষে ফুরিয়ে গিয়েচেন | যে ভবিঘৎ আজ অতীত, 
তাতে তিনি জেতেননি--ঠকেচেন। 

আজ তীর বয়দ--থাক বয়সের কথা । ওটা মব সমর মনে না করাই ভালো । 
বয়সের কথা মনে না আনবার জন্যেই তিনি পার্কে বপা ছেড়ে দিয়েচেন। তব 
বাড়ীর কাছে একটা পক আছে, ছোট পার্কটাতে লেক-পাড়ার পেনসনপ্রাপ্ত জজ, 
সবজজ, ডেপুটি ম্য।জিস্টেট, বন্ড কেরাণী প্রন্ৃতি বৃদ্ধের দল নিয়মিত ভাবে 
বেড়াতে আসে । এ-বেঞ্চিতে ও-বেঞ্চিতে বসবে আর সামাজিক ও শারীরিক 
কথাবার্তা বলবে । অনুকের নাতনির বিয়ের কি হোল, অমৃকের নাতনি এবার 
ম্যাট্রিকে বৃত্তি পেয়েচে ৷ মেয়ে ছেডে ওরা নাতনিনে নেমেচে । নাতনি সম্বন্ধে 
এমন উচ্ছুসিত হবে যেন কারো নাতনি কোনো দিন ম)ট্রিক পাশ করেনি । সব 
নাতনিই অসাধারণ, সাধারণ নাতনি একটাও চোখে পড়েনি । নাতনির প্রসঙজের 
পরে উঠবে বাতের প্রসঙ্গ, দাতের ব্যথার গ্রসঙ্গ, রক্তের চাপের প্রসঙ্গ । যমদূত 
ষেন দণ্ড উচিয়ে বসে আছে পার্কটার প্রত্যেক বেঞ্চিখানার ওপরে । সে 
আবহাওয়ায় বসলেই মনে হয়-- 

“এবার দিন ফুরুলে। 
সম্ৰে চলে। 
ইহকাল পরকাল হারিও না-_” 
কিংবা-পমনে কর শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর” 


জন্মদিন ৪৩, 


কিংবা--“বাশের (দ/লাতে উঠে কে হে বটে 
যাচ্চ তুমি শ্বশানঘাটে” 
ইত্য।দি। -* 


দিন কতক গিয়ে খাই রায় বাহাদুর আর ওই সব ক্ষুদ্র সামাজিক পার্কে 
যান না, বেখানে বাত-ব্যাধিগ্স্ত পেন্সনভে।গী বৃদ্ধদের বাতারাত। তার চেয়ে 
আসেন তিনি এই লেকের ধারে, শ্যাম-বনকুপ্ধ পাও রে। হরিত্রর্ণ দ্বীপটি জলের 
এক দিকে, কত স্থগঠিত দেহ তরুন কত প্রণয়»পল। তরুণী কলেজের ছাত্রী আসে- 
যায়। ওর়াকাইয়ের দল কলহান্তে চটুলপদে বেড়ার মাঝে মাঝে, ঠোটে রং, 
খাকির আটসাট পোষাক পরনে ৷ না, এখানে লাগে ভাল। যৌবনের হাওয়! 
বয় সর্বদা! ! 

তিনি এখনে! বাচবেন অনেক দিন । হাত দেখিয়ে বেড়ান এখানে সেখানে 
রায় বাহাছুব, সেদন কজ্জন পার্কে এক উড়িয়া জ্যোতিষী তাকে বলেচে। তা 
ছাড়া এ তিনি ভানতেন। তার আষু যে প্রার নবব,ইযের কাণ ঘেঁসে যাবে» 
জ্যোতিষী না বললেও তা তিনি জ,নেন। 

আজ এত পয়স৷ রোকুগার করেও, কলকাতার এত বড় বাড়ী করেও, ভি 
এইট্‌ ফোর্ড চাঁণিয়েও মনে হচ্চে রাতুলপুরের সেই দিনগুলো চব্বিশ বছরের 
সতেজ যৌবন নিয়ে যদি আবার ফিরে আসতো...সেই বাশবনের দিকে চেয়ে স্বপ্ন 
দেখা***চং ঢং করে ঘণ্টা বাজাতো! নবীন নাপিত ..কত নির্জনে বসে জীবনের 
ভবিষ্যত্রর স্বপ্নে বিভে!র হয়ে থাকা... 


তখন ছিলেন গরীব স্বুল-মাষ্টার, আজ তিনি বড়লোক । স্কুল মাষ্টারি ছেড়ে 
এক বন্ধুর পরামর্শে ব্যবসা ধরলেন, ইনসিওরেন্সের কোম্পানী খুললেন নিজে, বড় 
আপিন হোল, ধুলোমুঠো ধরলে সোনামুঠো হোতে লাগলো! । দেশহিতকর কাজও 
ছু'চারট। যে না করেচেন এমন নয়, পয়সা যথেষ্ট হয়েচে । ছেলেরা বলে-_ভালো 


8৪8 অসাধারণ 


গাড়ী কিনুন বাবা। একখান! মার্সেডিজ, বেন্জ দেখে এলাম কাল-_খরগোষের 
মত নিঃশব্দে চলে-_কি ফোর্ড গাড়ীতে চড়বেন চিরদিন ! 

যুদ্ধের আগেকার কথা অবিশ্তি। তেলের অভাব ছিল কি? 

কিছু ক্যালকাটা প্রপার্টিজও করলেন, যার জন্যে কলকাতার বড় লোকেরা হা 
করে থাকে । বাড়ী বিক্রি থাকলেই রায় বাহাদুর কিনবেন। এটির আপিসে 
গিয়ে হয়তো! জানা! গেল বাড়ী থার্ড মর্টগেজ। প্রথম ছই বন্ধকী খতের টাকা! 
€শোধ দিয়েও বাঁড়ী কিনেচেন, জেদের বশবর্তী হয়ে। দিনকতক জমি কেনাবেচা 
আরম্ভ করলেন। এই লেক অঞ্চলে, বালিগঞ্জ ষ্টোর রোডে, গড়িয়াহাট। অঞ্চলের 
'অনেক বাড়ী তার জমির ওপরে । এসব কাজে ঠকেচেনও অনেক, দায়শৃন্ত ভেবে 
যে সম্পত্তিতে হাত দ্িয়েচেন, রেজিস্্ী আপিস অনুসন্ধান করে দেখ! গেল তার 
অবস্থ! কাহিল। মানুষকে বিশ্বাস কর! যে কত বিপজ্জনক ! 

আজ সব করেও তিনি ফুরিয়ে গিয়েচেন। বড় ছেলে আপিন বেরোয়। 
ভালো কাজ বোঝে, তার অভাব কেউ অন্ভব করে ন। আপিসে, ঘরেও না। 
মেয়ে-ছেলের! এখন মালিক হয়েছে, নিজেরাই ব্যবস্থা করে, তাকে জিজ্ঞেমও করে 
না অনেক সময়। কেবল গনী এখনো পুরোনে। দিনের স্থুর বজায় রেখেচেন, 
তাকে না হুকুম করলে গিশ্নীর চলে না। মুখ নাড়া মুখ-ঝাড়! সব তাঁরই ওপরে । 
আসলে পুত্রবধূদের প্রতাঁপে তিনিও প্রায় অদ্ধ বাতিল। স্থন্দরী বড় পুত্রবধূটির 
দ্রাপট সবচেয়ে বেশি, কলেজে-পড়া! মেয়ে, মুখের কাছে কেউ এগোতে পারে না, 
মুখের সৌন্দর্যে ব্রিতুবন জয় করতে পারে। বাড়ীর ঝি-চাকর তার কথায় মরে- 
বাচে। বুড়ো-বুড়ীকে বড় কেউ একটা গ্রান্থের মধ্যে আনে না। 

তাই তে। বলচেন, তিনি ফুরিয়ে গিয়েচেন। একষট্ি বছরেই ফুরিয়ে 
গেলেন। 

আজ গাড়ীর পঞ্চম চক্রের মতই তিনি অনাবশ্তক। ওই রাতুলপুরে তিনি 
প্রথম প্রেমে পড়েন। পুরুত-গিরি করতেন বিশেশবর চক্রবর্তী, তার মেয়ে, নাম 


জন্মদিন 8৪৫ 


নিরুপমা। সহরের তুলনায়--তার বড় পুত্রবধূ প্রতিমার তুলনায় হয়তো নিকপম 
তত কিছু ছিল ন] তবুও সে হুন্দরী ছিল, মুখশ্রী। কিন্ত চমৎকার । বাড়ীতে আর 
কেউ থাকতো! না পুরুত ঠাকুরের, নিরুপমার সঙ্গে বুড়ে৷ জলপাই গাছের তলার 
দুপুরের ছায়ায় লুকিয়ে দেখ। হোত মাঝে মাঝে । ষোল বছরের সুশ্রী কিশোরী । 

এক দিন নিরুপম। ছুটি পাক আতা ছ"হাতে নিয়ে এসেছিল । হেসে বল্লে 

--তুমি আতা খাও? 

-কেন খাবো না? 

_-এই নেও। আমাদের গাছের আত] । 

_শুধু আতা দিলে আতা নেবো ন1-_ 

নিরুপম! চোখ বড় বড় করে বললেশশ্তবে কি? 

--আর কিছু দিতে হবে এ সঙ্গে__ 

_কি? 

--এই দেখিয়ে দিচ্ছি কি-_সরে এসো-- 

_-ধ্যেৎ_ভারি ছুট তো!” 

হাত ছাড়িয়ে নিরুপমা ছুটে পালিয়ে গেল হৃরিণীর মত চুল গছিতে। 

আর এক দিন। 

বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তা সেদিন তীর মায়ের তিথি উপলক্ষে ব্রাহ্মণভোজনে গ্রাম 
মা্টারটকেও নিমন্ত্রণ করেচেন। খেতে বসেচেন ভাবী রায় বাহাছুর। পরিবেষণ 
করচে নিরুপমা, আরও পাঁচ-ছ? জন ব্রাহ্মণ একত্র খেতে বসেচে। হঠাৎ খেতে 
খেতে মুখ তুলে দেখলেন নিরুপম1 ঘরের মধ্যে জানালার কাছে দ্রাড়িয়ে একদৃষ্টে 
তার দিকে চেয়ে আছে। উনি ঈষৎ হেসে ফেলতেই নিরুপমাও মৃহ হেসে 
জানাল! থেকে সরে গেল । 

কালগকার কথা বলেই মনে হচ্ছে। 

অথচ কত কাল হয়ে গেলস্স্চলিশ বছর ! 


৪৬ অপাধারণ 


আজও চোখ বুজলে নিরুপমার সে সলজ্ঞ ছুষ্টমিব হাসি তিনি দেখতে পান । 

এক-মআাধ দিন নয়, এ রকম কত ঘটন1 ঘটেছিল এক বছর ধরে। নিরুপমার সঙ্গে 
তার বিবাহের প্রস্তাবও হয়েছিল। বিবাহ হয়েও যেতো কিন্তু গ্রামের বিধুভূষণ 
মজুমদার এক সামাজিক জোট পাকালেন। রায় বাহাদুর কিশোরকুণি থাকের 
ব্রাহ্মণ, অর্থাৎ কুষ্ণনগবের রাজারা যে বংশের তখনকার আমলে কিশোরকুণি 
থাকের পান্রকে কুলীনেরা কন্ঠাদান করতেন না। সেকালে এমনিই ছিল। বিবাহ 
ভেঙে গেল। রায় বাহার বিদেশী লোক, কেউ তাকে খবর দেওয়ার ছিল 
না। বিবাহের দিন নিরুপম| কেঁদেছিল, না, কাদেনি? 

শুধু এই সংবাদটা পাবার জন্তে রায় বাহাদুর কত চেষ্টা করেচেন, কেউ এ 
সংবাদ তাকে দিতে পারেনি । আর কখনো নিকপমার সঙ্গে তার দেখাও 
হয়নি। 

কেই বা তাকে সংবাদ এনে দেবে? 

এই ঘটনার কিছু দ্দিন পরে রায় বহাঁদুর সে গ্রাম ত্যাগ কবে আসেন । 
আর যাননি কোনো দ্রিন। জীবনের প্রথম প্রেম, সে সব দিনের কথা ভাঁবলেও 
হারানো যৌবন আবার ঘিরে আসে যেন। 

ওখান থেকে চলে আসবার পব তিনি কত বার ভেবেচেন, নিক আজ কোথায় 
আছে? কেমন আছে? তার জন্ত শির কি ভেবেছিল? 

এ সংবাদ তকে আর কেউ দেয়নি। বিবাহ কবেছিলেন বড লোকের সুন্দরী 
মেয়েকে | কিন্তু নিক্ুকে ভোলেন নি কোনে দ্দিন। প্রথম প্রথম খুবই ভাবতেন. 
মধ্যে দশ-বিশ বছর আর ভেমন ভাবতেন না, অর্থ উপার্জনের নেশা ভূলে 
ছিলেন। এখন আবার মাঝে মাঝে মনে হয। 

একটি তরুণ যুবক এসে কিছু দূবে একট! নারকো'ল গাছের তলাষ দীডালো! | 
এদিকে ও-দিকে চেয়ে যেন সে কাউকে খুজচে। রায় বাহাদুর সচকিত হয়ে 
উঠলেন। ছোকরা নিশ্চয়ই ওর প্রেমিকার সন্ধানে এসেচে। তীর ছোট ছেলে 


জন্মাদন ৪৭ 


অমিরজীবনের বয়সী । আজকাল অমনি হয়েচে যে। তীদের সময়ে কিছুই 
ছিল না। তরুণী অভিসারিকাদের পক্ষে শ্বর্ণয্গ চলেচে এটা । কই, ছোকর! 
এক] বসে আছে উদ্দত্রাস্ত ভাবে, তিনি কই? মানে, মা লক্ষ্মীটি? এখনো 
আদেন না কেন? 

আজ রায় বাহাদুরের ইচ্ছে হোল রাতুলপুর যাবেন। একবার গিয়ে দেখে 
আসবেন। তার মনে হচ্ছে, চল্লিশ বছর যেন কেটে যায়নি, যেন তিনি নব্য 
যুবকই আছেন, ভ্রমরকৃষ্ণ গুম্চ আছে তাঁর, যেন তিনি ব্রাডগ্রেসারে ভুগছেন ন। 
আজ ছ' বছর, যেন তার বাত হয়নি সেবার আশ্বিন মাসে এবং বাতে কিছু দিন 
শধ্যাশারী হয়ে ছিলেন না--যেন রাতুলপুরের আম শিমুল জাম কাটালের ঘন 
চায়ানিকুপ্ে চিরযৌবনা নিরুপম। আগও কিশোরী, তারই আশায় পথ চেয়ে 
বসে আছে। 

গাছতলার সেই যুবকটি কিছু দূরে একট! বেঞ্চির ওপর হতাশ ভাবে বসে 
পড়েচে। বেচারী ! 

সেই রাতেই রায় বাহাছুর মনে মনে ঠিক করে ফেললেন । তিনি রাতুলপুরে 
যাবেনই। কাল সকালে উঠেই যাবেন। ছোট মেয়ে সুমিত! এসে বললে বাবা, 
রাত্রে কি খাবে? বৌদিদি বলে পাঠালেন__ 

রায় বাহাছুর মুখ খিঁচিয়ে বল্লেন_-কেন তিনি কি জানেন না আমি রাতে কি 
খাই? যাঁও পর্দাট। তুলে দাও__ 

স্থুমিতা মুখের অপূর্ব ভঙ্গি বরে চলে গেল। রায়বাহাছরের দোতলার 
দক্ষিণমুখী বসবার ঘর। সামনের দেওয়ালে সবই জানাল! । সুমিতা জানালার 
পর্দা খুলে দিয়ে চলে গেল । পুরু “গদি' আটা মির্টি কৌচে বসে শেড দেওয়া 
লম্বা ডালের আলোতে রায় বাহার অহুমনস্ক ভাবে একখানা বাংল! মাসিক 
পত্রিকার পাতা ওলটাচ্ছিলেন। এসব পত্রিকা-টত্রিকা' এনেচে মেয়ে বা বৌমার! । 
তিনি এসব পড়েন ন]। 


৪৮ অসাধারণ 


বড় পুত্রবধূ প্রতিম! রূপের হিল্লোল তুলে ঘরে ঢুকে বল্লে- আমায় ডেকেচেন ? 

-ই্যা। আমি কি খাবে জিজ্ঞেস করে পাঠিয়ে কেন? আমি কিখাই? 

প্রতিম। জানে শ্বশুর বুদ্ধ হয়ে ইদানীং খিটখিটে হয়ে পডেচেন। সে সাত্বনার 
হরে বলে__না, সে জনে না। আপনি ছুদ্দিন কিছু খাচ্ছেন না রাত্রে,বলেন সাবু, 
করে দাও । তা আজও কি সাবু খাবেন, না লুচি খানকতক গরম গরম করে 
আনবো | ভালো! মাগুর মাহ আছে কি না, তাই বলে পাঠালুম-_ 

-মাগুর মাছের কথা কেউ আম|কে তে। বলেনি । সবাই হযেচে__ 

_-গা হলে ছু'খানা লুচিই আনি গে ভেজে । 

হ্যা, রাত তিনটে কোরো 

দশ মিনিটের মধ্যে আনচি বাবা। 

না, এ সংসারে সুখ নেই । তীর মুখের দিকে কেউ তাকায় না । 

গিন্নি কি এতই ব্যস্ত যে একবার এসে তার খাওয়ার খোজ নিতে পারেন 
না। আজ যদি-- 

প্রতি একটু পরেই রূপার থালায় লুচি সাজিয়ে ও একটা খুরে৷ বসানো 
ছোট্ট রূপার বাটিতে মাছের ঝোল নিয়ে ঘরে ঢুকলো । বায় বাহাছ্বর বলেন__ 
তোমার শাশুডী কি করচেন ? 

গ্রতিম সুললিত ভঙ্গিতে আচল সামলে নিয়ে বলে_ মা ঠাকুরঘর থেকে 
বেরোননি ত? 

-_-বেশ, বেরুতে হবে না। 

স্পবন্ুন, জল নিয়ে আসি বাবা, টেবিলেই খাবেন তো? 

রায় বাহাদুয় বিরক্তির সঙ্গে বললেন__রেডিওটা সর্বদা ঝং »ং করলে আমার 
মাথ] ধরে যাঁয়। কে খুলেচে রেডিও ? ছোট বৌম! বুঝি? বন্ধ করে দাও-_ 
ও নাকি স্থরে গান সর্ধদা বরদাস্ত করতে পারিনে- 

রাতুলপুরেই যাবেন তিনি। অসহ্‌ হয়ে উঠেচে এ সংসার। শাস্তি বলে 


শুন্দদিন ৪৯ 


জিনিস নেই এখানে । একবার গে ঘুরে আসবেন প্রথম যৌবনের শত মধুস্থতি- 
মাখা গ্রামটিতে | হয়তো নিরুপমার সঙ্গে দেখা হয়েও যেতে পারে-_ অস্তত 
সেই সব জায়গাতেও আবার গেলে জীবনের একঘেয়েমিটা কেটে যাবে। 

মাথ! ধরেচে বেজায়। শুধু ওই রেডিওটাব জন্তে। কতবার তিনি বারণ 
বরেচেন-কিস্তু এ বাড়ীতে তাঁর কথ! কেউ আমলে আনে? সাধে কি তিনি 
_শরীর কেমন ঝিম ঝিম করচে। 

মধ্য-রাত্রে বড় পুত্রবধূ প্রতিমাত্র ছোট থোকাটি জেগে মায়ের ঘুম ভাঙালো! | 
প্রতিমা উৎকর্ণ হে শুনলে! দোতলায় শ্বশুরের ঘর থেকে কেমন যেন একটা 
অস্বাভাবিক গোঙানির শব্দ আসচে। সে তথুনি নিচে এসে সকলের ঘুম 
ভাঁঙালো। বাণ বাহাছর বিছানায় গুটশুটি হয়ে অস্বাভাবিক ভাবে শুয়ে আছেন, 
তার মুখ থেকে একটা! অস্পষ্ট শব্দ বার হচ্চে । বড় ছেলে বাড়ী নেই। ছোট 
ছেলে ফোন করে দিলে ডাক্তারকে । তারপর নিজেও ছুটলো। খুব-টহ-ঠ 
উঠলো । সবাই ঝুঁকে পড়লে! বিছানার ওপরে, বড় মেয়েকে আনতে মোটর 
ছুটলে। বাগবাজারে । ঝি, চাকর, মেরের দল, পুত্রবধূর দল, নাতি-নাতনীর। 
মিলে লোকে লোকারণ্য ঘরের ভেতর ৷ বায় বাহাদুর কি একটা বলচেন অস্পষ্ট 
গৌঙানির মধ্যে--কেউ বুঝতে পারচে না। প্রতিমা কান পেতে ভাল করে, 
শুনে বল্ে-নির কে? নিরু কার নাম? নিরু নিরু করে যেন কি বলচেন ॥ 

ডাক্তার এসে বল্লে স্টেক হয়েচে। সেবাশুশ্রষা চললো, বড় ছেলেকে 
টেলিগ্রাম করা হোল রংপুরে । সেখানে সে যুদ্ধের বড় কনগ্রাকটারির কাজে 
গিয়েচে। ট্রা্ব-কল্‌ কর] গেল মেজ ছেলেকে ঝরিয়ার কয়লার খনিতে । 

সেদিন বেল! বারোটার আগে রায় বাহাদুর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন । 





৮ কাঠ-বিক্রী বুড়ো 


আমি গাছ বিক্রী পছন্দ করি না। কোনো গাছ যদি কেউ কাটে তবে 
আমার বড় কষ্ট হয়। লোককে পরামর্শ দিই গাছপাল! দেশের সম্পদ, ধরণীর 
শ্রী ওরা বাড়িয়েচে ফুলে, ফলে, ছায়ায় সৌন্দর্ষে-ওদেরই ডালে ভালে দিন 
রাত কত বিহগ-কাকলী, ওদের কেটে নষ্ট কোরো না । 

সুতরাং যখন গ্রামের ঘাটে কাঠের নৌকে। এসে লাগলো, আমি সেটা 
পছন্দ করিনি। 

একদিন সকালে বসে লিখচি, একজন দাঁড়িওয়ালা বুড়ো! মুসলমান 
এসে উঠোনে দড়িয়ে আমায় সেলাম করলে হাত তুলে। বল্লাম-_কি চাই? 

»বাবুর গাছ বিক্রী আছে, বিক্রী করবেন? 

-কি গাছ? 

বাবুর বাড়ির পেছনে বিলিতি চটুকা আছে, বাগা'ন শিশু আছেঃ 
কলুচটুকা আছে। 

লোকটার কথায় দক্ষিণের টান। বল্লাম__-বাডি দক্ষিণে? 

--হ্যা বাবু, বসিরহাটের ওপার । টাকি শ্রীপুর । 

- গাছ কিনতে এসেচ নাকি ? 

_ বাবু, আমাদের নৌকে। এসেচে ঘাটে । কাঠ বোঝাই হয়ে কলকাতায় 
যাবে। আপনাদের এদিকে দি বাগান টাগান পাওয়া যায় কিনবো। 

বাগান কেনা শুনে আমি আগেই চটেচি, সুতরাং লোকটার সঙ্গে ভালো 
করে কথ বল্লাম ন। 

ও বঙ্পে-_বাবু, গাছ বেচবেন? 

--না। 


কাঠ-বিক্রী বুড়ো ৫১, 


-__ভালো দর দেবো বাবু । 

-_কি রকম দর শুনি? 

--তা বাবু আপনার বড় চটুক1 গাছট? ত্রিশ টাকা দর দেবো । 

আমি আশ্যর্্য না হয়ে পারলাম না। এ অঞ্চলে ও গাছের দাম যুদ্ধের 
আগে একজন বলেছিল ছ'টাকা। যুদ্ধের মধ্যে ওর দাঁম উঠলো! চোদ্দ টাকা । 
ওটাকেই সর্বোচ্চ দাম বলে আমি ভেবেছিলাম । একটা বুনো চটুকা গাছের 
দাম চোদ্দ টাকা--ওই যথেষ্ট। আশাতিরিত্ত দর। আর এখন এ 
বলে কি! 

চক্িশ টাকা একট] চটুকা গাছের দাম এ কথা পাঁচ বছর আগেও কেউ 
কানে শোনে নি। আমার বাগান-সংলগ্ন জমিতে এরকম চট্কা গাছ পাঁচ 
ছ"টা আছে, বেশ মোটা পয়সা পেতে পারি দ্েখচি গাছ কটা বিক্রী করলে। 

হঠাৎ মনে পড়লো নেপল্ন উপদাগরের তীরে কোন এক বড় গাছতলায় 
মিনি বসে বই লিখতেন, নীল জলরাশি তার চোখের সামনে দূর ম্বপ্র-জগতের 
বাণী ভাসিয়ে আনতো, দৃশ্তমান জগতের ওপারে যে বৃহত্তর স্বপ্র-জগৎ দিক 
থেকে দিগন্তরে বিস্তৃত। আমি একটা রঙীন ছবিতে নেপল্স উপসগর 
তীরের এই ধরনের গাছের ছবি দেখেছিলাম। চট্কা গাছগুলো দেখতে 
ঠিক তেমনি। মনে মনে আমি ওদের নাম দিয়েছিলাম গ্রিনির গাছ। টাকার 
জন্তে সে গাছগুলে। কেটে উড়িয়ে দেবে! ? 

লোকটাকে বল্লাম__ন! হে, ও গাছ বিক্রী হবে না। 

সেই থেকেই কাঠের নৌকা নিয়ে লোকটা আমাদের গ্রামের ঘাটে রয়ে 
গেল। ছু" তিনটি বড় বড় বাগান কিনে তাঁর সমস্ত আম গাছ কাটিয়ে গুঁড়িগুলো 
নৌকা বোঝাই করতে লাগলো-- ডালপালা সম্তাদরে গ্রামের লোকজন জালানির 
জন্যে কিনে নিলে ওর কাছ থেকে । রায়েদের চণ্তীমণ্ডপটা অনেকদিন থেকে 
পোড়ো, ভূতের বাসা হয়ে আছে-_কারণ একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি ছাড়া রায়-বাড়িতে 


৫২ অসাধারণ 


বর্তমানে আর কেউ থাকে না। লোকটা রায়-কাকাঁকে বলে সেই চতীমণ্ডপের 
একপাশে আছে, আরও দু'টি সঙ্গী নিয়ে- চণ্ডীমণ্ডপের উত্তর দেওয়ালের 
গায়ে বাইরের দ্িকে একখানা খেভুর-প1তার চালা উঠিয়ে নিয়ে সেখানেই রান 
করে খায়। একটা বাশের তিকৃডিতে ইাডিকুড়ি রাখে । 

গাছগুলে। কেটে ফেলচে গ্রামের ছায়াসম্পদ ও শ্রীকে নষ্ট করে- এজন 
কাঠ-বিক্রী বুড়োকে আমি পছন্দ করতাম না। ওর সঙ্গে বেশি কথাও 
বলতাম না। 

নদীর ধারে ওদের নৌকো থাকে, যেখানে নদীর পাভ খুব ঢালু, বড় বড 
উলু ঘামের বন, ভাট বন, পট্‌পটি গাছ__সেখানে ওদেরই কাটা এক কাঠের 
গুঁড়ির ওপর বসে থাকি বিকেলে, বেশ ফাকা জায়গা, অনেক দূর পর্যস্ত 
আকাশ দেখা যায়। নীল আক।শের নি.শন্দ বাণীর মত নেমে আসে 
অপরাহ্ের শাস্তি। 

কাঠ-বিক্রী বুড়ো আমার কাছে আসে নৌকো থেকে নেমে। 

আমি বলি--আর কতদিন আছে? গাছগুলে। তো দেশের স।বড়ালে। 

আমি কি বলচি ও বুঝতে পারে না। গাছগুলে সাবাড় করলে ক্ষতি ফে 
কিতা ওর বোঝবার বুদ্ধি নেই। ও বলেনা বাবু, কিআর এমন লাভই 
ব। হবে, বড্ড খরচ পড়ে যাচ্ছে। 

স্প্কিসের খরচ ? 

-_-এই জন খরচ, কাটাই খরচ। 

--কলকাতাঁয় কি দর বিক্রী হে? 

--আজ্ঞে সাডে তিন টাক] কিউবিক ফুট। মিথ্যে কথা বলবো নাঁ 
আপনার কাছে। 

লোকটা আর কিছু ইংরেজী জানুক আর না জানুক কিউবিক ফুটের 
মাপটা জানে । কারণ ওই করেই খায়। তাছাড়। ওকে দেখে আমার 


কাঠ-বিক্রী বুড়ো ৫৩ 


মনে হয় লোকটা সরল, সাদাসিদে। কুটিল, ধূর্ত ব্যবসার নয়। ও 
আমায় তামাক সেজে এক একদিন খাওয়ায়। স্বখছুঃখের ছু'টো কথা 
বলে। 

ক্রমে যত দেখি বুড়ো বড় বড় বাগান কেটে উড়িয়ে দিচ্ছে, ততই ওর ওপর 
আমার বিতৃষ্ণী জমে । পয়সার জন্তে এরা নব পারে । 

রাস্তাঘাটে দেখা হোলে ভালে! করে কথ। বলিনে। 

বুড়ে। কিন্তু যেচে কথা বনতে আমে আমার সঙ্গে। প্রায় তিন চার মাসের 
বেশি আমাদের গ্রামে আছে, গ্রামের সকলের নাম-ধাম ভালো করেই জেনে 
ফেলেচে। কে কোথায় কাঁজ করে, কত মাইনে পায়, কার কি রকম অবস্থ। 
এ সব ওর জানা হয়ে গিয়েচে। মাঝে মাঝে আমার বাড়ি এসে সন্ধার সময় 
বসে। তামাক খার, প্রতিবেশীর মত গর করে। একবিন আমায় বল্লে-_বাবু 
বুঝি বই লেখেন । 

-ত্যা। 

_-বই ছাপান কোথায়? 

--কলকা তায় । 

- কত খরচ পড়ে? 

»প্পাচ ছ'শো, হাজার । 

স্-তা বাবু আপনার মত আমাদের ষদি হোত। চির জীবনটা কষ্ট করেই 
কাটলো । একটা ছেলে আছে, জমিদারি কাছারিতে কাজ করে টাকির 
বাবুদের । আট টাকা মাইনে পায়। বাবুর ওকে বড় ভালবাসে । আবছুল ন৷ 
হ'লে কোন কাজ হবে না লায়েব বাবুর। সাইকলের পিছোনে তুলে নিয়ে 
সাতক্ষীরে যায় মোকদ্দমার দিন থাকলে । আর বছর পুজোর সময় বাড়ি এলো, 
তা ডিম এনলো চার কুড়ি। আর গাওয়া ঘি-_ 

বুড়ো দিব্যি গল্প জমিয়ে বসে । তামাক খায়। কিছুক্ষণ পরে আবার চলে যায়। 


৫৪ অসাধারণ 


মাঝে মাঝে ওকে জিজ্ঞাসা করি- কেমন লাভ হবে এবার? 

-কিজানি বাবু? 

- অনেক গাছ তো কাটলে । 

--ওতে কি হয় বাবু-৮এখনে| অনেক গাছ কাট্তি হবে। 

- মোট! টাক! লাভ করবে এবার । 

-দোয়৷ করুন বাবু) তাই যেন হয়। কনটোলের কাপড় একখানা দিতি 
পারেন বাবু, নইলে ন্তাংটা হতি হবে। 


অনেকদিন ধরে ওর সঙ্গে আর আমার দেখা হয় নি। বুড়োও নিজের কাজে 
ব্যস্ত থাকে, আমিও থাকি নিজের কাজে ব্যস্ত। এমন কি ওর কাছে কিছু 
ডালপাল৷ কিনলাম জালাঁনির জন্তে, তার দাম নিতেও এল না । 

এই সময় আমাদের গ্রামে আমাদের এক তরুণ প্রতিবেশী টাইফয়েড জ্বরে 
পড়লো। তার চাষবাস আছে, বাজারে ছেট একখানা ফলের দোকান আছে, 
স্ত্রী ও পাঁচটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আছে। 

রোগ দিন দিন বেড়ে ক্রমে বাক! পথ ধরলো । আমর! পাড়ার সবাই রাত 
জেগে দেখাশুনো করি, ছু'তিনটি ছোকরা আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী দুরের শহর 
থেকে কখনো ওষুধ, কখনে] ডাক্তার, কখনে! ফল, কখনো! বরফ আনতে দিনে- 
রাতে চার পাঁচবার ছুটোছুটি করে। তরুণী স্ত্রী ও ছেলেমেয়েগুলির মুখের দিকে 
চেয়ে গ্রামের লোকের! কোনে কষ্ঠকেই কষ্ট বলে গ্রহণ করে না। 

কিন্তু কিছুতেই কিছু হোল না। 

চব্বিশ দিন জরভোগের পর রোগী মারা গেল। গ্রামেব মেয়ের! চার পাঁচদিন 
ধরে ব্যস্ত রইল সগ্ভোবিধবা মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিতে । পুরুষের! ব্যবস্থা! করতে 
লাগলেন ওদের বিষয়-আশয় কি হবে, চাষবাসের কি বন্দোবস্ত কর! যায়। 

কামাকাটির গোলমালে দিন দশ বারো! কেটে গেলে একদিন সন্ধ্যাবেলায় 


কাঠ-বিক্রী বুড়ো ৫৫ 


একটা দৃশ্য দেখলুম, যা আমার কাছে এত ভালে! লাগলো যে শুধু যেন সেই 
ঘটনাটার কথা৷ বলতেই এ গল্পের অবতারণা । 

বেলা আর নেই, ছিপগুলি নিয়ে পুকুর থেকে ফিরচি মাছ ধরে, ওদেরই 
বাড়ির পাশ দিয়ে। দেখি যে সেই কাঠ-বিক্রী বুড়ে মুললমান ওদের উঠোনে 
বসে তরুণী বিধবাকে সান্তনা দিচ্ছে। রাস্ত/র ধারেই ওদের রান্নাঘরের ছেঁচতলা, 
প্রতিবেশীর স্ত্রীটি বসে কি ক্কাজ করচে রান্নাঘরের দাওয়ায় আর বুড়ো বসে আছে 
ছেচতলায়। শুনলাম ও বলচ--সব দিকই দেখুন মা ঠাকরোন, বেঁচে চেরকাল 
কেউ থাকে না। তিনি অন্ন বয়সে গিয়েচেন এই হোল আসল কষ্ট। তা 
আপনার বাচ্চা কাচ্চাদের মুখির দিকে চেয়ে আপনি কোমর বাধুন। নইলি আজ 
আপনি অস্থির হ'লি ওর] কোথায় দাড়াবে মা ঠাকরোন? চোকির জল আর 
ফ্যালবেন না -আপনার চোকি জল দেখলি বুক ফেটে যায়-_ 

আমি ততক্ষণ দীড়িয়ে গিয়েচি। দেখি যে বুড়ে! মুপলমান ময়লা গামছার 
খুঁটে নিজের চোখের জল মুছে ফেলচে। 

এর চেয়ে কোনো অপূর্ধততর দৃশ্টের বল্পনা আমি করতে পারিনি। 


সেই সন্ধ্যায় একটি অতি মধুর গীতি-কাব্যের মত মনে হোল এর উদার 
আবেদন। 


 হারুণ-অল-রমিদের বিপদ 


জানিপুর থেকে ছুটি ছেলে পডতে আসে ইন্কুলে। 

এ অঞ্চলে আর ইন্কুল নেই, ওদের বাঙীর অবস্থা ভালো, যদিও সাতপুকষের 
মধ্যে অক্ষরপরিচয় নেই, তবুও বাপমায়ের ইচ্ছে, ঘখন ধান বেচে কিছু টাকা 
পাওয়া গেল, তখন ছেলেরা লেখাপডা শিখুক | চাষা লোকদের জন্তেও লেখাপডার 
দরকার আছে বই কি। ধানের হিসেব, জন মন্তুরেব হিসেব রাখাও তো চলবে। 


ওর! আসে মাদলার বিলের ধাবের ব্ড খাঠের ওপর দিষে। আজকাল 
সকালে ইস্কুল, সোদালিফুলের ঝাড দোলে মাঠেব মধ্যে, কত কি পাখী ডাকে, 
বড় বড় খোলাওয়াল! গেঁড়িগুলো৷ বিলের দিকে নামে মাঠের পথ বেয়ে, আশ 
ধানের জাওল! খায় লুকিয়ে ছাডা গকতে। ওব] পরামাণিকদেব বাগানের আম 
কুড়তে কুড়তে চলে আসে মাঠ ও বাগানের মধ্যে দিয়ে, যদি সামনে বিপিন 
মাষ্টারের বেতের ভয়ু না থাকতো ইতিহাসের ঘণ্টার, তবে বড় মজাই হোত। 
কিন্ত তা হবার নয, এমন সুন্দর পথযাত্রার শেষে অপেক্ষা করচে রুক্ষমুন্তি বিপিন 
মাষ্টার ও তার হাতের খেজুর ডালের বেত। 

একটি ছেলের নাম হারুণ, আর অপরটির নাম আবুল কাসেম। ছুটি বেশ 
দেখতে, পাড়াগীয়ের ছেলে, শান্ত চেহারা, আঁ সরল, কলকাতা তো দূরের কথা, 
মহকুমার টাউন বনগাও কখনো দেখেনি । আবুলের হাতে অনেক গুলে। পদ্নফুল, 
মাদলার বিল থেকে তুলেচে, ক্লাসের টেবিল সাজ।বে, ফণি মাষ্টার ফুল ভালবাসেন, 
তাকে দিতে হবে। 

হাঁরুণ বল্লে--এই আবুল, এচড় পাড়বি? 

- কোথাকার রে? 


হাঁরুণ-অল-রসিদের বিপদ ৫৭ 


--চল্‌ না, রাস্তার গাছের। ওগাছ তো! সরকারি, তুমিও পাঁড়তে পারো, 
'আমিও পারি । 

-কি হবে এচড়? বিপনে মাষ্টারকে দিবি? 

--তাই চল্‌, যাবার সময়ে ওর বাড়িতে ছুখান! বড় দেখে দিয়ে যাই । মারের 
দায় বেচে বাওয়া যাবে এখন । 

বেত্রভীতি-থেকে উদ্ধার পাওয়ার এ পথ ওদেরই আবিষ্তৃত। যেদিন ওরা 
এ'চড় দেয়, সেদিন ই।তহাসের ঘণ্টায় ওদের দেখতে পান না যেন বিপিন মাষ্টার । 
অন্য সবাইকে মারেন। ওরা গাছে উঠে দু'খানা বড় এ চড় সংগ্রহ করলে। 
হারুণ উঠলে। গাছে, আনুল রইল নিচে দীড়িয়ে। কোষ-ওয়াল। বড় এচড়। 
ইতিহাসের পড়া কারো হয়নি আজ | 

রাস্তার ধারে খিপিন মাষ্টারের টিনের বাড়ীটা। বাইরে কেউ নেই। 

হারুণ ডাকলে স্তর, স্তর _ 

বিপিনের স্ত্রী ঘুমচোখে বাইরে আসতে আসতে বল্ছিলেন__আপদগুলো৷ 
সকালবেলাই এসে-_ 

এমন সময় ওদের হাতের এচড় দেখে থেমে গিয়ে মুখে হামি এনে, গলার 
স্থর মোলায়েম ক'রে বল্লেন- কিরে? এচড়? কোথেকে আনালি? 

ওর এচড় ফেলে চলে এলো । বিপিন মাষ্টার ইস্কুলে গিয়েচেন ওদের আগে। 
আজ তারই প্রথম পিরিয়ডে ক্লাস। একটু দেরি করে ক্লাসে ঢুকলে আট আন! 
জরিমান। করা তো বাধাধর! রুটিনের কাজ । 

ওর] ঢুকলো ক্লাসে দুরু হুরু বক্ষে । 

বিপিন মাষ্টার কড়া সুরে হেঁকে বলেন--এই যে! হারুণ আর আবুল-- 
এদিকে এসো 

ওদের একজন পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। বিপিন মাষ্টার বল্লেন--দেরি 
কিসের? 


৫৮ অসাধারণ 


-_-আজ্ঞে, এচড়__ 

-কি? এচড়? কিসের এচড়? সরে এসো এদিকে-- 

পিঠে বেত পড়বার আর দেরি নেই দেখে হারুণ ভূমিকাবাহুল্য না করে 
ক্ষেপে আসল কথাটা বলবার প্রচেষ্টায় উত্তর দিলে--আপনার বাড়ীতে 
এচড-- 

-কি? আমার বাডীতে? তার মানে? 

এচড় ছুঃখান। বেশ বড বড়। আপনার বাড়ীতে দিয়ে এলাম । 

_-কবে? 

- এখন শ্যাব। তাইতে তো দেরি হোল-_এচড় পাডতে দেরি হোল-_ 

বিপিন মাষ্টারের উদ্যত বেত্র নেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে। এষে কতবড় অমোঘ 
মহৌষধ ওরা ভ'জনেই তা জানে । বিপিন মাষ্টার আর কোনো কথা বল্লেন না, 
ওর! দু'জনে গট. গট. কবে ক্লাসের মধ্যে ঢুকে সামনের বেঞ্চির ভালো ছেলে 
যুগলকে ঠেলে সরিয়ে সেথানে বসবার চেষ্টা করতে যুগল ঈ[ডিয়ে উঠে বললে দেখুন 
স্যর,» আমি কতক্ষণ থেকে বসে আছি এখানে, আমাকে টেনে ওর। বসতে চাচ্ছে 
এত দেরিতে এসে-_ 

বিপিন মাষ্টার মুখ খিঁচিয়ে বল্লেন_ বসতে চাইচে তা হয়েচে কি? তোমার 
একার জন্তে বেঞ্চ হয়নি--সরে বসে ওদের বসতে দাও । ওরা কি দাড়িয়ে 
থাকবে- ডে পো ছোকরা কোথাকার-- 

হারুণ এক ঠ্যালা! মেরে যুগলকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে বসে পড়লো। আবুল 
বসলো যুগলের ওখানে । যুগল বেচারীকে উঠেই যেতে হোল ছু*দদিক থেকে 
ঠাল! খেয়ে। বিপিন মাষ্টার দেখেও দেখলেন ন।। আজ তিন পিরিয়ড 
বিপিনবাবুর | 

ওর! বুঝে-স্থজেই আজ এ'চড় এনেচে। তিন পিরিয়ডের ধাক্কা সামলাতে 
হবে তো? কিন্তু দার চেয়েও বড় ধাকা আজ পৌছুলো এসে। ওর! ছু'জনে 


হারুণ-অল-রসিদের বিপদ ৫৯ 


ক্লাসের বাইরে এসে দেখলে একখানা ঘোড়ার গাড়ি স্কুলের গেটের কাছে 
ঈড়িয়ে। 

হারুণ বল্লে-কে রে? কে এল? 

আবুল ঠোঁট উল্টে বল্লে-কি জানি! 

এমন সময় ওপর ক্লাসের শিবনাথ মাষ্টার বারান্দা দিয়ে আসতে আসতে 
বল্লেন-বাও সব ক্লাসে গিয়ে বোসো। ইন্স্পেক্টর বাবু এসেচেন-_-এখুনি কাস 
দেখতে আসবেন-- 

সব ছেলে চুপচাপ ক্লাসে এসে বসে । আবুল ও হারুণ সেই সঙ্গে এসে বসে 
ওদের গাষের পাশে রস্থুলপুব, সব মুসলমান চাষীদের বাস। সে গ্রাম থেকে 
পড়তে আসে একটি ওদের বযসী ছেলে, নাম তার হাযদাব আলি। হারুণ 
বল্লে--আমাদের পরনে ময়লা কা পড-_ 

হাষধার বল্লে-_তাতে কি হয়েচে? 

--মার খাবি এখন-_ 

- ইস্‌, তা আর জানিনে! মারলেই হোল। 

কথাটা বল্লে বটে, কিন্তু মনে ততটা ভরসা ছিল ন1 হায়দারের । ভয়ে ভয়ে 
সে ক্লাসে গিষে ঢুকলো। একটু পরে সাহেবি পোশাকপরা ইন্সপেক্টর এবং 
তার পেছনে হেডমাষ্টার ওদের ক্লাসে দেখ! দিলেন । বিপিনবাবু চেয়ার ছেড়ে 
দাড়িয়ে উঠলেন । 

ইন্সপেক্টার বাবু বল্লেন__এটি কোন্‌ ক্লাস? বেশ বেশ। এদের কিসের 
ঘণ্ট|? 

বিপিন বাবু বলেন - ইতিহাসের | 

-_বেশ বেশ। 

পরে হারুণের দিকে চেয়ে বল্লেন-_কি নাম? 

হারুণ ভয়ে ভয়ে বল্লে--হারুণ-অল-রসিদ। 


০ অসাধারণ 

-্ত্যা? 

-_ভ্ার, হারুণ-অল-রসিদ। 

--বোগদাদ থেকে কবে এলে? 

-- আজ্ঞে, ভ্যার ? 

--বলি বোগদাদ ছেড়ে এখানে ছদ্মবেশে নয়তো ? 

হারুণ বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল। হেডমাষ্টার হাসলেন । 

সরে এসে এদ্রিকে । ইতিহাস পড়েচ? 

- আজে, শ্যার । 

_-কুতুবুদ্দীন কে ছিলেন? 

হারুণ বলে-রাজা ৷ 

- কোথাকার রাজা? কোথায় থাকতেন? 

--বিলেতে। 

_বেশ। আকবর কে ছিলেন? 

হারুণ ভেবে বলে-সেনাপতি-_ 

--কার সেনাপতি ? 

-রাআর | 

--কোন রাজার? 

--বিলেতের। 

_ বাঃ বাঃ _হারুণ-অল-রসিদ বোগনাদী, বেশ ইতিহাসের জ্ঞান তোমার। 
বোগদাদের খবর কি? 

-ত্যা? 

-্পবলি বোগদাদের খবর কি? 

হারণ ভাবলে বোগদাদ হয়তে, তাদের গ্রামের ইংরেজী নাম। তাই সে 
বলে-খবর ভালো» স্যার | 


হারুণ-অল-রসিদের বিপদ ৬৯. 


হেডমাষ্টার ও ইন্স্পেক্টর হো! হো করে হেসে উঠলেন। এর মধ্যে হাসবার 
ব্যাপার কি আছে, হারুণ তা খুঁজেই পেলে না। বিপিন মাষ্টারের দিকে হঠাৎ 
ওর নজর পড়তেই দেখলে তিনি রোষকষ।য়িত নেত্রে ওব দিকে চেয়ে আছেন-_ 
যেন ওকে গিলে খাবেন এই ভাব। 

হাঁরুণ ভেবে পেলে না কি এমন অন্যায় কাজ সে করে বোসলো|। 

বিপিন মাষ্টার নিশ্চমুই চটেচে, ওর মুখে তার রেশ আছে। 

ইনম্পেক্টর ওর দিকে চেষে বল্লেন বেশ মজার ছেলেটি, সে সিম্পল্‌। 

হেডমাষ্টার বল্লেন__পাঁড়ারগ।য়ে বাড়ী, কিছুই জানে না। 

-_ চলুন, অন্ত ক্লাসে বাওয়। যাক। 


ঘণ্টাথানেক পরে হেডমাষ্টার এসে ওদের ক্লাসে বল্পেন_ পুণ্যশ্লোক নৃপতি 
তারুণ-অল-রসিদের নামে তোমার নাম। তার কথা কিছু জানো? তিনি 
ছিলেন গরীবের মা-বাপ, ছদ্মবেশে প্রজান্র ছুঃখ দেখে বেড়াতেন। 
শিখে রেখে | 

বিপিন মাষ্টার ছুটির আগে ওদের ক্লাসে এসে বেত আক্ষালন করে বল্েন-- 
সরে এসো! এদিকে, মুখ্যুর ধাড়ি। ক্ল'সের মুখ হাসিয়েচ আজ | বেত লাগাই 
এসে হারুণ কাদে কাদে! মুখে এগিয়ে যেতেই হেডমাষ্টারের ঘর থেকে স্কুলের 
চাকর এসে বলে হারুণকে ইন্স্পেক্টরবাবু ডাকচেন । 

কি বিপদেই আজ পড়েচে ও । কার মুখ দেখে না৷ জানি আজ সে উঠেছিল 

অফিসঘরে ওকে ইন্ন্পেক্টরবাবু জিগ্যেস করলেন--বাড়ি আপাতত কোথায়? 

হারুণ ভয়ে ভয়ে বল্লে-জানিপুর ॥ 

-_-কতদূর এখান থেকে? 

দু মাইল, স্তার । 

--কি খেয়ে এসেচো ? 


৬২ অসাধারণ 


--পাস্ত ভাত। 

-মসরুর কোথায় ? 

- আজ্ঞে? 

- খোজা মসরুর ? 

নাঃ কি বিপদেই আজ ভগবান তাকে ফেললেন। এসব কথ! সে জীবনে 
কখনো শোনে নি। কেন এত বড় বড় লোক খাপছাড়। কথা বলে, যার কোনো 
মানে হয় না? উত্তর দিতে না পারলে এখুনি বিপৃনে :মাষ্টার বেত উচিয়ে 
আসবে মারতে! 

হারুণের মুখ শুকিয়ে গেল। ও করুণ নয়নে একবার ইন্স্পেক্টরবাবুর দিকে 
চেয়ে দেখে চোখমুখ নিচু করলে। একবার এদিক-ওদিক চেয়ে দেখলে বিপনে 
মাষ্টারটা ওঘরে কোথ|ও আছে নাকি । সকালের এচোড় পাড়া আজ একেবারে 
মাঠে মারা গেল! অনৃষ্ট আর কাকে বলে? নাম রেখেচেন তার বাপ মা, তার 
কিদোষ? 

কখন তার চোখ ছাপিয়ে জল গিয়ে পডলো ওর অজ্ঞাতসারে । 

ইন্স্পেক্টরবাবু বর্জেন_ কেঁদে! না খোকা। যাও, বাড়ি যাও। তোমার 
নামটা খুব বড় একজন ভালো লোকের নাম। ইতিহাসের প্রসিদ্ধ লোক, 
বুঝলে, যাও-_ 

স্কুল থেকে বাড়ি যাবার পথে আবুল বল্লে--এচড় আজ না দিয়ে কাল দিলেই 
হোত। আজ তে পড়াই হোল না। তোকে কি বলছিল রে ইন্ন্পেক্টরবাবু? 

হাকুণ বল্লে-_তুই পাডগে যা এচড়। বিপ.নে মাষ্টারকে আজ এখুনি চার- 
পাচখানা দিয়ে আমসি। কাল নইলে আজকের শোধ তুলবে। কি মুস্কিলে 
পড়েছিলাম আজ বল্‌ তো! 

বেলা দুপুর উত্তীর্ণ হয়ে গেলে দু'জনে বাড়ি পৌছল। 





/সৃলেখা 


অজ-পাড়াগায়ের পথে যখন গাড়ী ঢুকলো তখন স্থলেখার কান্না এল। এই- 
সে কলকাতায় ইস্ুল-কলেজে পড়েছিল? এই পাড়াগায়ে শ্বশুরবাড়ি হবে, 
যত অশিক্ষিতাদের মাঝখানে দিন কাটাতে হবে! কলকাতার নীলিমাদের বাড়ি 
গিয়ে প্রতি সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডা, সেখানে জগদীশ বড়ুয়া! ও হিরগ্নয় মিত্র সম্বন্ধে 
আলোচনা, ভয়েল-কাপড়ের জমির ধারে কি রঙের পাড় সেলাই হবে এ-সম্বন্ধে 
গভীর গবেষণা, গৌরীদের বাড়ি গিয়ে রেডিওতে নতুন নতুন গান শোনা-_সব 
শেষ হয়ে গেল। গানের সে ভীষণ ভক্ত । ভালো! গান শুনতে পেলে আর কিছু 
সে চায় ন।। 

এ-সবের এই পরিণতি ? 

এই জন্তে কাকা তাঁকে ইস্কুলে দিয়েছিলেন ? না দিলেও পারতেন । আরও 
অল্প-বয়েসে বিয়ে দিলেও চলতো । তার চোখ ফুটবার আগেই । কথাটা সে 
কাউকে বলতেও পারলে না, বলতে পারলে বোঝা নেমে যেতো অনেক । 

ত্বামীকে তার পছন্দ হয়েছিল। 

স্বামী শ্যামবর্ণ, অল্প বয়েস । বি-এ পাশও করেচে। কিস্তহোলে কি হবে, 
তিনি বিদেশে চাকরি করেন, গল্প-গুজোব করবার জন্তে তাকে পাওয়৷ যাবে না 
সব-সময় । অশিক্ষিতাদের মধ্যে অজ-পাড়াগায়ে একা-একাই দিন কাটাতে 
হবে। মরে যাবে সে। নীলিমা কত্দূরে পড়ে রইল, ও এবার আই.এ পাশ 
করবে-_-সামনে কত আনন্দভরা মুক্ত জীবন ! 

সে আটকে গেল, ক্ষুদ্র জলাশয়ের জল-ঝাঝির দামে । জীবনের গতি ওর 
বন্ধ হয়ে গেল। 


৬৪ অসাধারণ 


সন্ধ্যা হয়েচে."" 

একটি জীর্ণ একতলা ঝাঁড়ির স।মনে ওদের গাড়ি এসে পৌছলো। কতক- 
গুলে। প্রাচীন, কতকগুলো পাড়াগেঁয়ে-বৌ, তাদের মুখে চোখে না আছে বুদ্ধির 
দীপ্তি, না আছে কিছু, তারাই এসে স্থুলেখার চারিধারে ভিড় জমালে । 
কলকাতার ঝাসাতেই বৌভাত হয়ে গিয়েছিল । কোনো৷ আচার-অনুষ্ঠান বাকি 
ছিল না, থাকলে আরও বিরক্তিকর হয়ে উঠতো ব্যাপারই 

স্বানীর ছুটি নেই। তান তাকে টপতক-নাঁড়িতে প্রাচীনাদের হাতে পৌছে 
দিয়েই সরে পড়লেন । মিলিটারি চাকরি, বিশেষ ছুটিহ।টা নেই । যদি সময় 
পান, পূলোর সময় আসবো বলে গেলেন। 

সমীর চলে গেলে, স্থলেখ! কান্নার ভেঙে পড়লো । একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে 
গেল সে। কিভাবে দিন কাটবে এখানে বুড়ীদের মধ্যে? যার! বাইরের 
হগতের কোনে। সংবাদ রাখে না এমন তিনকাল গিয়ে এককালে-ঠেকা দস্তহীন 
বুড়ীদদের মধ্যে? 

টাকা ছিল না কাকার। নতুবা শহরে বিবাহ হোতো। 

যাক সে কথা? ছেলে দেখে বিয়ে দেওয়া। ছেলে সত্যিই ভালো । 
স্বামীকে সে গর-পছন্দ করেনি । ভালে। ছেলে, পাশ-করা, স্বাস্থ্যবান । গ্রামের 
বাড়ি জীর্ণ বটে, কিন্তু বেশ বড়। অনেক নাকি জায়গা জমি আছে, প্রজাপত্তর 
আছে, আগান-বাগান, পুকুর, বাশঝাড় আছে । বনেদি সেকেলে গৃহস্থ 

তবে ওই যা কথা, সেকেলে-.**একেবারে সেকেলে । 

শাশুড়ি সুলেখাকে দিয়েচেন একছড় ভারি সেকেলে মুড়কি-মালা হার ॥ 
দিয়ে বলেছিলেন_-বৌম।, বড় পয়ুমন্ত জিনিসটা । আমার শাশুড়ি আমাকে এই 
হার দিয়ে আশর্ব্বাদ করেছিলেন, আমি তোমাকে দিলাম আবার। তুমি আবার 
(দিও তোমার ছেলের বৌকে- জন্মোএইন্ত্রী হও, আমার মাথায় যত চুল আছে 
ততদিন সমীর বেঁচে থাকুক ! 


স্থলেখা ৬৫ 


স্থলেখ! শাশুড়ির পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলে। হারছড়াটা ভারি বটে, 
কিন্তু একালে ও-হার কেউ পরে? গৌরী কি ভাববে, কলেজের অনুদি কি 
ভাববে, যদি ও আজ মুড়কি-মাল। হার গলায় দিয়ে কলকাতায় গিয়ে হাজির হয়? 

দিন-পাঁচ-ছয় কেটে গেল। 

সথলেখাকে ভোরে উঠে কাজকম্মে বড়-জা নীরদ্াকে সাহায্য করতে হয়। 
অবিশ্তি নতুন বউ বলে এখনো কাজের ভার তেমন ঘাড়ে চাপেনি, কিন্তু 
নীরদাকে দিয়ে সে বুঝতে পারে এ-সংসারে পুরনে। বউ হয়ে গেলে কি ধরনের 
খাটুনিটা আশা করা যায়। 

নীরদা উদয়াস্ত খাটে, টিন-টিন ধান সেদ্ধ করে, বোঝা-বোঝ! ক্ষার কাচে, খই 
মুড়ি ভাজে, ছু-বেলা রান্না করতে আসে, এখন ওরা একবেলার ভার সৃলেখার 
উপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টায় আছে বোধ হয়। নিতান্ত চক্ষুন্জায় বলচে না। 

স্ূলেখা রাধতে জানে ন।যে তা নয়-কিস্তু গেঁয়ো-রানা চচ্চড়ি, সুক্তনি, 
মোচার ঘণ্ট, ঝালের ঝোল, বড়ির টক- এসব সে রাধতে জানে না। তাছাড়া, 
ভালোও লাগে না এসব তার । এভাবে জীবন নষ্ট করার কি মানে হয়? 

হবলেখা সুন্দরী মেয়ে, কলেজের থিয়েটারে গতবার মালিনীর 
পার্ট নিয়েছিল । সুশ্রী চেহারার জন্তে আর চমৎকার গানের গ্'ন জন্তে যা! 
মানিয়েছিল ওকে ! গৌবীর ম৷ টিন্থশাড়ি পরিয়ে, সোনার গহন দিয়ে, কপালে, 
অলকাঁতিলক এঁকে ওকে নিজের হাতে সাজিয়ে দিলেন _ইংরাজির অধ্যাপিকা 
তরুণী উষাদি গ্রিন্-রুমে এসে ওকে কিভাবে অভিনন্দিত করলেন--এসব কথা 
তে! আর-বছর রবীন্দ্র-জন্মোৎ্সবের দিনের ! 


আজ মনে হচ্ছে কত কাল... 

সে-সব দিন শেষ হয়ে গেল । 

এর চেয়ে তার নাই বা বিয়ে হোতো? থাকতো সে উষাদি*র মত, 
নলিনীদি*র মত» মিস সেনের মত, মিস বিধুবালা গাঙ্গুলির মত অবিবাহিতা । 


৫ 


৬৬ অনাধারণ 


হাতে ভ্যানিটি-ব্যাগ ঝুলিয়ে, খাটে! ছাতা-হাতে ট্রাম ধরতে ছুটতো ঠিক 
বেল সাড়ে দশটায়। যেখানে খুসি তুমি যাও, সিনেমা ঘ্যাখো, নাচগানের 
জলস। ছ্যাখে! ফা্ট-এম্পায়ারে-_কি মজা ! 

সকালবেলা । ওর বড়-জ। এসে বলে- রাঁঙা-বৌ, এক কাজ করতে 
হবে যে! 

স্থলেখা বল্লে-_কি দিছি ! 

--কলাইয়ের ডাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এগুলো ছাদে নিয়ে গিয়ে রোদে দাও, 
তারপর বেল৷ পড়লে ঝেড়ে তুলতে হবে। বুঝলে? 

্বেশ। 

--পারবে তো? 

"করিনি কখনো, ভবে চেষ্টা করি । 


অুলেখ। ডাল ছাদে দিয়ে এসেছে, তারপর আর ডালের কথা ওর মনে নেই। 
দুপুরে আহারের পরে একটু শোবামাত্র ওর ঘুম এসেচে। বেল ছু'টোর সময় 
কালো-ভোমরার মত মেঘ করে নেমেচে ঝম্‌ কম জল। ও অঘোরে ঘুমুচ্চে 
তখন। ঘুম যখন ভ্েউেচে, তখনও সমানে বৃষ্টি হচ্চে। শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি 
খানা-ডোবা ভত্তি করে ফেলেচে ছু'্ঘ্টার মধ্যে। স্থলেখা উঠে চোখ মুছতে- 
মুছতে জানাল দিয়ে দেখে অবাক হয়ে গেল। বুষ্টির এমন রূপ সে সহরে 
দেখেনি কথনো। বকুল গাছের গু ড়িট। বালে দেখাচ্ছে বৃষ্টির ধারায়। 
ছাঁতারেপাখীগুলো অঘোরে ভিজচে--এ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটার কথা 
মনে এনে দেয়-_ 

এদের কোনে। ব্যবস্থা নেই । এই সময় খেতে হয় গরম-গরম চা। সে 
নতুন-বৌ, চা তৈরি করতে যেতে পারে না। কিন্তু কারো কি সেদিকে দৃষ্টি 
আছে, না কেউ কিছু বোঝে ?*৩-মাগো॥ ওদের বাড়ির বুড়ীটা কি ক'রে ভিজচে 
এই জলে নারকোলপাতা কুড়,তে ৷ পাড়াগেঁয়েদের কাণ্ডই আলাদা। 


সথলেখা ৬৭ 


এমন সময় ওর জা ঘরে ঢুকে ব:ল্ল রাঙা-বৌ, ভালগুলে! তুলেছিলে ছাদ 
থেকে? 

সর্বনাশ ! পেকথা একদম মনে নেই স্থুলেখার ৷ লজ্জায় তার সুন্দর মুখ 
ল'ল হয়ে উঠলো, অপ্রতিভ-স্থুরে বল্লে-_ওই যাঁঃ! সেকথা মনেই নেই দিদি-. 
এক্ষুনি আমি যাচ্ছি ছাদে-*" 

লজ্জায় স্বলেখার মনে হচ্ছিলো! যে, মাথা কুটে মরে । 

এই সব অশিক্ষিতার দল তাকে কিরকম আনাঁড়িই না মনে করচে। যাঁকে 
“মার” ব'লে সবাই জানতে! কলেজে। স্থলেখা ধড়মড ক'রে উঠে ছুট দিল 
শাদের দিকে, ওর জা সন্সেহে ওর দিকে চেয়ে বল্পেন-_চুটতে হবেনা রাঙা-বৌ, 
বোসে।_বোসো। 

-বমবে! কি দিদি, ডাল যে ভিজে নষ্ট হয়ে গেল! 

_সে কি এখনে ছাদ্দে আছে ভাই? তুমি ঘুমুচ্ছিলে যখন বিষ্টি এল, সে 
আমি তুলে আনলুম যে । 

কতজ্ঞতায় স্ুলেখার সুন্দর চোখের দৃষ্টি বিনত হয়ে এল। সত্যি ভালে 
€লোক বটে, তার জা। মজা দেখবার মত লোক নয়। ও বল্লে-বাচলুম দিদি। 
ধন্যবাদ । তুমি আমাকে লজ্জার হাত থেকে বীচালে। স্ুলেখা? জা মুখে 
কাপড় দিয়ে হেসে বল্লে__-রাঙা-বৌয়ের থিয়েটারি-ধরণের কথা শুনে হেসে মরি 
ও-মাগো “* 

এ একটা মস্ত বড় পরাজয়ের দিন ব'লে স্থুলেখ। মেনে নিক্সে। 

ডাল কখনে! তোলেনি সে, অতশত তার মনে থাকে ন| পাড়াগায়ের 
লোকের মত। 


সেদিন সন্ধ্যাবেল৷ ও-পাঁড়ার কামিনী এসে বল্পে-কি হচ্ছে গো বৌদিদি? 
চুল বাধচি, এসো! ঠাকুরঝি। চুলের দড়িটা ধরো তো। 


৬৮ অসাধারণ 


"গান করবে? 

»-সন্দেবেল। গান করলে, শাশুড়ি আমায় ভালো চোখে দেখবেন ? একেই 
তো৷ আনাড়ি হয়ে আছি এ-বাড়ির মধ্যে। সে হবে না ভাই। তবুও তুমি 
আজ প্রথম বল্লে গানের কথা । 

-_ কেউ বলেনি বুঝি তোমায় বৌদিছি? 

--কে আর বলচে। 

এইসময় সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো ঘন হয়ে..*কামিনী চলে যাবার 
জন্তে বাইরে এসে দাড়ালো । বল্পে--চলি আজ বৌদিদি, আর একদিন 
আসবে।। 

এক-পসলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েচে সেদিন বিকেলে । স্ুলেখার ঘরের জানালার 
ঠিক বাইরে নেবুগাছে নেবুফুল ফুটেচে-__বৃষ্টিসজল অপরাহ্রের বাতাসে ভূরতুরে 
নেবুফুলের গন্ধ-".. 

বড় জা নীরদা ওর ঘরে ঢুকে বল্পে-_কি হচ্ছে রাঙাবৌ ? 

- আস্মন দিদ্ি। কি আর হবে, এমনি বসে আছি। 

রান্নাঘরে চলো! 4 ছুটে! ডাল ভাজবো, তুমি বসে বসে কুলোয় ঝাড়বে। 

--আচ্ছা দিদি, সবসময় এসব কাজ তোমাদের ভালে! লাগে? একটু অন্ত 
রকমের কাজ--একটু ভালো কাজ.** 

নীরদা হেসে বলে-_-সময় নেই ভাই। দেখচো। তো সংসারের কাজ নিয়ে 
বেহাতি। 

--ওরই মধ্যে সময় ক'রে নিতে হয়'** 

বিরক্তিতে স্থলেখার মন ভরে উঠলো । এমন সব অশিক্ষিতাদের মধ্যেও 
সে এসে পড়েচে ! এরা শুধু জানে, ডাল ভাজতে আর ভাত রাঁধতে। শুধু 
খাওয়া আর খাওয়া । 

নীরদা বলে--তুমি তো রাঁঙা-বৌ নতুন এসেচে]। এখন প্রথম প্রথম 


সুলেখা ৬৯ 


তোমার খারাপ লাগবে--এরপর এই আবার লাগবে ভালো। তখন অন্ত 
কিছুতে মন যাবে না। 

স্থলেখা মনে-মনে বল্পে--সে দিন আমার জীবনে হঠাৎ না আস্থক। 

চক্ষুলজ্জার খাতিরেও ওকে গিয়ে ডাল ভাজতে বসতে হোলো! রান্নাঘরে । ছুটি 
ঘণ্টা সে কি খাটুনি! নীরদ। ডাল ভেজে দিচ্চে আর ও আনাড়ি-হাতে কুলোতে 
ঝাড়চে । অনেক রাত্রে ঘুম-চোখে স্ুলেখা! এসে যখন বিছানায় শুয়ে পড়লো, 
'তখন তার মন অবসাদে ও ক্লান্তিতে ভেঙে পড়চে ॥ কি কর্মফলে এমন সংসারে 
সে এল? 

অনেক রাত্রে সেদিন ঘুম ভেঙে উঠে স্থলেখা শুনলে কে গান গাইচে** 

স্থলেখা উৎকর্ণ হয়ে শোনবার চেষ্টা করলে__গুন্‌ গুন্‌ ক'রে কে গান ভশাজচে 
_.নিপুণকণ্ঠের আলাপ। ও ভাবলে-_বা রে, এমন জয়জয়ন্তী অলাপ 
করে কে? 

স্থলেখা নিজে গায়িকা । সে বুঝলে, যে এই গুন্‌ গুন্‌ স্থরে আলাপ করছে, 
সে নিপুণা গায়িকা । লেখা অমন আলাপ করতে পারলে নিজেকে ওস্তাদ 
আনে করতো । কিন্ত একি সম্ভব? 

এখানে কে গান গাইবে এমন ? 

হুলেখা আরও শোনবার জন্তে বাইরে এসে দাড়ালো, সেই সময় গানও হঠাৎ 
বন্ধ হয়ে গেল। যে গাইছিল, সে অন্তমনস্কভাবেই এক-টুকরো গান অল্প একটু 
সময়ের জন্তে গাইছিল--ঠিক গান গাইবার জন্যে নয়। 

স্থলেখা ঘুম ও বিন্ময়জড়িত-চোখে এসে শুয়ে পড়লো। সকালে উঠে 
এএ-ঘটনাঁর কথা ওর মনে ছিল না, কিন্তু একটু বেল! বাড়লেই মনে এলো! রাত্রের 
সেই অন্পষ্ট জয়ভয়ন্তীর স্থর। তথখুনি সে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলে সমস্ত 
'ক্ঘটনাটা। ন্বপ্নের ব্যাপার হয়তো সমস্তটা-"" 
গ্রামের ও-পাড়ায় স্ুলেখা কথনে! যায়নি । এবার একদিন ও-পাড়া থেকে 


৭০ অসাধারণ 


কয়েকটি মেয়ে ওকে নিমন্ত্রণ ক'রে নিয়ে গেল। তাঁরা সকলেই একবাক্যে 
লেখার রূপের প্রশংস! করলে, ঢা থেয়ে বস নানা-বান।ব গল্প করলে। এরা 
চোখ থাকতে অন্ধ নাকি? এমন যে স্তন্দর লাইলাবশ্রডের জরিপাড় শাডি 
পরে আছে স্থলেখ তার দিকে কারণ ঢোখ গেল না? কেউ বল্লেন! সে-কথা ? 
না বল্লে বিখ্যাত ছবি 'মায়ামুকুরঃ সম্বন্ধে পুটিরে-খেতে একটা বাক্াি। সুলেখা 
€দের কাছে "মায়ামুকুর”এর গল্পট! করেচে, ওর সন গানগুলিই সে গাইতে পরে 
এ-কথাও জানিয়ে দিয়েছে, জথচ--গান গাইতে বলেও না তাকে কেউ! 
হিরঞয় মিত্রের গান সবগুলে'-কে জনেনা হিরণয় মিত্রকে, তার 
স্থকথকে ? 

স্থলেখার ইচ্ছে হোলো, এই মুঢ অশিক্ষিত] মেয়েগুলোর সামনে একবার 
হারমোনিয়মটা! টেনে নিয়ে প্টাদের দেশের বাজকুমারী'র কিংবা “এবার ফাল্গুন 
এলে এলো এসো'র অপূর্ব সুর-পুঞ্ধে ঘর ভবিয়ে দেয়। 


কারণ, যে-বাড়িতে ওকে নিয়ে গিয়েছিল, একটা ভাঙা হারমোনিয়ম ছিল 
সে-বাড়িতে। একটি এগারে'-বারো বছরের ছোট মেয়ে বেস্থুরে একটা সেকেলে- 
শ্যামাসলীতও গেয়েছিল--বোধহয় তাকেই বিশেষ কবে শোনাবার জন্যেই । 
এ-গ্রামে কেউ বোধহয় খবর রাখে না যে সে একজন গায়িকা? 

বাড়ি ফিরে দেখলে, ওর জ! তালের বঙা ভাভবে ঝলে তালের রস বার 
করচে। ওকে দেখে বল্লে_ রাঙা বৌকে কোথার নিয়ে গিফ্বেছিলে তোমরা ? 

মেয়ের দল বল্লে__তুমি তো আর যাবে না বড়বৌদি, তুমি গেলে অবিশ্টি 
আজ খুব ভালে। হোতো। | আমাঁদের সে ভাগ্যি কি আর আছে? 

নীরদা বল্পে-_বোন্‌ সবাই। তালের ফুলুরি খাবি। রাঙা-বৌ, তুমি তালের 
গোলাট1 করো, আমি কড়াম্ তেল চড়িরে দিই। 

একটি ধাম বড়! ভেজে যখন ওরা উঠলো তখন রাত ন'ট।। মেয়ের দল 
ইতিমধ্যে ছু'দশটা বড়া খেয়ে চলে গিয়েছে । সুলেখার এসব কাজ অভ্যাস 


শ্রলেখা ৭১ 


নেই৷ ঠ|য বসে থাকা রান্নাঘবের গরমে কত্তক্গণ পোষায়? এর! শুধু জানে, 
ভোজনেব তরিব্ৎ কবতে সকাল থেকে বাত বাবোটী পধ্যন্ত। 

মনে পলো, ওদেব কলেজেব এক অধ্যাপক বলেছিলেন, বাঙাণীব ঘবে 
বান্নার বন্দোবস্ত যে ধরনে, তাতে খাট্ুন এবং আঘোজন যত বেণী, খাস্ভবস্তর 
পুষ্টিকাবক গুণ তত নেই" জ্িবে ভালো লাগানোর দিকে যত লক্ষ্য, খাগ্ভের 
গুণাগুণেব দিকে তত লক্ষ্য থকলে আজ বাঙ্গালীব স্বাস্থ্য এত খারাপ 
হোতো কি? 

বসে বসে শুধু নির্ঘোধেব মত একবাশ তালেব বডা ভাজা" 

ওব বড-জ| বান্নাঘরে বসে ওকে বল্লে--বাঙা-বৌ, আমার ঘব থেকে 
গামছাখানা নিষে এসো না ভাই, গা ধুষে নিই কুয়োহল| থেকে । বড্ড গরম 
লাগচে বডা ভেজে । 

স্থলেখা বলেস্পমালে আছে তোমাব ঘবে ? 

_নেই। হারিকেনটা নিষে যাও ভাই । 

বড-জা”ব ঘবে ঢুকে গামছ। খুজতে গিষে স্থলেখার চোখে পডলো৷ একটা 
জিনিস। 

ঘবের ছোট্র টেবিলটার ওপবে একখানা খাম পড়ে আছে, "অল ইত্ডিরা 
রেডিও? ছাপা আছে তাব ওপবে। খামটাতে নাম লেখা! আছে, নীরজাস্ুন্দরী 
মিত্র, বায়গ্রাম, বাহিবগাছি পোষ্ট, জেল! নদীযা। তাডাতাড়ি সে খামখান৷ খুলে 
ফেলে পড়লে _ডতেবোই আগই তারিখে নীবজাস্ন্দরী মিত্রের গান আছে 
বেডিওতে, তারই চিঠি ও কনট্রা্ট ফবম্‌। উল্টে-পাণ্টে দেখলে সুলেখা, কোনে 
ভুল নেই কোথাও । নির্ঘাত কেডিও-কনট্রাক্টের চিঠি। 

কিন্ত কার নামে? নীরজান্গুন্দণী মিত্র কে? একটা অস্পষ্ট সন্দেহ ওর 
মনে জাগলো । তাই যদি হয? খুনি সে রান্নাঘরে ছুটে এসে চিঠিখানা 
দেখিযে বল্পে--এ কার চিঠি, দিদি? নীরজাম্ুন্দরী কে? 


১. অসাধারণ 


ওর জা তাচ্ছিল্যের হানি হেসে বল্ে_দুর! ও-আবার তুমি দেখতে 
গিয়েচে? আমারই নাম। নীরজ! থেকে পাড়াগায়ে সবাই বলে-_নীরদা। 

কিন্ত মিত্র কেন? ঘোষ হবে তো? 

»-বিয়ের আগের নামটাই চলে আনচে রেডিও-আপিসে। ওরা আর 
বদলায় নি। ও কিছু নয় ভাই-_রেখে দে। ঠাকুরপোকে বারণ করে দিইছিলীম, 
নতুন বৌকে একথা বোলো! না, আমার লজ্জা করে। তাছাড়া আমার দাদার 
বারণ ছিল, শ্বশুরবাড়ির গ্রামে এসব কথা জানালে কে কি বলবে। দাদা 
আমাকে গান শিথিয়েছিলেন কিনা? হিরগ্নয় মিত্র, নাম শুনেচ বোধহয়? 

বিখ্যাত গায়ক হিরণুয় মিত্রের ছোট বোন ও শিষ্। স্থগায়িকা নীরজান্ন্দরী 
মিত্র তার সামনে বসে তালের বড়া ভাজচে ! স্ুলেখা শ্রদ্ধায় ও ন্নেহে নিজের 
আচল দিয়ে বড়ো জা'র মুখ মুছে দিতে দিতে বলে-একদিন দিদি জয়জযস্তী 
ভখজছিলেন তাঃহলে আপনিই অনেক রাতে? ঘুমের ঘোরে শুনে সে দিন*** 
পায়ের ধুলো দিন*..তখন আমি ধারণাই করতে পারিনি। এতদিন বলা আপনার 
উচিত ছিল আমাকে । আমি কি করে জানবো? 


স্পস্ট শী িজপদ্পাীী 


আমি সকালে উঠেই চণ্তীমণ্ডপে যেতাম হীরু মাষ্ঠারের কাছে পড়তে । 

আজ ঘুম ভাঙতে দেরী হওয়ায় মনে হোল কাল অনেক রাত্রে বাবা বাড়ী 
এলেন মরেলডাঙা কাছাগী থেকে । আমরা সব ভাইবোন বিছবান| থেকে উঠে 
দেখতে গেলাম বাবা আমাদের জন্তটে কি কি আনলেন। 

চত্তীমণ্ডপের উঠোনে পা ধিতেই রূপো৷ কাকা আমাদের বকে উঠলো-_ এ 
রাজপুত্র সব উঠলেন এখন! মারে গালে এক এক চড় যে চাবালিট! এমনি 
যায়! বলি, করে খাবা কি ভাবে? বামুনের ছেলে কি লাঙল চষতি যাবা? 

বাবা বাড়ী থাকতেও কি রূপে৷ কাকা আমাদের চোখ রাঙাবে? 

দাদা ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলে-_রাতে ঘুম হয়নি রূপো| কাকা। 

-_কেনরে? 

__ছারপোকার কামড়ে । বাব্বাঃ যা ছারপোকা খাটে। 

-_যা যা তাড়াতাড়ি পড়তে যা। 

রূপো৷ কাকা আমাদের আত্মীয় নয়, বাবার বন্ধু নয়, বাড়ীর গোমস্তা কি 
নায়েব নয়ঃ এমন কি রূপো কাকা হিন্দু পধ্যন্ত নয়। রূপো কাক! আমাদের 
কৃষাণ মাত্র । মাসে সাড়ে তিন টাকা মাইনে পায়। 

রূপে! কাকার আসল নাম রূপো বাঙাল, ও জাতে মুসলমান। আমাদের 
গায়ের চৌকিদারও ও। পিসিমার মুখে শুনেচি ব্ূপো কাক নাকি সাজিমাটির 
নৌকাতে চড়ে ওর কুড়ি বাইশ বছর বয়সের সময় দক্ষিণ দেশ থেকে আমাদের 
গ্রামের ঘাটে নিরাশ্রয় অবস্থায় এসে নেমেছিল। কেন এসেছিল দেশ থেকে তা 
শুনিনি। সেই থেকে আমাদের গ্রামেই রয়ে গিয়েচে-বিদেশ থেকে এসেছিল 
বলে উপাধি 'বাঙাল'--এ উপাধিরই বা কারণ কি ত বলতে পারব না। 


৭8 অসাধারণ 


রূপে। কাকা আমাদের বাড়ীর কৃধাণগিরি করচে আজ ন"্দশ বছর । আমাদের 
ও জন্মাতে দেখেচে ৷ কিন্তু সেটা আশ্চর্য কথা নধ, আশ্চর্যের কথা হচ্ছে এই 
যে, ও আমার বাবাকে নাকি কোলে করে মানুষ করেচে। অথচ দ্ূপো কাকাকে 
দেখলে তেমন বুড়ো বলে মনে হয় না। 


আমারই ঠাকুরদাদা হরিরাম চক্রবর্তী গাড়ুহাতে নদীর ধারে গিয়ে দীড়িযে 
ছিলেন, সায়েবের ঘাটে কই মাছ কেনবার জন্যে। রূপো কাকা সাজিমাটির 
নৌকাতে বলে ছিল । ওর অবস্থা দেখে হরিরাম চক্রবন্তী ওকে গ্রামে আশ্র 
দেন। সেসব অনেক দিনের কথা । রূপো কাকার বয়স এখন কত তা জানি 
না, মোটের উপর বুড়ো । ঠাকুরদাদ। মারা যথন যান, বাবার তখন পচিশ বছর 
বয়েস। বাবাকে তিনি নায়েব পদে বহাণ করে গেলেন জমিদার বাবুকে বলে 
কয়ে। সেই থেকে বাবা আছেন মরেলডাঙা কাছারীতে । আর বাড়ীতে বিষয় 
সম্পত্তি দেখা শোনা, প্রজা, খাতকপত্র এ-সব দেখা শুনো করার ভার এ সাঙে 
তিনটাক1 মাইনের কষাণ বূপো কাকার ওপর। 


আমাদের অবস্থা ভালো গ্রামের মধ্যে--এ কথা সবার মুখেতে শুনে এসেচি 
জ্ঞান হয়ে অবধি। বড ঝড় চার পাঁচটা ধানের গোল1। এক একটিতে অনেক 
ধানধরে। কলাই মুগ অজন্র। গ্রজাপত্র সর্ধদা আমচে খাজনা দিতে। 

এ সব দেখাশুনা করে কে? 

রূপো কাকা সব দেখা শ্তনা করতো৷। আশ্চধ্যের কথা, বাঝা বিশ্বান করে 
এই সামান্ত মাইনের মূর্খ কষাণকে এত সব বিষয়-আশয় দেখবার ভার দিষে 
নিশ্চিন্ত ছিলেন। 

বাবাকে সবাই ভীষণ ভয় করে চলতো! ) মুখের ওপর কথা বলতে সাহস 
করতে৷ না কেউ । কিন্ত রপো কাক বাবাকে বলতো--বলিঃ ও বাবু, তুমি ষে 
এসে বাড়ীতি ন' মাস ছ” মাস অন্তর, এতডা বিষয় দেখে কে বল তো) 


রাপো-বাডাল ৭৫ 


আদার পত্তর ত এবছর কিছু হোল নি। হাতীর পাঁচ পা দেখেচো নাকি? 
এত বড সংসারটা চলবে কিমি? 

বাবা ছু'ম।স অন্তুব ছু'তিন দ্দিনের জন্য বাডী আসেন । 

বাবার অনুপস্থিতিতে গোলার চাঁবি খুলে রূপো কাকা ধান পাড়তো, কলাই 
মুগ পাডতো । খাতকদেব কজ্জ দিতে! । নিজের দরক!খ হোলে নিজেও 
নিতো] । 

আমরা সব ছেলেমানষ কিছুই বুঝবি নে। ঠ'কুরযা প্রবীণ! বটে, কিন্ত 
ভালোমান্ঘব। বিষয়-আশয়ের কিছুই বুঝতেন না। আমাদের আছে সব, কিন্ত 
দেখে নেবার লোক নেই। 

সে অবস্থায় সব কিছুর ভার ছিল: রূপে! কাকার ওপর। 

বাব! বাড়ী এসে পরদিন চণ্তীমণ্ডপে বসতেন মহাজনী খাতা খুলে। 

বলতেন--কে কি নিরেচে রূপে? 

রূপো৷ কাক] বলতো-_লিখে রাখো, সনাতন ঘোষ ছ'কাঠা কলাই ছু'কাঠা 
বীজ মুগ, কড়ি ছ,কাঠ।-- 

-_আচ্ছা। 

__হয়েচে ? আচ্ছা জেখো-_বীরু মণ্ডল ছু,বিশ ধান, কড়ি পাচ ললি-_ 

_ আচ্ছা । 

_ ভখেচে? 

- হয়েচে। 

__রূপো বাঙাল একবিশ ধান ছু'কাঠা কলাই__ 

- আচ্ছা । 

-হয়েচে? 

-হয়েছে | 

- লেখো, কাটু কলুচার কাঠা কলাই, কড়ি চার কাঠ । ময়জদ্দি সেখ» 


৭৬ অসাধারণ 


ধান এগার কাঠা, কড়ি সাত কাঠা। এইভাবে রূপে! কাক! অনর্গল বলে চলচে 
গত ছ'মাসের মধ্যে কঙ্ছ দিয়েচে যাকে যতটা জিনিস । ওর সব মুখস্ত, কোনে। 
কিছু ভোলে না। ওরই হাতে গোলার চাবির থোলো। যাকে যা দরকার 
ধিয়ে সব মনে করে রেখে দিয়েচে, বাবার খাতায় লেখাবার জন্যে । 

একদিন একট। ঘটন। ঘটলো । 

রূপো৷ কাকার জর হয়েছিল, আমাদের বাড়ীতে আসেনি ছু'তিন দিন। 

এমন সময় বাব! বাড়ী এলেন মরেলভাঙা থেকে । এসেই বিকেলে বূপোকে 
ডেকে পাঠালেন। রূপো জরে কাপতে কাপতে বল্পে-বলো গে যাও আমি 
জরে উঠতি পাঁরচি নে। এখন যেতি পারবে না-_জ্বরে মরচি। তা সীতানাথ 
আর আসতে পারলে না! পায়ে পায়ে? তাঁর একটু এলে কি মান যেতো? 

বাবা বাবু মান্থুষ। নতুন বাবু, রূপো বাধানো ছড়ি হাতে শিয়ে বেড়ান, 
কৌচা হাতে নিয়ে। ঘড়ির চেন ঝোলে বুকে, হাতে থাকে ঝকমকে আংটি। 
প্রজাপত্বরের কাছে খুব খাতির । বাবাকে যখন লোকে ফিরে এসে একথা বললে, 
তখন বাবা একেবারে তেলে-বেগুনে উঠলেন জলে। কিন্তু তখন কিছু না বলে 
গুম্‌ হয়ে রইলেন । 

এর দিন পাঁচ ছয় পরে রূপে] কাকা সেরে উঠে আমাদের বাড়ী এল। বাব 
তখন চণ্তীমণ্পে বসে হিসেবের খাতাপত্র দেখছিলেন । ওকে দেখেই কড়া। 
নুরে বলে উঠলেন- _রূপো ! 

কি? 

. তুমি মনে মনে কি ভেবেচ জিগ্যেদ করি? তোমার এতবড় আম্পর্ধা, 
তুমি বলে! আমি পায়ে পায়ে তোমার বাড়ি যাবে৷? তুমি জানো, কার সামনে 
তুমি দীড়িয়ে আছ? তোমার মুওুট! যদি কেটে ফেলি তা হলে খোঁজ হয় না 
তুমি জানো? এত বড়লোক তুমি ছোলে কবে? 

রূপে! কাকাও সমানে গল! চড়িয়ে উত্তর দিলে-_-তা তুমি মাথা কাটবে না? 


রূপো-বাডাল ৭৭ 


এখন কাটবে না? এখন কাটবে বৈকি! ই্যারে সীতেনাথ, তোকে ষে 
কোলে করে মানুষ করেছিলাম একদিন, মনে পডে? এখন তুমি বড হয়েচ, 
বাবু হয়েচ, সীতেবাবু_এখন তুমি আমার মু কাটবা! না? বড্ড গুণবস্ত হয়েচিস 
তুই, হ্যা সীতেনাথ-_-তৃমি' ছেডে বূপো কাকা, সামান্য সাড়ে তিন টাকা মাইনের 
কর্মচারী হয়ে মনিবকে “তুই বলেই সম্বোধন আরম্ভ করলে সকলের সামনে? 

বাবা বলেনস্প্য] যা বকিস নে__ 

--না বকবে! না-_তুই বড্ড তালেবর হয়েচিস আজকাল, বড্ড বাবু হয়েচিস্‌ 
-__তুই আমার মুড নিবি না তো কে নেবে? 

বলেই রূপো কাক। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললে । 

আমার ঠাকুবমা ছিলেন বাড়ীর মধ্যে। রূপোর কানন! শুনে তিনি বাইরে 
ছুটে এসে বাবাকে যথেষ্ট বকলেন। 

বাবা বল্লেশ--তা বলে আমায় ওরকম বলে কেন? 

ঠাকুরম! বল্লেন--তুই কাকে কি বলি সীতে, তোর একট! কাগুজ্ঞান নেই ? 
তুই কি ক্ষেপলি? 

বাব কলম ছেড়ে বাড়ির মধ্যে উঠে এলেন, তারপর রূপো কাকার হাত 
ধরে বল্লেন রূপোদা, তুই কিছু মনে করিস নে। আমার বলা ভুল হয়ে গিয়েচে” 
বড্ড তুল হয়েচে। 

বূপো কাকাব রাগ কমে না, বল্লে-_ণাঃ আমার দরকার নেই কাজে । ঢের' 
হয়েচে। নে, তোব গোলাব চাবিছডা রেখে দে_মুই আর ওসব ঝামেলা 
পোয়াতে পারবো না । নে তোর চাবিছড়1। 

কতবার বোঝ!ন হলো, রূপো কাকা কিছুতেই শুনবে না। চাবির থোলো 
সে খুলে বাবার সামনে ছুড়ে ফেলে দিলে। 

শেষে বাব বল্লেন__বেশ, তা হলে আমিই বাড়ি ছেড়ে যাই। রইল গোলা 
পাল গুজাপত্তর। আমি কাল সকালের গাড়ীতেই বেরুচ্চি -- 


72৮৮ অসাধারণ 


রূপে কাক) ঝাঁঝের সঙ্গেই বল্লে_তুই চলে যাবি তা তোর কাচ্চাবাচ্চা 
মাহ্ুষ করবে কেডা? 

কেন, তুমি? 

মোর দায় পড়েচে। তোরে কোলেপিঠে কবে মাফ করলাম বলে কি 
€তোর ছেলেপিলেও কোলেপিঠে করে মানুষ করবো ? আমি কি আর জোয়ান 
আছি? এখন বুড়ো হইচি না? ওসব ঝামেলা আমার দ্বা) আর 
হবে না-_ 

--না আমি আর থাকবো না । কালই যাবে! চলে । 

--কোথায় যাবি? 

-_মরেলডাডা চলে যাবো । ঠিক বলচি যাবো । আমার বড্ড কষ্ট হয়েচে 
রূপোদা, তুমি আমায় এমন করে বল্লে শেষকালে ? আমি গৃহত্যাগী হবো, হবো, 
হবো-- বলেই বাবা ফেলসেন কেঁদে । 

রূপো কাক অমনি উঠে এসে বাবার হাত ধরে বল্পে-কীর্দিস নে সীতেনাথ, 
কাদিল নে, ছিঃ_মুই আর তোরে কি বল্লাম? তুইই তো কত কথা শুনিষে 
1দলি--কীার্দিস নে 

শেষে ছুজনেরই কান্না । 

আমরা ছেলেমানুষ, অবাক হয়ে চেয়ে দেখতে লাগলুম দুই বড লোকেব 
কান্না । দাদা আমায় কনুয়ের গু তে৷ মেরে মুখে হাত চেপে হিহি করে হেসে 
উঠলো । আমর] অবিশ্তি দ্বরে গোলার নিমতলায় দীড়িয়ে ছিলাম । 

ব্যাপারটা শেষ পধ্যস্ত অবিশ্তি মিটমাট হযে গেল। বাবাও দেশত্যাগী 
হোলেন না» রূপো৷ কাকাও চাকরী ছাড়লেন না । 

রূপো! কাকা রানে চৌক্দারী করতো। অনেক রাত্রে আমাদের বাড়ি 
এসে ঠাকুমাকে জাগিয়ে দিয়ে বলতো-- ওঠো বৌমা, জাগন থাকে'। রাত 
খারাপ । চণ্তীমগ্ডপে সন্নিসি ঘোষ ও হীরু মাষ্টার শুয়ে থাকতো, তাদের জাগিয়ে 


রূপো-বাঙাল ৭৯ 


দিয়ে বলতো-_একেবারে অত নাক ডাকিয়ে ঘুমোও কেন? ওঠো, মাঝে 
মাঝে তামুক খাও আর গোলাগুলোর চারিধারে বেড়িয়ে এস না-_ 

একটা অদ্ভূত দৃশ্ত কতদিন হীরু মাষ্টার দেখেচে | 

আমাদের গল্প করেচে সকালবেলা । 

সব গ্রাম ঘুরে এসে অনেক রাত্রে চৌকিদারী পোশাক প'রে লাঠি হাতে 
রূপো কাকা অন্ধকারে আমাদের চণ্ডীমণ্ডপের পৈঠার ওপর বসে থাকতো । 

এক একদিন হীরু মাষ্টার বাইরে এসে ওকে দেখতে পেয়ে জিগ্যেন 
করতো--কে বসে? 

-_মুই রূপো।। 

_বসে কেন? এত রাতে? 


--তোমরা তে দিব্যি ঘুমোচ্চ, তোমাদের আর কি? গোলার ধান যাবে, 
সীতেনাথের যাবে। চোরের যা উপদ্রব হয়েছে তার খবর কি জানবা? মোর 
ওপর ঝন্ধি কত! মে:র তো তোমাদের মত ঘুমূলি চলবে না। সীতেনাথের এ 
ঝামেলা আর কর্দিন পোয়াবে।। এবার এলি চাবিছড1 তার হাতে দিয়ে মুই 
খোলনা হবো। এ আর পারি না বুডে| বয়সে রাত জাগতি-_ 

হীরু মাষ্টার বলে- ঘুমাও গে যাও - 

__কিন্তু মুই যে তোমাদের মত নিশ্চিন্দি হতে পারিনে তার কি হবে । ধাঁন- 
গুলোর ঝক্ধি যে যোর ঘাডে ফেলে নে বাবু দিব্যি চাঙা হয়ে বসে আছেন। 
এবার আন্ক, কিছুতেই আর এ বোঝা ঘাঁড়ে রাখচি নে মুই । 

কিন্তু নিজের ইচ্ছেতে তার ছাড়তে হয়নি | বুদ্ধ বয়সে তিন দিনের জরে 
রূপো। কাক। আমাদের গোলার দায়িত্ব নামিয়ে চলে গেল। এও সাত-আট বছর 
পরের কথা । আমরা তখন স্কুলে পড়ি। সবস্থুদ্ধ ত্রিশ বত্রিশ বছর ও ছিল 
“আমাদের বাড়ী। 
বাবার সাথে গিয়ে আমরাও দেখতে পেলাম রূপে। কাঁকাকে। 


ট অসাধারণ 


রূপো কাকার ছোট চালাঘর। একদিকে ডোবা, একদিকে বাশঝাড়। 
ছেঁড়।৷ মঙ্গিন কাথ। মুড়ি দিয়ে শীর্ণ, শাদা দাঁড়ি বূপো কাক] পুরাণো মাছুরে শুয়ে । 
রূপো কাকার ছেলের নাম বেজ, লোকে বলে বেজ। বাঙাল। বেজ! আমাদের 
দেখে বললে--আস্মন বাবুরা, দেখুন দিকি বাবারে ? জ্ঞান নেই, ভূল বকচে-_ 

বাবা ওর মুখের ওপর ঝুঁকে গড়ে বল্লেন_ও রূপোদা? কেমন আছ» 
ও রুপোদা-- 

রূপো কাকা চোখ মেলে বল্লে-কেড1? সীতেনাথ? কবে এলে? 

--এই পরশু এসেচি । 

বেশ করেচ। এই শোনো, খাতার মুড়োয় লিখে রাখো, মুই চিড়ে খাবার 
বেনামুরি ধান নিইচি চার কাঠা, আহাদ মণ্ডল কলাই ছু' কাঠা, বাড়ি ছুঃ কাড়া, 
বিটু ধেরিসি ছ” কাঠ। ধান, বাড়ি চার কাঠামোর ধান পোঁষ মাসের ইদিকে 
দিতে পারবো না বলে দিচ্চি_ ভূল যাবো, লিখে রাখো 

এই রূপে কাকার দায়িত্বের শেষ। আর কোন কথা বলেনি রূপো কাকা ॥ 
সেদিন সৃন্ব্যেবেলা রূপো! কাকা আমাদের গোলাপালার দায়িত্ব চিরদিনের মত 
ঝেড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেল। 


বিশ্বস্ত লোকেদের জন্তে কি কোনে ন্বর্গ আছে? 

যদি থাকে, আমাদের বাল্যের রূপো কাকার আসন অক্ষয় হয়ে আছে 
সেথানে। 

আজ ত্রিশ বছর আগেকার কথ। এসব। এই সব চোরাবাজারের দিনে, 
জুয়োচুরির দিনে, মিথ্যে কথার দিনে বড্ড বেশি করে রূপে৷ কাকার কথ 
মনে পড়ে। 


৮(তুলতলার ঘাট 


হারুর আজ আর জর আনেনি । এখন তার মনটাতে বেশ ক্ষৃত্তি আছে । জর 
এলে আর ক্ফৃপ্তি থাকে না। কিছু না কিছু নিরানন্দ আসেই। আজ চার মাস 
ধরে সমান ভাবে ম্যালেরিয়া জ্বর, পেট জোড়া পিলে, আর সর্বদাই ভয় ওই বুঝি 
জ্বর এলো । 

অনেকেই ওকে দেখে বলে--ইস্‌্! ছেলেটার মিত্যু দশা হয়েছে একেবারে । 
এবার বুঝি বা সরে । এ সব বলতো এমন সব লোকে, যারা ওকে ভালবাসার 
চোখে দেখে না। যে ভালবাসার চোখে দেখে, সে কি এমন কথা বলতে পারে! 
হারুও তা বুঝতো, বুঝে চুপ করে থাকতো। জ্বর আসাট! যেন ওর মস্ত বড় 
অপরাধ, এজন্তে সে একদিকে যেমন বাড়ীতে বাব! ম। ও পিসিমার, অন্ত দিকে 
পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছেও অপরাধী । 

ওর মা বলে__সকলের হাড় জালালি তুই বাপু, কারু সোয়াস্তি নেই তোর জন্যে 

অথচ কেমন সুন্দর দিনগুলি। সুনীল আকাশ, অদ্ভুত ধরনের সুনীল 
আকাশ । মলমলে রোদ পড়েচে পথঘাটের হুধারে বনে ঝোপে। রাস্তাঘাট 
এখনে খট খট করচে। আজ দ্রিন কুড়ি একদম বুষ্টি বন্ধ । চাষার1 রোজ 
গাজিতলায় রোজ-পালুনি করচে। আল্লা আল্ল! বলে মাঠে বুক চাপড়ে চীৎকার 
করচে, বৃষ্টির চিহও নেই। মেঘই নেই আকাশে তার বুষ্টি। ধান এবার হবে 
না সবাই বলচে। 

এই সব দিনে প্রত্যেক ঝোপে, প্রত্যেক লতার তলায় যখন রোদ পড়ে, যখন 
মউটুস্কি পাখী বন-চন্দনা লতার আগায় মুখ উচু করে দোল খায়, কট্গন্ 
ঘে'টকোল ফুলের দল ঝোপে ঝাড়ে ফোটে, তখন ঘর আর বার একাকার হে 
যায়, ঘরে মন বসে ন|। 


হারু তখন পাশের বাড়ীর চুর আর মণ্ট,র বাড়ী যায়। 
ঙ 


৮২ অসাধারণ 


মণ্ট, মায়ের জন্তে ডাটা শাক তুলচে ওদের বাড়ীর সামনের ক্ষেতে। ওকে 
দেখে বল্লে- কিরে, আজ জর আসেনি তোর ? 

যেন তার জর আসাট? প্রভাতকালে সূর্যোদয়ের মত এব টা প্রাকৃতিক ঘটনা । 
কেন যে ওরা জরের কথাট! মনে করিয়ে দেয়! হার বল্পে__না, জর কিসের? 
চল্‌ বেড়িয়ে আসি । 

--মাকে ডাটাগুলো ছিয়ে আসবো । তুই একটু ধাডা। 

--এ খেত করেচে কে? 

তুই জবে পড়ে ভুগবি, দেখতে তো আসবি নে? এবার এ খেত আমি 
করেচি। ম বল্লে, ডাট! করে রাখ. জমিটাতে, তাই জমিটা করলাম । 

হারুর মনে হুঃখ হোল বার বার তার জর আসার উল্লেখ করাতে । একবার 
এত বাগ হোল, নে বেড়াতে যাবে না কারুর সঙ্গে; একাই সে পথে পথে আগেও 
খেল! করতো, এখন জ্বর হওরার পর থেকে মনটা কেমন হয়ে পড়েছে, একা 
বেড়াতে ভয় ভয় করে, আগে যে সাহ্‌স ছিল, এখন আর সেটা নেই। নয়তো! 
মণ্ট,র মত সঙ্গীকে সে গ্রাহ্থও করে না। 

ছজনে অবশেষে বেরিয়ে গেল নদীর ধারে । কাঠ-কাটা নৌকে1 এসেচে পুব 
দেশ থেকে, বড় বড গুড়ি পড়ে আছে এদিকে ওদিকে । বর্যাকালে অনেক 
গুঁড়ির গায়ে তেলাকুচো লতা। উঠেচে, ছু একট। তেলাকুচো ফলও ফলেচে । 

কি এমন মায়! যে জায়গাটার ! 

হারুর ঝড় ভাল লাগে । খেলা করবার মত জায়গা । 

মণ্ট, ও হারু কতক্ষণ সেখানে খেলা করলে, খেলা করবার উৎসাহ কারে 
কম নয়। তেলাকুচা লতার ফল মণ্ট, তুলতে গেলে হারু তুলতে দিলে না। 
কেন, বেশ তো ছুলচে লতার আগায়, একটা আধপাকাও হয়েচে, তুলবার 
কি দরকার? বেশ দ্েখাচ্চে গাছে । বেনে বৌ জোড়ায় জোড়ায় বেড়াচ্ছে 
কাল কাহুন্দে গাছের ঝোপে ঝোপে। 


তেতুলতলার ঘাট ৮৩ 

কত্তক্ষণ কেটে গিয়েচে হুজনের কারো! খেয়াল নেই। 

মণ্ট, কাছে গিয়ে বলে_অমন করে বসলি কেন রে? অর এল নাকি? 

-নাঃ রি 

দেখি গা-ওরে বাস্রে, গ1 ষে পুড়ে য!চ্ে-_বাড়ি ষা বাড়ি যা 

হাক বিমর্ষভবেবন্ধে__তুই অরের কথা অত করে মনে করে দিলি কেন? 
আমি ভুলে ছিলাম বেশ । যেমন তুই মনে করিয়ে দিলি, অমনি আমার জর এল। 

মণ্ট, বল্লে__না, না রে, তোর এমনিও জর আসতো, আমি মনে করে দেওয়ার 
জন্তে কি আর জর এল ?”ও তোর ভূল কথ । চ, বাড়ী চ--. 

বাড়ীতে আজ চিংড়ি মাছ দিয়ে লাল ডাটার চচ্চড়ি হচ্চে সে দেখে এসেছে । 
কলাইয়ের ডাল দিয়ে ওই চচ্চডি দিয়ে ভাত খেতে যে লাগে! 

মাকে না বল্লেই হোল যে জর হয়েচে। মণ্ট,কে পথ থেকেই সরিয়ে দেওয়ার 
জন্তে বল্লে-_তৃই বাড়ি যা--আমি একা যেতে পারবো-_ 

যেতে পারবি ঠিক? 

-খুব। ভারি তো একটুখানি জর । ও এখুনি সেরে যাবে । তুই যা_ 

হাঁ বাড়ী ফিরে দেখলে রান্না এখনে! হয়নি। কিন্তু দেরি করতে গেলে 
চলবে না, সে জানে এর পরে এমন ভীবণ কম্প উপস্থিত হবে যে রোদে গিয়ে 
বদতেই হবে, নয় তো। লেপ মুড়ি দিয়ে গিয়ে শুতে হবে। গায়ে কাট! দেবে, 
বমি হবে। স্ৃতরাং ভাত যদ্দি খেতে হয় তবে আর দেরি করা উচিত হবে না, 
এখুনি খেতে বসা উচিত। 

মা জ্বর এসেচে বুঝতে পারলেই সব মাটি। আর ভাত দেবে না। ও 
ঝান্াঘরের দোরে ধীড়িয়ে নিব্বিকার ভাবে বলে--যা, খিদে পেয়েছে । 

--কোথায় গিয়েছিলি রে সকাল বেলা ? 

-খেলা করছিলাম নদীর ধারে । 

ইচ্ছা করেই সে মণ্ট.র নাম করলে না। যদ্দি এরা তাকে ভেকে পাঠায় ব1 


৮৪ অসাধারণ 


এমনি কিছু, তবে সে বলে দেবে জরের কথা। সে বললে ভাত ছ্যাও খিদে 
পেয়েচে- 

--আজ এত তাড! কেন? 

--আমার যা খিদে পেয়েচে ! 

-_এখনো চচ্চড়ি হয়নি। শুধু ভাল আর ভাত নেমেচে-_- 

--তাই দাও, তাই দিয়েই খাবো-_ 

ভাত খেতে বসে হারুর মনে হোল, না খেতে বসলেই ভাল হোত। জর 
চেপে আসচে। শীত এত বেশি করচে যে রোদে না বসলে আর চলে না। উঃ 
দাতে দাত লাগচে এমন শীত ! ভাত খেয়েই সে গিয়ে বাড়ীব পেছনে নিমগাছটার 
তলায় রোদে বসলে । একটু পরে ওর ঠকৃঠক্‌ করে কীপুনি ধরলো, এদিকে 
রোদে পিঠ পুডে যাচ্ছে, কেমন একটা ঘোব ঘোর ভাবে ওকে আচ্ছন্ন করে 
ফেলেচে। হারু বুঝলে ভীষণ জবর এসেচে ওর | 

ওর মা বল্লে--বসে আছিস কেন রোদে ? শরীর খারাপ হয়নি তো? 

- | 

-হু' মানে কি 7 জ্বর আসচে? সরে আয় ইদিকে দেখি, পোঁড়ার মুখো 
ছেলে, তবে ভাত খেলি কি মনে করে ? এমন করে ভুগে মরবি কঙ্গিন ? 

বেশ। যেন তারই দোষ। তার যেন ইচ্ছে যে রোজ জ্বর আসে। বাপ 
মায়ের অভ্যেস সব দোষ ছেলের ঘাড়ে চাপানো । হুস হোল যখন ওর আবার» 
তখন বেলা গিয়েচে | রাঙা রোদ কাটাল গাছটার মাথায়। শালিক পাখীর দল 
ভাঙা পাঁচীলের ওপর কিচ. কিচ.করচে। ওর মুখ তেতো হয়ে গিয়েছে, মাথা 
ভার, চোখে কেমন ঝাপস! ভাব। 

ও বল্লে-_কি খাবো মা? 

-্পকি আবার খাবি? ভাত থেষে জর এসেচে, খাবি কি আবার? সাবু, 
করে দেবে রাতিরে। 


তেতুলতলার ঘাট ৮৫ 


হারু নাকি সুরে বলে- নাঃ সাবু আমি খাবে না_হা-উ-উ-- 

-__না সাবু খাবে না, তোমার জন্তে আমি পিঠে পুলি করি। চুপ করে শুয়েথাক। 

ভোর রাতে ঘাম দিয়ে হারুর জর ছেড়ে গেল। তার পর ঘুম ভেঙে যায়। 
শরীর খুব হাঁলকণ মনে হয় এবং খুব খিদে পায়। অত রাতে আর কে কি খেতে 
দেবে, সে চুপ করে শুয়ে থাকে ভোরের আশায় এবং ভোরের আলো খড়ের 
ঘরের দেওয়ালের মাথা দিয়ে দেখতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ও মাকে ভাক দিতে 
জাগলো। ওর ঘুমকাতুবে মা চোখ না মেলেই এপাশ ওপাশ ফিরে বলতে 
লাগলো-_বাঁবাঃ সারাদিন হাড়ভাঙ। খাটুনির পরে একটু যে শোবো সে জে। 
নেই। এবটু চোখ বুজিয়েছি অনি ষাঁড়ের মত চিচ কার !*হাড় ভাজা ভাজ 
হয়ে গেলো! 

হার নাকি-স্থরে বছে__বে চোখ বুজেচো বুঝি! রোদ উঠে গিয়েচে 
গাছপালার মাথায়। আমার খিদে পেয়েচে_ উঠে ছ্া/খো৷ কত বেলা_- 

অব্্ত এও অতিশয়োক্তি। রোদ ওঠেনি, সবে ভোরের আলো ফুঁটেচে 
মাত্র! ওর মা ওঠবার বিশেষ কোন আগ্রহ দেখালে না। ছেলের এ নাকি সুরে 
চীৎকার সকাল বেলার দিকে এ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা । হারু থানিকট। কামার 
পরে আপনি চুপ করে। 

বিছানা ছেড়ে উঠতেই বেশ আনন্দ লাগে । আজ কি হ্থন্দর দিনটা । কেমন 
পাখীর ডাক বাশ গাছের মগভালে। কাল হারুর মা! বলছিল আজ কুমড়োকাট৷ 

ক্রান্তি। যে যার গাছ থেকে যা পারবে চুরি করবে__-শসা, লাউ, কুমড়।_ 

যার য1 ইচ্ছে, কেউ কিছু বলতে পারবে না বা সাহসও করবে ন|। 

অন্য কিছু নয়, গানি বুড়ির উঠোনের মাচায় সেই যে শন গাছ! চমৎকার 
শসার জালি দুলচে কঞ্চির আড়ালে আড়ালে । কতবার লোভ হয়েচে ওর, কিন্তু 
বুড়ী বড় সতর্ক। আজ ওবেলা রাতের অন্ধকারে একট৷ দা হাতে গোটা পাচ 
ছয় শসার জালি আর গোটা শনাকে যদি সাবাড় করা যায়" 


৮৬ অসাধারণ 


উৎসাহে বিছান]। ছেড়ে সে উঠে পড়লো । 

মণ্ট,দের বাড়ি গিয়ে এখুনি পরামর্শ করতে হবে। খাওয়ার কথা সে ভূলেই 
গেল। এত কান্না, এত অন্থুযোগ ষে খাওয়ার জন্তে । 

এক ছুটে সে পৌছুল মণ্ট,দের বাড়ি । মণ্ট, ওর জা/ঠামশায়ের পাশে বে 
সকালবেল! মুড়ি খেতে খেতে ধারাপাত মুখস্থ করছিল। হারুকে দুর থেকে 
আসতে দেখে সে বিশেষ কোন উৎসাহ প্রকাশ করলে না, কারণ এখন জ্যাঠা- 
মশায়ের হাত এড়িয়ে খেলতে যাওয়া অসম্ভব । 

সৌভাগ্যের কথা মণ্ট,র জ্যাঠামশায় এই সময় তামাক সাজতে গেলেন বাড়ীর 
মধ্যে । | 4 

হারু ছুটে এসে বললে- আজ কী দিন মনে আছে ? 

মণ্ট, পেছন দিকে সতর্ক দৃষ্টিপাত করে বললে-_কী দিন? 

--কুমড়ো কাটা আমাবস্তে-_- 

--কে বললে? 

সকলকে জিগ্যেস করে গ্ভাখ_ 

কি করবি? 

-_তুই আর আমি ব্রেবে!। গানি বউয়ের বাডি সেই শসা গাছ আছে 
তে!? আজ রাত্তিরে সব শসা-_কি বলিস? 

__-তুই এখন যা, জ্যাঠামশায় আসচে, ওবেলা আমি তোদের বাড়ি যাবো। 

হারু সতৃষ্ণ নয়নে ওর মুড়ির বাটির দিকে চেয়ে বললে-__কি খাচ্ছিস ? 

-মুড়ি। 

--দেনা একগাল? 

এবার হারুর কানেও জ্যাঠামশায়ের খড়মের শব্ধ পৌছেচে। সে তাড়াতাড়ি 
কাপড়ে অকারণ ডান হাতখানা মুছে মণ্ট,র সামনে পেতে বললে- শীগ্গীর দে, 
তোর জ্যাঠামশায় আসচে। পরক্ষণে এক মুঠো মুড়ি মুখে পুরে দিয়েই সে ছুটে 


তেতুলতলার ঘাট ৮৭ 


পালালো। মনে ভাবলে-_বুড়ো এসে পড়লেই বকতো,আমায় দেখতে পারে ন1 মোটে। 
কি কেপ্পন সণ্ট,টা! একগাল মুড়ি কত ক*ট! দিলে স্াখো-_দিব্যি মচমচে মুড়ি__ 

তারপর সে বাড়ী পৌছে দেখলে ভ্ভার মা সামনের উঠেন ঝাট দিচ্ে। 
খাবার দেওয়ার কোনে৷ ব্যবস্থা ও উদ্যোগ কিছুই নেই এ বাড়ীতে । 

মা ওই এক রকমের লোক হারু জানে । অন্ত লোকের মায়ের মত নয়। 
কাল রাতে বে খাইনি, জানে| সবই, গ্যাও ন] বাপু খেতে সকাল সকাল। কাগ্ু" 
খান! বেশ ! একটু বেল। হোলে মা যদিও খেতে দিলে, সে মাত্র একবাটি সাবু। 
সে প্রতিবাদ করতে গেলে ওর ম! ঝঙ্কার দিপ্নে বলে উঠলো হ্যা তোমাকে নুচি 
ভেজে দিই, পিটেপুলি গড়িয়ে দিই, কাল সারারাত জরে শুযোছে। কিন! ! 

যেন জর না হোলেই মা তাকে লুচি ভেদে আর পিটেপুলি করে খাওয়ায় 
আর কি! সে এ বাড়ীতে নয়। এ বাড়ীর ঝধা আছে চালভাজা, তিনশো- 
ত্রিশ দিন। লুচি! 

কিন্ত ভাত? মাকি আজ ভাতও খেতে দেবে না নাকি? কথাটা সে 
ঘুর্রিনে জিগ্যেপ করলে । 

_-ভাত খাওয়ার সমব আমার সেই গাওযা ঘি একটু দিতে হবে কিন্তু-- 

_- ভাত খ|বে কে? 

-_ কেন, আমি। 

--ইম্‌! বলে, কত সাধ যার রে চিতে, মলের আগায় ঘুর্টি দিতে__সারারাত 
জরে কো বে কবে ওনার ভাত ন। খেলে চলবে কেন। 

--কি খাবো তবে? 

--শিউলিপাতার রদ তো! খেলিনে সকালবেলা । একটু বেল! হোলে দেবো 
অখন পাতা বেটে-_আর সাঁবু। 

হারু মিনতির নুরে বল্লে--না সাবু নয়, ছুখান৷ রুটি, মাছের ঝোল দিয়ে। 
তোমার পায়ে পড়ি মাস্-পুরনো জর তে, ওতে কিছু হবে না। 


৮৮ অসাধারণ 


- আচ্ছা যাক্‌, দেখবো অখন। 

সুতরাং মনে আর একবার খুসির ঢেউ উঠলো হারুর। শরীর তার খুব 
হালক1 হয়ে গিয়েচে, জ্বর না এলেও পারে । সকলে বলে শরীর হালকা হয়ে 
গেলে জর আর নাকি হয় না। সে একা মাঠের ধারে বোষ্টম বাগানের পথে 
বেড়াতে গেল। ও বাগানের খুব নিবিড একটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে আছে সেই 
বুড়ো মাদার গাছটা এক বার রজুন কাকার দলে মিশে সে গিয়েছিল সেখানে | 
রজুন কাকা অদ্ভুত লোক, বড় বয়সের ছেলে, ওর গৌপ দাড়ি বেরিয়ে গিয়েছিল, 
তবু ও তাদের সঙ্গে খেলতো। কত নতুন নতুন খেল। শিখিয়েছিল। তার দলে 
খেলতে বেরুলে শুধুই মজা, কত রকমের মজা। কিন্ত রজুন কাকা চলে গেল 
কোথায়, একদিন হঠাৎ কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল এ গঁ। থেকে, ছবাব পুজো] 
এসেছে গিয়েচে তারপর-_আর আসেনি । 

মাদার গাছট। খুঁজে পাওয়া গেল না। ভিজে ঝোঁপ-ঝাপ--কত পট্‌পটি ফল 
ছলচে গাছে গাছে। বড বড় পটুপটি ফল। আজকাল সব ছেলেই বর্ষ- 
দিনে পট্‌পটি ফল ছোড়ে, তাদের শিখিয়েছিল সেই র্জুন কাকা । একটা বাশের 
চোঙেব মধ্যে পট্‌পটি ফল পুরে একট! কাঠি দিয়ে ঠেলে দিলেই ফটু-ফটাস্‌! যেন 
বনদুকের শব্ধ! তাই ওর নাম পট্‌পটি ফল। 

আজকাল সবার হাতে ছ্যাখো একটা বাঁশের চো আর কাটি আর 
পট্‌পটি ফলের গোছা । বরজুন কাকা না থাকলে আঙ্গ আর কাউকে পট্পটি 
ছুঁড়তে হোত না। 

ছুটো বড় বড় তিৎপল্ল।র ফুল ফুটেছিল উঁচুতে । লতার-আগে ছুলচে। 
হাত বাড়িয়ে নাগাল পাওয়া যায় না। এক থোগ্ে! পটপটি ফুলই নিয়ে যেতে 
হবে কিন্তু বছু চেষ্টা করেও সে কোনটাই সংগ্রহ করতে পারলে না। বেলা! 
হয়েচে অনেক, খিদেও বেশ পেয়েছে | 

বাড়ী গিয়ে রুটি আর মাছের ঝোল খাবে-_কি মজা ! এতক্ষণ রুটি হয়েও 


তেতুলতলার ঘাট ৮৯ 
গিয়েচে । সে রোগা মান্বষ, মা নিশ্চয়ই তার জন্তে আগে করে রাখবে । আজ 
সে বেশ ভাল আছে, আজ আর জর আসবে না। জ্বর বোধ হয় সেরে গেল। 
একটু একটু খুব সামান্ত শীত বোধ হচ্ছে, কিন্তু সেটা জরের দরুন নয়। বর্ষাকাল, 
আর এই বনঝোপে তো! রোদ পড়ে ন1 তাই, মণ্ট,রও শীত করতো, যদি সে আঙ্গ 
এই বনে ঢুকতো। 

হারু ঝোপের বার হয়ে ছায়াংহুল সরু বনপথ ছেড়ে চওড়া রাস্তার এসে 
দাড়ালো । এই চওড়া রান্তা ওদিকে নাকি কে্টন্গর পর্যন্ত চলে গিয়েছে, বাঁবার 
মুখে সে শুনেচে । একসারি ধান বোঝাই গরুর গাডী মন্থর গতিতে আসচে 
ওদিক থেকে । হারু একট! পিটুলি গাছের তলায় আধ রোদ আধ ছায়ায় বসে 
বসে গরুর গাড়ী দেখতে লাগলো । 

বোধহয় একটু বেশীক্ষণ বস হয়ে গেল। যে সময় উঠবে ভেবেছিল, সে 
সময় ওঠ! হোল না। রোদট1 বেশ যিহ্টি লাগচে। না, জর হয়নি তার। 
বর্ষাকালে রোদ সকলেরই ভাল লাগে । 

বাড়ীতে যখন সে পৌছলো, তখন বেলা বারোটা । হাতে তার গোটাকতক 
পিটুলি ফল। ওর মা বল্ে-_ওমা, ই কি কাণ্ড! এই বলে গেলি খিছে 
পেয়েচে, আমি কখন রুটি করে বসে আছি। কোথায় ছিলি? ভাল 
আছিস তো? 

- ছা 

-কোথায় ছিলি? 

--মাদার পাড়তে গিয়েছিলাম বোষ্টমদের বাগানে । 

--জ্বর হয়নি তো? 

৭1 

কিন্ত ওর কথার ধরণ আর চোখ মুখের ভাব ওর মায়ের কাছে ভালো বলে 
মনে হোল না। কাছে ডেকে বলে--তোর চোখ মুখ রাঙা দেখাচ্ছে কেনরে? 


৯৯০ অসাধারণ 


ইদ্দিকে সরে আয় গ1 দেখি বাপরে, গা পুড়ে যাচ্চে । যা শুয়ে পড় গিয়ে, আর 
থেতে হবে না। 

যখন ওব জরের ঘোর কা১লোঃ তখন রাত হয়েচে। হাক্ক চোখ মেলে চেয়ে 
দেখলে তক্তপোষের কোণে দেওয়ালের গ| ঘে'সে রেড়ির তেলের পপিদিম জলচে, 
ঘরে কেউ নেই। জর ছেড়ে গিয়েচে। তখনকার থিছ্ে এখনও রয়েচে। সে 
কিছু খায়ণি দুপুর থেকে । ম| কোথায় গেল? সেক্ষীণ স্বরে ডাকলে--ও-- 
মা-_আ-আ-_ 

কেউ উত্তর দিলে না। মা রান্নাঘরে কাজ কবচে বোধহয়, কিংবা হয়তো 
পাশের নি'তাই কাকার বাড়ী গিছেচে। 

একটু পরে ওর মাকে সন্তর্পণে প। টিপে টিপে ঘরের মধ্যে ঢুকতে দেখে ও 
একটু অবাক হয়ে গেল। মা অমন করে হাটচে কেন? আমসত্ব চুরি করবে 
নাকি? সে তে! আমসত্ব চুরি করবার স্ময় অমনি'**...মা এসে ওর মুখের 
ওপর ঝুকে দেখতে গেল। চোখ তাঁকিষে থাকতে দেখে যেন একটু অবাক 
হয়ে গিয়ে নরম মোলায়েম সুরে বলে-বাব। হারু! কেমন আছ বাবা? 

_ভালে|। 

_দেখি? 

ওর গায়ে হাত দিয়ে ওর মা তাডাতাডি বলে উঠলে।--ওঃ কি ঘাম 
ঘেমেঠিস ! এঃ, সব যে ভিজে গিয়েচে। হারুও ত৷ লক্ষ্য করলে বটে। কাথ। 
ভিজে সপ সপ করচে। ও বল্লে--মা, আমাব খিদে পেয়েছে । 

--খিদে পেয়েচে বাবা? আচ্ছা দেবো এখন । আহ] বাবা আমার, 
সোন। আমাব, শোও । আপচি আমি । মা ঘর থেকে চলে গেলে ও ভাবলে 
মা এমন নরম হয়ে গেল কেন? অন্ত সময় মা তো খেতে চাইলে বলে ওঠে_ 
জর ছাড়তে না ছাড়তে খিদে । ছেলের কেবল খিদে আর খাই খাই, জর হয়েছে, 
চুপ করে শুয়ে থাক। 


তেঁতুলতলার ঘাট ৯১ 


কিন্তমা আজ অমন মিগি, অযন মোলায়েম স্বরে কথা বলচে কেন? পা 
টিপে টিপে হাটা**হঠাৎ হারুর মনে পড়ে যায় আজ না সেই কুমড়োকাটা 
আমাবস্তে! ওঃ ভাল কথা মনে পড়েচে। এখন সবে সন্দ্যে তার তে।!জর 
ছেড়ে গিয়েচে। এইবার মণ্ট,কে ডেকে নিয়ে গানি বুড়ির বাড়ী শসা চুরি করতে 
যেতে হবে! আরও একটু রাত হোক। ততশ্ণ সে খেয়ে নিক। 

ওর মা একটু বালি শিয়ে ঘরে ঢুকে বলে--এটুকু খেয়ে নাও তো! বাবা। 
উঠে। না, শুয়ে থাকো লক্ষি ছেলে--ও লক্ষি ছেলে আমার-_ 

ও বিশ্মিত স্বরে বলে-_ কেন, আমার সে ওবেলাকার কুটি? আমি খেষে 
শ৮ কাটতে যাবো এক জায়গায়।--আজ কুমড়োকাটা আমাবন্তে যেঃ 
জানো না? 

ওর মা বিগ ভাবে ঘাড নেড়ে বল্পে-খুব জানি বাবা, তুমি শোও । 
কুমড়োকাটা আমাবস্তে গিয়েচে কাল--তুমি এই ছ্দ্িন ধরে বেহস। ম] 
মঙগলচণ্ডী, সারিয়ে গ্ভাও মণ সেরে গেলে পুজো পাঠিয়ে দেবো বটতলায়__ 

ভোড়হাতে বটতলার উদ্দেশে ওর ম। গ্রণাঘ করে। 


গছ 


দুই দিন 


রামনগর বারোয়ারি তলায় আজ খুব জাকের যাত্রা। কলকাতা থেকে 
ফল এসেচে, বেশ বড় দল। রসিক বাড়ুয্যের যাত্রার দল, যার নাম এ অঞ্চলের 
লোকের যথেষ্টই শোনা কিন্তু এত বড় দল কি পাডার্গাযে আসে যখন তখন? 
এবার বহু চেষ্টার ফলে ওদের আন হয়েচে ৷ রামনগর উচ্চপ্রাথমিক পাঠশাল। 
থেকে ফেরবার পথেই কাতু এ সংবাদটি জোগাড করে এনেচে। এ নিয়ে 
অনেক কথাবার্তাও হয়ে গিয়েচে কাতু ও তার বন্ধুবাদ্ধবের মধ্যে । 

ননী ওদের বাড়ি এল পেয়ারা পাড়তে। কাতুব বাবা ছুর্গাচরণ মজুমদার 
চোখে দড়ি বাধানে! চশমা পরে বাইরের ঘরে বসে জমিজমাসংক্রান্ত কাগজপত্র 
দেখছিলেন। 

ননীকে দেখে বলেন-_কি? 

দুর্গাচরণ ৰড় কড়া গএকৃতির মানুষ । ননী ভয়ে ভয়ে বলে--জ্যাঠামশায়, 
কেতো আছে? 

“কেন? কি দরকার তোমার? 

__-জ্যাঠামশায়, ছুটে পেয়ার পাড়বো? 

--তা পাড়বে না কেন? তোমাদের জন্তেই তে! গাছ করে রাখা । কেন 
পাড়বে না? 

ননীর সাহসে কুলোল না৷ পেয়ারার সম্বন্ধে কোন কথা তুলতে । সে চলে 
যাচ্ছে বাড়ির বার হয়ে, এমন সময়ে কাতু তাকে দেখতে পেয়ে বাড়ির ভেতর 
থেকে ছুটে এল। 

ননী বল্পে-_ভাই, তোর বাব! পেয়ারা পাড়তে দিলে না 

কাতু আশ্বাস দিয়ে বল্পে-বাবা এখুনি উঠলো বলে। নসবাপুর যাবে 


ছুই দিন ৯৩ 


খাজনার তাগাদা করতে । সেই ফাকে তুই আর আমি পেয়ার পাড়বে! । 
আজ রাত্রে যাত্রা শুনতে যাবি নে? 

-_ তুই যাবি? দল খুব ভালো, না? 

»-ও বাবা। কলকাতার বড় দল, দেখিস কি চেহারা, কি সব সাজগোজ, 
কি গান--- 

--তুই কি করে জানলি? দেখিচিস নাকি? 

--সবাই বলচে রামনগরের বাজারে । ছুশো টাকায় এক রাত-_আর 
আমাদের বেলেডাঙার দল আর-বছর ত্রিশ টাকায় এক রাত গাইলে-_রামোঃ 
কিসের সঙ্গে কিসের কথা । ছুশে! টাক] আর ভ্তিশ টাকা ! 

কাতু আর ননী খুব হেসে উঠলো এক চোট। তাদের মনে হলো! এমন 
একটা মজার কথ! তাঁরা কখনে! বলেনি বা শোনবার স্থযোগ পায়নি । উৎসাহের 
চোটে কাতু রসিক বাডুয্যের দলের গুণাগুণ অনেক বাড়িয়ে বলে। তাদের দলের 
ভীম যে সাজে তাকে নাকি সে দেখে এসেচে, এক হাঁড়ি ভাত ডাল তার সামনে 
বেড়ে দেওয়া হ্য়েচে, তা সে একা খাচ্চে। তার চোখ ছুটে! লাল ভাটার মত, 
দেখলে ভয় হয়। গলার স্থুর কি ! যেন বাঘের গলার আওয়াজ। ওদের তলোয়ার- 
গুলো কিন্তু সত্যিকার তলোয়ার, অন্ত অন্য বাজে দলের মত রাঙ ঝা টিনের নয়। 

বল! বাহুল্য এ সবের কিছুই কাতু দেখে আসেনি । সে অবিশ্বি যাত্রা 
দলের বাসাতে গিয়ে দেখেছিল অনেকগুলো লোক কলার পাতা পেতে ভাত 
খেতে বসেচে, তার মধ্যে কোন্ট1 ভীম কোন্টা নকুল কোন্টা বেদব্যাস সে তার 
কিছুই জেনে আসে নি। 

ননী সব শুনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বল্লে- তোর বাবা! তোকে নিয়ে যাবে। 
আমায় আমার মাম] যেতে দেবে না। মাম! যদি দেয়, মামীম! তে। খাড়া! উঠিয়ে 
আছে ! আমার বড় ইচ্ছে যেতে। 

ছুই বন্ধুতে পরামর্শ করলে। ওরা যাবে নিশ্চয়ই । ননীকে যদি মামা না? 


৯৪ অসাধারণ 


যেতে দেয় তবে সে লুকিয়ে যাবে কাতৃর বাবার সঙ্গে। ইজনেরই বুক ছুড় ছুড় 
করচে কি হয় কি হয়। 

সন্ধ্যার আগেই ছুর্গাচরণ মজুমদার চাদর কাধে ফেলে লাঠি হাতে নিয়ে ল$ন 
ঝুলিয়ে যাত্রা শুনতে বেরুলেন। কাতু গেল বাবার সঙ্গে, কিন্তু ননী বেচারীর 
মামা প্রসন্ন না হওয়ায় তাঁর বাড়ির বাইরে পা দ্েওয়৷ সম্ভব হোল না। 

কাতুর মন বেলুনের মত ফুলে উঠেচে। এখুনি সে রসিক বাড়ুয্যের যাত্র! 
দেখতে পাবে এখানে ! 

এ অসম্ভব ব্যাপার স্মব হবে এখুন! 

কতকগুলে৷ লোক এসে আসরে অ!লো জেলে দিয়ে গেল। লোকের ভিড় 
কমে গেল আসরে | বহদুর দুরান্তর থেকে লোক দেখতে এসেচে রসিক বীড়ুয্যেব 
যাত্রা, তাদের হাতে চিডেব পুটুলি, বগলে তামাক টিকের ঠোঙা। আসরের 
বাইরে এক একখান! থান ইট পেতে সবাই বসে গেল। 

আসরে বাগ্যন্ত্র আনা হোল। স্থর বাধা, টুং টাং করতে আধঘণ্ট! কাটলো । 
কাতুর ধৈর্যের বাধ ভাঙে ভাঙে। রাজা সেজে কতক্ষণে আসবে। ও বাবাকে 
জিগ্যেস করলে__কি পালা হবে বাবা ? 

হূর্গীচরণ অন্ত এক ভন্ত্র লোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন, ধমক দরে বলেন__ 
দেখো এখন কি হবে। আমি কি জানি? হছুর্গাচরণ যে লোকটির সঙ্গে কথা 
বলছিগ্েন, তিনি বলেন-_-সত্যি আজ এদের কি প্লেহবে জানো? নলদময়ন্তী 
এদের নামকর। প্লে, ছ্থাথে। কি হয়। 

এমন সময় পালার প্রোগ্রাম বিলি হোল আসরে। কাতু তার বাবার খান! 
চেয়ে নিলে । তারপর পড়ে দেখেই বিম্ময়ে আনন্দে বাবাকে দেখিয়ে বল্পে-_বাবা, 
এই দেখো নলদময়স্তীর পালা হবে। নলদময়স্তী বাবা-- দেখো না? ও বাবা-_ 


নল দময়স্তী - 
- আঃ নলদময়ন্তী ত!কি করতে হবে? নাচবে।? চুপ করে বসে গ্যাখো। 


ছুই দিন ৯৫ 


যাত্রা আরম্ভ হয়ে গেল। বিস্ফারিত চোখে কাতু এবদৃষ্টে চেয়ে দেখলে পঞ্চ” 
নল জাঁকজমকের সঙ্গে সলম| চুমকির কাজ কর! জ্রির পোবাক পরে সভাস্থল 
আলো করে বসেছে । 

কি তাদের হাত পা নাড়ার কায়দা, কি তাদের ৬রধারি আস্ফালন ! 

ইন্জের সঙ্গে বরুণের কথা কাটাকাটির কি বাহার ! 

আর গান ? এমন স্থন্দর সুরের গান এ পধ্যস্ত সে শোনেনি পাডার্গায়ে 1 

দৃশ্যের পর দৃষ্ঠ বদলে চলেচে । প্রত্যেক দৃগ্তে অভিনব ঘটনার সমাবেশ, 
নতুন নতুন স্থরের গান. নতুন নতুন সুন্দর মুখ | পীর মত মেদের । হেসে 
নয়, ওরা পুরুষ, কাতু জানে না যে এমন নয, কিন্তু হু একটি মেয়ে স্ন্ধ কাতু 
ঠিক বুঝতে পাবলে ন। ওর] ছেলে, না সত্যিই মেযে। 

সে বাবাকে বল্লে-বাবা, ও বাখা-_ 

ছুর্গাচরণ বলেন--কি ? কেন কথা বলচো? চুপ করে থাকো। 

--ওরা মেয়ে না ছেলে? 

_চুপ করে বসে থাকে! । বকো না। 

কাতু তন্ময় হয়ে গিয়েছে, তার বাহাজ্ঞান নেই । একটা দৃশ্টে তার মন নেটে 
উঠলো । এবার বোধহয় যুদ্ধের আঞগোজন চলবে । কলিরাজ যে সেজেছে তার 
কি বিকট চেহারা আর সাজসজ্জা । সত্যিই লোকটা খারাপ নাকি? নিশ্চয় 
লোকটা খুব বদমায়েস। বুড়ে1 কঞ্চুকী কি হাসিয়েই গেল। 

এইবার একটা করুণ দৃশ্ঠের অবতারণায় সভার লোক কেঁদে ভাঙিয়ে দিল, 
সেই সঙ্গে কাতুও। 

রাজ্যহারা নল বনে দিশাহারা অবস্থায় একট! বৃক্ষতলে আশ্রয় নিয্পেচেন 
( বৃক্ষতলে আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারট। অবিশ্ঠি নলের বক্তৃতার মধ্যে দিয়েই প্রমাণ 
পেয়েচে, কেননা তিনি বসে আছেন আসরের ঝাড় লনের তলায় ), সঙ্গে ররেচেন 
নিরাভরণ1 দময়ন্তী। প্রোগ্রামে আছে অলক্ষ্যে বিধিলিপির সঙ্গীত-_নলের 


৯৬ অলাধারণ 


করুণ বন্ভৃতা শ্রেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আসরের সকলে উকিঝুঁকি মেরে দেখচে 
বিধিলিপি সাজঘর থেকে বেরুল কিন! । 

কাতু অধীর আগ্রহে ফ্াড়িয়ে উঠেছে । 

কিন্তু ঠিক যে সময় একটি ঝলককণ্ের মধুর সঙ্গীতের সুরে আসর ভরে 
গিয়েচে, দেখা গেল ধীরে ধীরে বিধিলিপি গান গাইতে গাইতে আসরে ঢুকচে, 
সেই সময় দুর্গাচরণ মজুমদার হাই তুলতে তুলতে বল্লেন-_-চলো অনেক রাত 
হয়েচে। যাওয়া যাক। বাড়ি চলো-ছাতি নাও হাতে -- 

কাতু অবাক। বাবা কি সত্যিই বাড়ি ষেতে চায়? ঠিক এই সময় মানুষে 
পারে আসর ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে? কাতু বল্পে- বাবা, এখন বাড়ি যাবেন 
কি বল্চেন? আমি যাবে ন। বাবা। 

নানা চলো। ও আর কি দেখবে সারারাত জেগে । রাত দশটা । ওই 
নাকে কান্না চলবে এখন সারা রাত। চলো, চলো--ছাতিট! নে হাতে-_- 
ভিড়ে হারিয়ে যাবে। কাল আবার জেয়ালাতে খাজনার তাগিদে যেতে হবে 
ভোরে। 

চলে আসতেই হোল । উপায় নেই কাতুর। ওর চোখে জল ভরে এল। 
বাবার ওপর বিরাগে ওর মন তিক্ত হয়ে উঠেচে। কেমন লোক বাব1? কিচ্ছু 
বোঝে না। এমন সুন্দর জায়গা--! 

রাগে সে বাবার সঙ্গে কথা বল্লে না সারা রাস্তা । 


পয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর পরের কথা । 

কাণ্তিকচরণ মজুমদার সকালে উঠে কাগজপত্র দেখচেন। কার্তিকের 
মহাজনী কারবার আছে, আড়ত আছে ধানের ও পাটের। গত পঞ্চাশের 
মন্বস্তরে ধানচাল হাত ফিরতি করে বেশ কিছু লাভও করেচেন। তীর কর্মচারী 
হরিপদ এসে বল্লে-_-বড় বাবু ছে-কাটি ক*খানা গাড়ি যাবে? 


দুই দিন ৯৭ 


-_যে ক'খান! জোগাড় হয়। মাল কত? 

-__দাদনের মাল হবে পঞ্চাশ মণ। আর ইদিক ওদিকে যা জোগাড় হয়। 

- পাচখান। এখান থেকে নিয়ে যাও । 

--লরির জন্তে শস্তুকে খবর দিতে বলে দেলাম । 

- লরি একখানা নয়, ছু'খানা। আমের গুঁড়ি ঘাবে সাতটা । চার টন। 

- আপনি বেরুবেন কখন 

- আমি খেয়ে দেয়ে বেরুবো। তুমি চলে যাও আগে-__ 

এমন সময়ে কাস্তিক মজুমদারের দশ বছরের পুত্র নীলু এসে বল্লে--বাবা 
আজ থিয়েটার হবে রাহনগরে | দেখতে যাবে বাবা । 

খিয়েটারের নিমন্ত্রণপত্র কাত্তিক মজুমদার পেয়েছিলেন বটে, রামনগরের তরুণ 
»ংঘ আজ কি যেন একটা প্লেকরবে তাতে লেখ! ছিল। কিছু টাদাও তার! 
নিয়ে গিয়েছিল একদিন এসে । কিন্তু কম্মব্যস্ত কাণ্তিকের সে কথা ম্মরণ ছিল না। 

শীলু বলে-_-বাবা যাবে তো? 

-- দেখি আজ আবার অনেক গোলমাল । যেতে পারি কিনা দেখি। 

--সে হবে নাবাবা। তুমি না গেলে আমি যাবো কার সঙ্গে? আমার 
দেখা হবে না। থিয়েটার কক্ষনো আমি দেখিনি-- 

--আচ্ছা, যা, সকালে উঠে এখন পড়গে যাও.” সে তে] ওবেলা, তার এখন কি? 

এই সময়ে পাটের মহাজন ফলেয়ার মাণ্কি মণ্ডল উঠোনে এসে দীড়িয়ে বল্পে 
__বড় বাবু, আমার তার কি হোল? 

_কিসের? 

»"আমার সেই মামলা আজ মিটিযে দেন বাবু। 

দেবো । আজ পঞ্চাশ মণ আনচি দাদনের মাল, আরও একশো মজ্ভুত। 
তোমার ক'খানা লরি ? রঃ 

--ঢুখানার বায়না দেওয়া আছে। মাল বেশী হোলে আরও একখান! 


৭ 


৯৮ অসাধারণ 


আনবো । আমায় ছুশোমণ জোগাড় করে দিতে ইবে আপনার । একটু নেক- 
নজর করুন-- 

কান্তিক তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকলেন চা খেতে । কাত্তিকের 
স্ত্রী বল্লেন-:তা যাওন। একবার খোকাকে থিয়েটার দেখিরে আনো না? 
পাড়ার্গায়ে ও সব জিনিস তো কখনো হয় না_ এবার হচ্ছে যখন ওকে দেখিয়ে 
আনো। ও কখনো দেখেনি । 

কাত্তিককে অগত্যা যেতে হোল সন্ধ্যার সময় রামনগরের বাজারে, স্ত্রীর নিতান্ত 
গীড়াগীড়িতে। নতুবা ঝগড়া বাধে । কিন্তু মন তার ভাল ছিল না। কর্ধব- 
চারীর! সংবাদ দিয়েচে দাদনের পাট আশানুরূপ আবায় হয়নি । প্রায় সাড়ে সাত 
হাজার টাক। ছড়ানে। রয়েচে চাষী মহলে ধান আর পাটের দাদন বাবদ । গত 
ছুভিক্ষের সময় চড়া দামে ধান চাল বিক্রি করে মোটা টাকা ঘরে এসেছিল বলেই 
এবার আশায় আশায় এত টাকঝ। ছড়িয়ে দ্রিলেন, কিন্তু বাজার হঠাৎ নেবে যাবে 
বুঝতে পারা ধায় নি।' ধানের দামও অত্যন্ত কম, পাটও তখৈবচ। তারপর 
'অতগুলে। ছড়ানো টাকার বদলে ধান বা পাট আদায় হোল না আজও । 

নীলু ছুধ-চিড়ের 'ফলার খেয়ে এসেটে। ছেলেমান্থষের খিদে বেণী। কার্তিক 
কিছু খেয়ে আসেন নি, তিনি অর্থ উপার্জন-শক্তি অজ্জন করবার সঙ্গে সঙ্গে 
পরিপাক-শক্তি হারিয়েছেন। রাত্রে খান ছুখান! রুটি আর একটু ছুধ। আগে 
খেতেন সুজির কাট কিন্তু এখন যুদ্ধের বাজার ঘনীভূত অবস্থায় জুলী পাওয়! 
যায় না, আটার রুটিই থেকে থাকেন । 

সন্ধার পরেই থিয়েটার আরম্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চ্যাংড়া ছোকরা- 
দের ব্যাপার, হৈ চৈ করতে ছুঘণ্টা কাটবার পরে রাত সাড়ে ৭+টার সময় 
কনসার্ট বাজন। সুরু হোল । একালের থিয়েটারে ও সব অচল বলে কোন সহর- 
ঘে'স। অতি-আধুনিক তরুণ সভ্য :আপত্তি তুলেছিন। শেষ পধ্যস্ত আপত্তি 
টেকেনি। কনসার্ট না বাজলে এ পল্লীগ্রামে থিয়েটার জমবে কেন? 


ছুই দিন ৯৯ 


কার্তিক ছেলেকে নিয়ে একেবারে সামনের আসনে বসেচেন। ভার কারণ 
এ নয় যে তিনি ভালোভাবে অভিনয় দেখতে পাবেন সেই উদ্দেশ্রে। 

এর প্রধান কারণ র।মনগরের বাজারের প্রসিদ্ধ আড়তদার শরৎনাথ ওখানে 
বসেছে । শরতনাথ এ অঞ্চলের ধড আঁড়তদার, তার পাশে বসে কাত্তিক 
মজুমদার ব্যবসার কথা বলতে আরম্ভ করলেন। তিনি আসলে জানতে চান 
শরত্নাথের দাদন অনুযায়ী পাট ধান আদায় হচ্চে কিনা। কেন এ বৎসর তার 
এ বিপধ্যয় ঘটলো! । 

শরতনাথ ঘুঘু লোক, সে ব্যবস।র প্ররুত সংবাদ কাউকে প্রকাশ করতে রাজী 
নয়। ছুজনেই যখন কথাবার্তায় মজগুল তখন ্রেজে বন্দী অক্ষম সাজাহান 
গাহানারার হাত ধরে বিলাপ করচেন। 

শরংনাথ বল্পে-_-আর ভায়া, সে জুৎ বাজারের নেই। নতুন ধান সাড়ে 
[তনটাক1 মণ। আলমপুর পরগণা ভোর পাটের দাদন ছড়িয়েচি, ছশো। মণ পা 
এখনো মুত হয়নি। ব্যবসার দিন চলে গিয়েচে। কান্তিক মজুমদার বল্লেন__ 
আরে দাদা, তোমর। হলে হাতী । গেলেও ছু-প'চ হাজার, মরবে না। আর 
আমর] হচ্চি মশ।১ সামান্ততেই কষ্ট পাবো । তারপর-- 

নীলু বলচে__বাব॥ ওই ,ছ্যাখে। অ?ওরংজেব--বাবা, ভারতবর্ষের ইতিহাসে 
আছে আওরংদেবের কথা-*সেই আওরংজেব-_ 

-আঃ, তুমি খোকা বোকো না। 

শরতনাথকে কান্তিক সব কথ| খুলে বলেন নি। ব্যবসার গুপ্ত কথ! কেউ বলেন|। 

পাঁচশে! মণ পাট তিনি চিনিলি কাপাসডাঙ্গার আড়তে জমা! করে রেখেচেন, 
গরুর গাড়ি অভাবে আনতে পারচেন না সদর আড়তে, এখান থেকে লরিতে 
বোঝাই দেবেন। 

গরুর গাড়ির কি ব্যবস্থ! করে থাকেন শরতনাঁথ, এইটি কান্তিক মন্ুমদার 
জানবার উদ্দেত্তে বার বার তিনি সেই কথাই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলতে লাগলেন । 


১০০ অসাধারণ 


সাজাহান বলচেন--দেবো! লাফ, দিই লাফ-- 

নীলুর চোখ বেয়ে জল পড়চে। সে কথার অর্থ যে সব বুঝচে তা নয়, 
সাজাহানের কথা বলবার ভঙ্গিতে তার কান্না আসচে। 

নীলু বল্লে- বুড়ো কি বলচে বাবা? লাফ দেবে কোথাদ্ন? 

কাত্তিক মজুমদার জবাব দিলেন--আঃ চুপ করো। শোন কি বলচে। দুষ্টামি 
করতে নেই। 

দুষ্টমি সে কি করলে, বুঝতে না পেরে নীলু চুপ করে বইল। 

আরও ঘণ্টাখানেক কাটলো । শরৎনাথ পাচখানা গকর গডি কাল সকালে 

1ঠিয়ে দেবার অঙ্গীকার করেচে। 

বল্লে-কত সকালে? 

--এই সাতটার সময়। 

- তোমার ঝাড়ি পাঠাবো, না আড়তে ? 

-সন্র আড়তে। 

লরি জোগাড়,আছে? 

-সে জন্যে ভাবনা নেই। সুবল লরি দেবে বলেচে- ইষ্টিশানে পৌছে 
দেবে মাল। 

--ভাড়া মণকরা না টিপ পিছু? 

--টিপ পিছু । 

জহরৎ্উন্নিস1 রাজসভায় আওরংজেবকে হত্যা করতে গিয়েছিল এইমাত্র । 
খুব একচোট হাততালি পড়তেই কাণ্ডিক মুখতুলে চেয়ে দেখলেন। স্থলতান 
সোলেমানের সঙ্গে আওরংজেবের কথা কাটাকাটি হচ্ছে। কাত্তিক মজুমদার 
ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কত রাত হয়েচে? এগারো ? 

আর তিনি থাকতে পারচেন না । কাল সকালে উঠে সদর আড়তে শরতনাথের 
প্রেরিত পাচখানা গাড়ি বাদে আরও অন্তত পাচখান। গাড়ির জোগাড় রাখতে হবে ॥ 


ছুই দিন ১০১ 


নীলু বল্পে-_না বাব, আমি এখন উঠবো না-কেমন জায়গাটা হচ্ছে আর 
তুমি উঠচো এখন__ 

চলো চলো । ওমব দেখবার অনেক সময় আছে । কাল রাত থাকতেই 
আমাকে উঠে মুচিপাডাষ লোক পাঠাতে হবে গাড়ির জন্তে। তোমাদের কি? 
ভাবনা চিন্তে তো নেই, বাবা_ নাও ওঠে।-_ 

নীলু নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে কাদো কাদো মুখে বাবার সঙ্গে আসরের বাইরে 
এলো! । 

বাইরে এসে দীডিমেও সে সতৃষ্ণ ও সাগ্রহ দৃষ্টিতে পিহুন ফিরে বার বার 
দুরের আলোকিত ষ্টেজটার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো! | 

কবান্তিক মহ্ুমাদার বল্পেন_হোচট খেয়ে পড়ে যাবে_ই। করে দেখচো। কি 
পেছন ফিরে? চোখ দিয়ে চেয়ে পথ হাটো-_-অন্ধকার বাত্তির-- 


০ 


»মাকাললতার কাহিনী 


এই বর্ষায় আমাদের গ্রংমের নান বনে ঝোপে মাকাললতার নিভৃত বিতান 
রচিত হয়েচে। আমি মাকাললতা! বড় ভালবাদি। যেদিন প্রথম আমার 
চোখে পড়লো মাকাললতার বিচিত্র রচনা, তখন মন আনন্দে ভরে উঠলো । 

তারপর সেই সুম্দর দিনটি এল, যেছিনে দেখলুম মাকাললতার ঝোপে ঝোপে 
কচ! সবুজ ফল ধরেচে। সবুজ, মহন, চিকন গ! পুঈ ফলগুলির। আমি 
রোজ বেড়াতে যাই, নাইতে যাই, ঝোপে মাকালফলের শ্ব'মল রূপ দেখি অবাক 
হয়ে ঈাড়িয়ে। 

ঘন বর্ধার দিনে ননীর তীরে, নিভৃত মৌন বনবিতানে নীল আকাশের তলায় 
ঝোপেঝাপে সবুজ আপেলের মত ফলগুলি, একদৃ'্ট কতক্ষণ ধরে চেয়ে থাকি । 
প্রজাপতি ওড়ে, পাখী গান গায়। 

এ বছর বর্ষ! তেমন "হয়নি আজও, তবুও নদীর ধারে ছুটি বনের ঝোপে 
মাকাললত। যথেষ্ট বেড়ে সারা ঝোপটির মাথ! ঢেকে ফেলেচে। আর একটি 
মাকাললতার সুন্দর ঝোপ গজিয়ে সৌন্দর্য স্ট্টি করেচে গোপালনগর বাজার 
ছাড়িয়ে পুরোনো ডাকঘরটায় সামনের বটতলার়। 

ডাকঘরের এ ঝোপের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, মট্রলতার, মটরফলের গুচ্ড ও 
মাকালফল .পাশাপাশি ট্ুলচে। মনে হবে পারন্ত দ্েখের শ্র্য্যতপ্ত কোনো 
উদ্চানে আপেল ও দ্রাক্ষাগুচ্ছ একসঙ্গে ফলেচে--বাংলাদেশের ঘরোয়৷ জঙ্গল এ 
নয়। তারপর হঠাৎ একদিন দেখি মাক।ললতার ফুলগুলির কোনো কোনোটাতে 
রং ধরেচে। ক্রমে নেগুলোতে একটু করে রং চড়লো হুরধ্যতাপে, রাঙ! টুকটুকে 
গোলা ফলের রং, ঘন সবুজ ঝোপের সবুজপত্রসস্তারের মধ্যে বূপনী নববধূর 
মুখের মত উকি মারচে রাঙা টকটকে সুঠাম স্গোল ফলগ্ুলি। এই ছুটি 
মাকালঝোপ আমার কাছে কি অপূর্বই লাগে! নদীর ধারেরটি ও এই বটতলার । 


মাকাললভার কাহিনী ১০৩ 


*  নদীতীবের ঝোপ স্থষ্টি হয়েছে এক্ক নিবিড় লতাবিহানের নিভৃত ছায়াগহন 
আশ্ররে। একটা সাই বাবলা গাছের মণ্থায় মাকাললতা উঠে জড়িয়ে জড়িয়ে 
এইট ঝোপ টতরী করেচে। সাই বাবলা গাছ এমন সুন্বর, যেখানে থাকে 
সেখানে দাড়িয়ে ওর দিকে চেদ্ধে না বেখে থাকা যায় না। সরু সরু লম্বা পাতা, 
তাক] বাকা শাখা প্রশাখা, ভাব্রমাসে সাদা মঞগ্জবীর মত ফুল হয়েচে একসঙ্গে 
বহু, আর ওদের মুখ গাকে নীল আকাশের পানে উচু হয়ে। তারই ওপরে 
সেই মাকাললতার ঝোপ--অ'র মাথা থেকে ঝুলে ঝুলে পড়েচে এদিকে ওদিকে 
মাকাললতার দীর্ঘ ডালগুলি, আর তার প্রতি গ্রস্থিতে গ্রন্থিতে, লভাগ্রভাগে, সবুজ 
পত্রাস্তরালে চিকণশ্তাম অথবা লাল টকটকে মাকাল ফল। 

এর অদ্ভূত সৌন্দধ্যের জন্তে পটভূণি বচন করেছে পাশে বড গোয়ালে লতার 
আর একটি বড ঝোপ- একদিকে একটা আত্রবুক্ষের নত শাখা, দশ বর্গফুট 
আন্দাঙ্গ স্থুদীল আকাশ আর গাছের তলাঘ শেওডা, বৈচি, ভাট, বনকচু, 
বনআদা, সন্ধ্যামাণির নিবিড় জঙ্গল। প্রভাতের অপূর্ব বৌদ্র পরিক্রত হয়ে 
আসে বড গোয়ালে লতার বড বড পানের মত পাতার মধ্যে দিয়ে, ওই পাতার 
উল্টে! পিঠগুলো যেন শ্থচ্ছ দেখতে ক্র্ধ্যকিরণে, একটি সজল ছায়া বিস্তৃত হয়ে 
আছে বনতলে, মেঘনগরীর উদ্দেব নীলাকাশ তার বাণী পাঠিয়েছে তার ওই 
দশ বর্গকুট বয়সের প্রতিনিধির হাতে, শালিক, ছাতাবে, ঘুঘু, ছোফেল, নীলকন্তি, 
শ্যামা, ঢর্গা, টুনটুনি গুভূতি পক্ষীকুলের সন্থিলিত প্রভাত-কাকলীতে মুখর হয়ে 
উঠেচে বনবাণী। 

এরই মধ্যে সুদ'ঘঘ নঙমুখ লতা যেখানে মাটি ছুরে ছুলচে, সেখানে লতার 
প্রতি গ্রন্থতে ঢুলচে র'ঙা টুকটুকে মাকালফল। ভা্রমাসে বেশির ভাগ 
মাকালক্ষলই পেকেচে, কচিৎ ছু-চারটে কাচা? আছে। 

এই মাকালঝোপ কি যাহু জানে । বোধ হয় কোন এন্দ্রজালিক লুকিয়ে 
থাকে ওর শ্যাম বনানীর অন্তরালে, মানুষের মনকে যোহ্গ্রস্ত করে ফেলে এক 


১০৪ অসাধারণ 


মৃহূর্তে _যে মুহুর্তে বনতলে ছায়ায় গিরে ফ্াড়ানো যায় সেই মুহূর্তেই । কোন 
অসাধারণ এন্দ্রজালিক আর তার ইন্দ্রজাল এ! 

এই ক্ষুদ্র মাকাললতার ঝোপে আমার মন কেন মোহাবিষ্ট করে তার কারণ 
আমি জামিনে বলে কবিজনোচিত ধেয়াটে বর্ণনা দ্বার! জিনিসটাকে ঘোরালে। 
করা যেতো৷। কিন্ত এর কারণ আমি জানি। 

কিজানি? 

তাই কি বিশ্লেষণ করে বলার কথা ? 

ঝোপের পাশে দাড়ালুম সেদিন প্রভাত বেলায়। কাধে গামছা, হাতে 
সাবানের বাক্স, ইচ্ছামততীতে বনসীমতলার ঘাটে স্গান করতে যাচ্ছিলুম ৷ ইচ্ছে 
করেই ঘুর পথ দিয়ে গেলাম শুধু এই মাকালফল-দোসানো ঝোপটি দেখবো 
বলেই। 

রোজই দেখি। দেখবার সুযোগ একপ্দনও ছাতিনে । দৈনন্দিন জীবন- 
যাত্রার উদ্ধে একটি অকলুষ, উদার, দ্রিব্য জগতের অকখিত বাণী এই মাকাললতাব 
ঝোপের পথে আমার মনে প্রবেশ করে । সারা নাক্ষত্রিক বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ 
সাধন করে এই অদ্ভুত স্বন্দর রাঙা ফলগুলি! রং-এর কি তীক্ষ কনট্রাস্ট.! 
চিক্কণশ্তাম লতাবীথির শ্যামল পত্রপুপ্তের ফাঁকে ধাকে টুকটুকে রাঙা ফলগুলি-*- 
আপেল ফঙ্গের মত গড়ন অবিকল, তবে পাকা আপেল হর হলদে-লালে মেশানে। 
--এর একেবারে সি দূরের মত রং। 

এর মধ্যেই বিশ্ব। এই মাকালঝোপের নিচেই । এই যে মাকাললতাগুলে। 
এদিক ওদিক অদ্ভূতভাবে ঝুলচে গাছ থেকে পড়ে, তার গাঁটে গাঁটে পাকা ফল, 
এই যে রহস্তময় সুন্দর দৃশ্য যার দিক থেকে চোখ ফেরানে| যায না, অবাক হযে 
বিমুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে হ্য়_-এই স্থট্টির আইডিয়ারূপী বীজ কার মধ্যে ছিল? 
কোন্‌ দেবতা তিনি? কত বড শিল্পী তিনি? 

“কল্পনান্থষ্টি বীজঞ্চ” 


মাকাললতার কাহিনী ১০৫ 


কার মহতী কল্পনার মধ্যে এ সুন্দর মাকাললতার দুলুনি, এর শ্ঠামপত্রগুচ্ছ, 
এর টুকটুকে রাঙা, স্বগোল, সুঠাম ফলগুলে। ছিল বীজরূপে অধিষিত ? বাপ্পারি- 
প্রোজ্জল শত শত সহজ সহস্র লক্ষ কোটি নীহারিক! যিনি স্যঙ্টি করেচেন, সেক্ট 
মহাকদ্রের ভয়াল বপ কোথায মহাশুন্যের দুর প্রান্তে; আর কোথায় এই ক্ষুদ্র 
পৃথিবীগ্রহের এক কোণে স্থনিভূত নির্জন লতাবিতান, স্ুয্যের সে বিরাট বাত্পতেজ 
বহুমাইল ব্যাপী বাযূমণ্ডলেৰ মধ্য দিযে সজল বর্ধার ভাগযার মধ্য দিয়ে, বসম্ত্- 
দিনের জ্যোত্মার মধ্য দিয়ে, বনবিহঙ্গকাকলীর মধ্য দিয়ে, বনকুন্ুমের স্বাদের 
মধ্য দিয়ে পরিস্রত হযে মোলাফেঘ হবে প্রভাতেব রৌদ্রৰপে যে লতাবিতানকে 
আলে! করেচে”_-আব তারই মধ্যে এই সুন্দর চিক্কণ, স্পষ্ট, বাঙা মাকালফল 
লতাগ্রভাগে দোতুল্যমান ! 
যিনি অগ্নতে, খিনি জলেতে -- 
যিনি মহাকদ্র, তিনিই চিরপ্রাসীন অথ5 চিবতরুণ পুষ্পধন্ব! দেবতা * * 
সপ্টি বজায় রাখতে কামদেবের আবির্ভাবের প্রধোজনে হবতো। মুখে মুখে এক 
কবিতা রচনা করলুম সেই অজানা! শিল্পী দেবতাব উদ্দেশে'**- 
চেগা নীল আক।শেব তলে 
প্রজাপতি ওডে ফুলে ঘলে, 
হে।গ1 কোথা কত দুরে 
“ওমিক্রন্‌ সেটি' ঘোরে 
সঙ্গে তাব ুশুভ্র ব'মন * 
কবিতা হিসেবে লে'কে হাসবে হযতো | কিন্থ লোকেছেব জন্যে এ বচিত 
নয-_যাব উদ্দেশে সেই প্রভাতেব কনকহ্যতিমণ্তিত বন-বীথিতলে এ কর্বিতা 
মুখে মুখে বচিত, তিনি কৃপা ও প্রশ্রযেব স্মিতহাস্তে দক্ষিণপাণি প্রসারিত কবে 
গ্রহণ করেচেন অক্ষমের সে স্ততি। ওমিক্রন্‌ সেটিব অগ্রিলীলার মধ্যে এই 
* ওমিত্রন নেটিব সহকারী নক্ষত্র, ইংরেজীতে 'হোযাইট ডোশাফ ' *শ্রবীব। 


১০৬ অপাধারণ 


গোল গোল রাঙা মাকালফলেব স্বপ্ন লুকানে। আছে । ওমিক্রন্‌ সেটির চারিপাশে 
ঘর্ণযমান গ্রহরাজি ষ্রি থাকে, যণ্দ সেখানে অনস্তযৌবনা দেবকন্তারা সে দেশে 
বনবাথির অন্তরালে, সেখানকাব অজ্ঞাত বসন্তদিনে অলদ শঘনে শুয়ে দিনপাঁত 
করেন, কে জানে দেই বনবীথির মাঝে এমন মাকাললতা, এমন দোত্ুলামান 
ফলগুচ্চ, ঘনলবুজ ঝোপেব অন্তরালে এমন টুকটুকে বাঙা ফল হযতো 
আছে। 

মাকাল ফলের আযুফ্ষাল বেশী দিন নব, একমস দেডমাস। স্থুপক অবস্থায়ও 
দিন-পনেরো! গাছে দোলে, তারপব একদিন ঝরে পড়ে যায। তাই বোজ ছুবেলা 
যেতাম মাকাল ঝোঁপেব তলায--একমাস দেডমাস ধবে কত বপে একে 
দেখেচি_এই লতাবিতানকে । প্রভান্দরে আলোতে, ঘনবর্ধাৰ মেঘমেছবব সন্ধ্যায়, 
নির্জন ভাত্রছিপ্রহবে নিম্তর প্রশাস্তিব মধ্যে উদাব নীলাকাশেব তলে, ঘুঘুডাকা 
উদ্দাস বনানীর পটভূমিতে, হুন্দর জ্যোৎক্'বাতের প্রথম প্রহবের জ্যোতনাষ। 
বাবলাব হল্দে ফুল আন সাইবাবলার ফুলে শিদ্‌, তাব মধ্যে ছুলে ছুলে 
হলদেডানা শাদাডানা প্রজাপতিব মেলা, তার ঘণধ্য দোডন্যমান মাকাললতাব 
নিবিড ছায়াগহন আশ্রষ, তপোবনেব ন্যায় সরি, পবিত্র | খানিকটা সেখানে 
দাডালেই সৌন্দধ্যে অভিভূত হযে পড়ি, কেমন ফ্ন সাঁরাচ্ শিউবে ওঠে, মন 
অপূর্ব ভাবে ও ন্বপ্রে বিমুগ্ধ হয়ে পড়ে--এ আমি এই গত এক মাসেব মধ্যে 
তস্তত চ" সাতদিন দেখেচি। সেন্বপ্র বিসেব কি কবে বলবো, আত্রশাখা ও 
সাইবাধলার ফুলে ভরা শা*|র পরিছনকার নীল অ।কাশেব স্বপ্ন, কোনো মহাশিল্পী 
মহাদেতার প্রত্যক্ষ আবির্ভাবের শ্বপ্ন, সবুজ ঝে'পের মাথা ফলন্ত বাড মাকাল- 
ফলগুলির দ্বপ্র-গভীর সৌন্দর্যের স্বপ্ন | পাগল কবে দেখ ওই স্বপ্ন । 

আমি জানি, তেমন ভাব ও ন্বপ্রালুতা সারা বছরে একদিন এলেও জীবন 
ধন্য হয়ে যায়--তাই এই মাকাললতার সীজ স্--এ এল মাসে সাতদিন । 

এ মাকাললতার ঝোপ যেন পবিত্র দেবায়তন, অঙি পবিত্র অতি স্থন্দর ॥ 


মাকাললতার কাহিনী ১০৭ 


সৌন্দর্যের পূজাবী যে, এই দেবাধ্তনে দেবতার ভাবির্ভাব সে দর্শন কববে। 
এখানে জাত ও প্রত্যক্ষ দেবতাকে নিত্য প্রণাম কর। 

ভয় হোক মাকালফলের। জব হোঁক ওমিক্রন স্টেব। কত বড ও কত 
ছোট । কিন্তু উভধেব মধ্যেই আর্টিস্টেব আঁবিউাব অতি প্রত্যক্গ, অতি বিচিত্র 
যাব মন খারাপ হযেচে সে অমুতের সাগবে এসে তীর্থজল আহবণ করুক । 
প্রত্যক্ষ করুক খগেদের শিবরুদ্রীয় স্তোত্রের অমর বাণী। বৃক্ষের পত্রেও তুমি, 
পত্রের পনেও তুমি। 

আশ্বিন মাসেব মাঝামাঝি মাকালফল ঝরে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে মাঁকাল- 
লতার শ্টাম শোভ| অন্তরহিত হবে, বনভূমি আগামী বৎসবের শ্রাবণদিনের 
প্রতীক্ষায় থাকবে-_স্থুপর মাকালফলেব আবির্ভাবের প্রতীক্ষাঘ। ঝরঝব বাদল 
দিনেব অপবাহে আবার এদেব দল আসবে ঘুবে, যেমন এরা আসে প্রতি বর্ষা 
খতৃতে, কত বংচ্ব, কত শতাবী, কত যুগ ধরে***অনস্থের সীম প্রতিনিধিব 
মতো ' কেউ খবর রাখে, কেউ বাণে না। 


.-বংশঙতিকার সন্ধানে 


সন্ধ্যার কিছু আগে নীরেন ট্রেন হইতে নামিল। তাহার জান! ছিল না 
এমন একটা ছোট্ট স্টেশন তাদের দেশের । কথনে] সে বাংল! দেশে আসে নাই 
ইতিপূর্বে এক ক'লকাতা ছাড়া । 

নীরেনের দাদামশাই রায় বাহাদুর শ্তামাচরণ গান্গুলী তাহাকে বলিয়া 
দিয়াছিলেন বাংলাদেশের পণীগ্রামে গিরা দে যেন জল না ফুটাইয়া খায় না, 
মশারি ছাড়া শোয় না, নদীর ভলে নাম্নান করিয! তোল! জলে ন্নান করে। 
শীরেনের স্বাস্থ্যটি বেশ চমৎকার, ডাম্বেল মুগ্তর ভাজিয়া শরীরটাকে সে শক্ত 
করিয়া তুলিয়াছে, বড়লোকের দৌহিত্র, অভাব অনটন কাহাকে বলে জানেনা । 
মনে নীরেনের বিপুল উৎসাহ । চোখের স্বপ্র এখনও কাচ, সবুজ। 

একট! লোক প্র্যাটফন্খের প্রান্তে দাডাইযা৷ প্র্যাটফম্মে সাজানে। দূর্বাঘাসের 
ওপর গরু ছাভিয়৷ দিযা গন্কর দডি হাতে দাডাইয় ছিল। নীবেনের আহ্বানে 
সে নিকটে আদিল। ,নারেন বলিল-_বামচন্ত্রপুর কতদূর জানো? 

লোকটা বলিল-_কেন জানবে না? মেউরি রামচন্রপুব তো? এখেন থে 
ঝাডা তিনকোশ পথ-- 

_-তিন কোশ? 

_হাবাবু। কনে ধাবেন সেখেনে? 

_বীড়ুয্যে বাডী। 

__তা যান বাবু এই পথ দিবে-- 

নীরেনের কাছে এ সব একেবারেই নতুন। এই আনন্ন সন্ধ্যার মাঠের 
মধ্যের পথ দিয়া সে যাইবে তিনক্রোশ দূরের গ্রামটিতে । ওই মাঠেব মধ্যে কত 
মাটির ঘরে ভন্তি পাডাগার পাশ কাটাইয়া তাহাকে যাইতে হইবে । মাত্র ছাব্বিশ 
বৎসর বয়ন যার দুনিয়া তার পায়ের তলায়, সে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে স্বর্ণথনির 


বংশলতিকার সন্ধানে ১০৯ 


সন্ধানে বাহির হইতে পারে, সে উত্তরমেরু-অভিযানে একঘণ্টার নোটিশে যোগ 
দিতে পারে, মাত্র একটা ছোট সুটকেসের মধ্যে টুথব্রাশ আর তোয়ালে পুরিয়া । 


চৈত্র মা। স্টেশনেব পেছনে মাঠের ধারে বড় একটা নিম গাছ। ফুটন্ত 
ন্মফুলের তুরতুরে সুবাস বাতাসে । নিমগাছ অবশ্ত তাদের আলিগডেও আছে, 
কিন্তু এমন রহস্তমর়ী অজান! সন্ধ্যা মাঠের প্রান্তে তাহার জীবনে ক'টা! নামিয়াছে ? 

নীরেন জানে, যদিও সে দিলী ও আলিগড়ে মানুষ, একবার কাণপুরে আপিয়। 
ভাবিগ্লাছল প্রায় বাংলাদেশের কাছে আমরা পড়িযাছে বুঝি । পাগ্তাবের অসম 
জলহাওয়াফ তাৰ শরীর গডিয়। উঠিরাছে--হর ভীষণ শীত, নয়তো! দুর্দান্ত গরম-_ 
একশো বত্রশ [ডগ্রা উত্তাপের হাওয়া গা হাত পা! পুডাইয়া বহিতেছে--সেখানে 
গ্রীষ্মের ছুপুরে বাঁসয়া বসিরা বাদশাহী তয়ধানা ও সুন্দরী ইরাণীদের স্বপ্ন লু” 
আগুনে ঝলসাইয়। যার। 

নীবেন মাঠের মাঝথানের পথ বাহির হন্‌ হন্‌ করিয়া হাটিরা চলিল। দুর 
মাঠের প্রান্তে টাদ উঠিতেছে-_নিশ্চয় আজ পুণিমা, নতুবা! সন্ধ্যার পরে টাদ উঠিবে 
কেন? ছুখান! গ্রাম পথে পড়ে-..**শ্রাস্তার ধারে দীভাইয়া গ্রাম) লোকের! 
দেখিতেছে। একজন বলিল-_-কনে যাবা ? 

__বামচন্দ্রপুর | 

-_বাডী কনে? 

_-কলকাতা । 

কলিকাতা বলাই সহজ, কারণ আলিগড় বলিলে ইহারা কিছুই বুবিবে না। 
কিছুদূর গিরা আর একটি ক্ষুদ্র পল্লা-নীরেন্দ্র নাম জিজ্ঞাসা করিল। রাস্তার 
ধারেই একটা পুরনে। কোঠাবাড়ী, গোটা ছুই নারকেলগাছ, ছটি বড় ধানের গোল! 
নারিকেল গাছটির তলায়। জন পাঁচ ছয় লোক গোলার কাছে উঠানে বসিয়া তাষাক 
খাইতে খাইতে কথাবার্তা বলিতেছে-_নীরনকে দেখিয়া বলিল--বাড়ী কোথাধ? 


২১১০ অপাঁধারণ 


-কলকাতায়। 

- ইদিকি কোথায় যাওয়৷ হবে? 

--রামচন্দ্রপুর | 

তাহারা পরম্পর চাওয়াচায়ি করিয়া বলিল--এই রাত্তির সেখানে যাতি 
পারবেন না। 

নীরেন বলিল- কেন? 

স্পতিনকোশ পথ এখান থেকে, তা ছাডা গরম কাল, মাঠের পথ, সাপ 
খোঁপের ভয় । কার বাড়ী যাব! রামচন্দ্রপুর? 

সস্বীড়ুষ্যে বাড়ী । 

_-কোন্‌ বাডুষ্যে-বাডী ? সে গগনে ব্রাহ্মণ তো নেই ? 

--এক বুড়ী আছে না? 

_আছেন বটে এক মা ঠাকরোন। ওই বাওডের ধারে গোলাবাডীতে 
থাকেন। তা তিনি আবার মাঝে মাঝে তার জাহাইযের বাড়ী যান কিনা? 
দেখুন, আছেন কিনা ।* 

সেখানে পৌছাইতে নীরেনের বড্ড রাত হইয়া গেল। গ্রামটিতে চারিধারে 
বাশবন আমবনের নিবিড় ছায়া, প্রথমেই গোগালাদের পাড়া, ভাঞপর বড মাত 
একটা, গোটা দুই বড় পুকুর, খেওলায় ও কচুড়ীপানার ভন্তি। 

পথের ধারে একট! খডের ঘরে তখনও টিম্‌ টিমূ করিয়া আলো হ্বণিতেছিল। 
নীরেনের প্রশ্নের উত্তরে একটি লোক উত্তর দিল, সেই গ্রামই রামচন্ত্রপুব বটে। 
বীডুয্যে-বাড়ীর বুডী? হাঃ আর একটু আগে বাওড়ের ধারে সারি সারি 
নারিকেল গাছওয়ালা বড় আটচাল| খড়ের ঘর । 

নীরেন বাড়ী খুজিরা বাহির করিল। বড় একখান। আটচালা৷ ঘরের পাশে 
ছোট রান্নাঘর, সেখানে আলো জ্বলিতেছিল । 

নীরেন উঠানে দীড়াইয়া ডাকিল--বাড়ীতে কে মাছেন ? 


বংশলতিকার সন্ধানে ১১১ 


একটি বৃদ্ধা টেমি হাতে বাহিরে আিখা বলিলেন-_-কে ডাকে ? 

-আমি। 

--কে বাবা তুমি? 

- আমাকে কি চিনতে পাববেন? আম আপিগড থেকে আসচি। 

বুডী টেমিটা উচু কিয়! তুণিয়া ধাবঘা শীবেনের মুখ দেখিবাব চেষ্টা করিল । 
তাহার মুখে কৌতুহল ও সান্দগ্ধতার বেখা। হাতের ভালু চোখেব উপর আড 
কবিয়৷ ধবিবা আলো হইতে চোখ বাচাইবাপ ভঙ্গি করিশ্া আরও হত এক পা! 
আগাইযা আলিয়া বলিল--কে বাবা? 

--আমার বাবার নাম ৬বাজকৃষঃ মুখুধ্যে-- 

বুডী আপন মনে বিড বিড করিয়া! বলিল-_রাজকেন্ট ? বাজকেষ্ট ? 

--আমাদের পৈত্ক বাডী ছিল গড ঘুকুন্দপুর- আমার ঠাকরদ্াদার নাম 
৬তারিণীচরণ মুখুষ্যে-_-আমাব মাষের বাপের ব'ডি ছিল সামতাবেডে, মায়ের 
নাম ছিল অমিয়বালা-_ 

_-ও 1 এখন বুঝলাম । তুমি আমার ফেয়েব সইঘেব ছেলে ! 

হা পিদিমা। 

এসো এসো ভাই ! কত কাণ্লব কথা সব। তোমাদের মুখ দেখে মরবে! 
এইটুকু বোধ হয় ছিল অদেঙ্ডে। আর সবাই ছেডে গিকেচে বাবা, শুধু আমিই 
পডে আছি! 

--সই-মা কোথাষ ? 

--সে তো আঙকাল এখানে খাকে না। তে থাকে ভাব শ্বখরবাডী, এই 
পাশের গ]। 

স্পআমি তাব সঙ্গেই দেখা করতে এসেডি। 

--আজ রাত্তিরে এখানে থাকো । কাল যেও এখন নকালে। এখান থেকে 
হকোশ। 


৯১৯২ অসাধারণ 


--এই যে বল্লেন পাশের গ1? 

-্মধ্যে মাদারহাটির মাঠ আর জল! পড়ে যে ভাই। ছু”কোশের বেশি ছাড়া 
কম হবে না। 

নীরেন হাত পা ধুইয়া ঠাণ্ডা হইয়া বসিল। এ যেন নতুন একটা জগতে সে 
আমসির1 পড়িয়াছে। এমন দেশে সে কখনো আসে নাই। যে দেশে তাহার 
জন্ম, সে দেশে এত বনহঙ্গল কেহ কল্পনা করিতে পারে না গ্রামের মধ্যে। নতুন 
ধরণের গাছপালা, অসংখ্য পাখীর কলকাকলী, বনফুলের মু সৌরভ। বুড়ীর 
রান্না শেষ হইতে রাত দশটা বাজিল। কেবল সেশাদা সোদা মাটির গন্ধ বাহির- 
হওয়া লেপাপ্পোছা। মাটির ঘরের দাঁওয়ায় কলার পাত! পাতিয়া বুডী তাহাকে 
খাইতে দিল। রাঙা আউশ চালের ভাত, পেঁপের ডালন* সোনা মুগের ডাল, 
উচ্ছে ভাজা, আলভাতে, ঘন আওটানো সরপড়া ঢুধ, ছুটি পাক কলা» একদল! 
আখের গুড়ের পাটালি। অদ্ভুত রাম্ন' বুডীর হাতের । আলিগড়ের পশ্চিম 
পাচকের হাতের রান্না খাইয়া সে আজীবন অভ্যস্ত এমন চমৎকার রান্নার সঙ্গে 
পরিচয় ছিল না! “ 

উচ্ছুসিত প্রশংসার স্থবে বলিল-_এমন রাম্না কখনো খাইনি দিদিমা! শুনতাম 
বটে বাংলা দেশের পাড়ার্গায়ের রান্নার কথ-কিস্তু এ যে এমন চমৎকার তা 
ভাবিনি-_ 

বুডী হাসির বলিল- রান্না করতে পাকতেন আমার শাশুডী। তার কাছেই 
সব শেখা । ডাকসাইটে রাধুনি ছিলেন আটখান। গায়ের মধ্যি-_ 

বুড়ীর কথার মধ্যে যশোর জেলার টান নীরেনের বড ভাল লাগিল । 

শুইয়া শুইয়া] উঠানের নারিকেল বৃক্ষত্ণর পাতার কম্পন দেখিতে দেখিতে 
নীরেন ভাবিঙেছিল, এই তাহার স্বদেশ, তাহার অতি প্রির স্বদেশ। এই তাহ।র 
মায়ের জন্মভূমি, পিতার জন্মভূমি, পূর্বপুরুষদের জন্মভূমি--বাংল! দেশ। কেন 
এতকাল সে মাতৃভামকে ভুলিয়া ছিল? ভাগ্যের দোষ। সেকি জানিত এত 


৮০ 
বংশলতিকার সন্ধানে ১১৩ 

সৌন্দর্য্য বাংলাদেশের রাত্রির অন্ধকরে? গন্ধভরা অন্ধকারে? পাখীর ডাকের 
মধুর তান সে হিমালয়ে শুনিয়ছে। আলমোডায় ল্যান্সডাউনে শুনিয়াছে। 
তাহার ধনী মাতামহের সঙ্গে কয়েকবার সে সব স্থানে সে গিয়াছিল। দেবতাত্ম! 
নগাধিরাজ মাথায় থাকুন-_মাখাষ থাকুক “ক্যামেলস্‌ ব্যাক*-এর অপূর্ব দৃশ্ঠ, 
মুসৌরীর অতুলনীয় গিরিশোভা-_এখানকার পক্ষীকুলের স্থমিষ্ট কাকলী যেন 
বহুপগিচিত বিগত দিনের প্রিয়জনের বার্তা বহন করিয়া আনে, কত দিনের 
ঘরোয়! কাহিনী এদের সঙ্গে জড়ানো । 

বুড়ী বলিল-_ঘুম হচ্চে না ভাল গরমে বুঝি? পাখা নেবা৷ একখানা? 

_না দিদিমা । নতুন জায়গা বলে ঘুম আসচে না, গরমে নয় । 

- এবার ঘুমিয়ে পড়ো ভাই-_ 

--হ1 দিদিমা? 

--কি ভাই? 

--আমার বাবাকে আপনি দেখেছিলেন ? 

--না ভাই, আমার কোথাও যাতায়াত ছিল না। শুনিচি তার কথা, দেখিনি 
কখনো-__তোমাদের গ। ছিল তো-_ 

-_গড় মূকুন্দপুর। 

-_নাম শুনিচি, তবে যাইনি সেখানে । 

সকালে উঠিয় বুড়ী বণ্িল__হ্যা ভাই, তোমর] সহরের লোক, সকালে কি খাও? 

নীরেন হাসিয়া বলিল-_য| খাই, তা কি দিতে পারবেন দিদিমা! ? চা? 

বুড়ী বলিল--ও আমার পোড়া কপাল। ও সব যে কখনো খাইনি ভাই, 
ও সবের পাটও নেই। একটু বেলের সরব করে দি। ডোবার ধারের 
বেলগাছটায় কাল ছুটো৷ পাক বেল পেইছিলাম ভাই। 

চায়ের বদলে বেলের সরবৎ। উপায় কি? খাইতেই হইল তাহাকে । 
বুড়ী বলিল--তুমি কি মনে ক'রে এসেছিলে ভাই ? 


৮ 


১১৪ অসাধারণ 


সেই কথাটা বলাই নীরেনের পক্ষে শক্ত। সে যে জন্য আসিয়াছে প্রিয় 
পৈতৃক পল্লী গ্রামটিতে, বৃদ্ধা কি সে কথা বুঝিতে পারিবে? সে বলিল-_বেড়াতে 
এলাম দিদ্রিম!। 

--এর আগে কখনে। আসনি? 

--না দিদিম1। 

দুপুরের আগেই তাহার যাওয়ার ইচ্ছা ছিল এখান হইতে, কিন্তু বুড়ী ছাড়িল 
না। দুপুরের পরে রোদ অত্যন্ত চড়িল। ৰেল! চারটার আগে বাহির হওয়া 
সম্ভব হইল ন1। যাবার সময় বুটী তাহার মাথায় হাত দিয়া আশর্ব্বাদ করিল-_ 
এসো, এসো, ভাই, তোমার সইমার সঙ্গে দেখাশুনো করে আবার এখানে আসবে 
কিস্ত। ভুলে যেও না ভাই। আচ্ছা তাই। 

আধ ঘণ্টার মধ্যে নীরেন আসিয়া মাদারহাঁটির মাঠ ও জলার মধ্যে পডিল। 
প্রকাণ্ড বিল, পদ্মফুল ফুটিয়া থৈ থৈ করিতেছে, পন্মের পাতার ভিড়ে জল দেখা 
যায় না, একদিকে একটি অস্তরীপ মতন স্থানে অনেকগুলি বড বড় গাছ-- 
মীরেনেরইচ্ছা হইল ওই গাছগুলির তলায় সে কিছুক্ষণ বসিয়া বিশ্রাম করে। 
এই সুন্দর জলাভূমি যেন কাশ্মীরের ডাল বা উলার হদদের মত শোভাময়, কিন্ত 
এসব স্থানে টুরিস্ট ব্যবসায়ীদের ঢাক পিটানোর শব্দ নাই, স্ৃতরাং এমন হুন্দর 
একটি সৌন্দর্ধ্যময় স্থানে কখনো কেহ আসেনা । 

সইমাদের গ্র।মটিতে জঙ্গল তত নাই- ব্রাক্গণপাড়ায় অনেকগুলি কোঠাবাঁড়ী, 
প্রায়ই সব চাষী গৃহস্থ, বড বড় গোলা উঠানে, গোয়/লবাড়ী ভন্তি গরু । একজনের 
উঠানে দোতল! বাড়ী তৈয়ারি হইতেছে, উঠানের বাতাঁবী লেবু গাছের তলায় 
মজুরের! দুমদাম শবে স্থবকি ভাঙিতেছে। নীরেন সেখানে ফ্লাডাইয়া জিজ্ঞাসা 
করিল---চক্ত্তিদের বাড়ী যাব কোন্‌ দিকে ? 

একজন বলিল--কোন্‌ চক্ত্তি? অনেক চক্ত্তি আছে এ গায়ে। 

৮৬ভূবনমোহন চক্ত্তি-_ 


বংশলতিকার সন্ধানে ১১৫ 


--সে ও পাড়ায়। ওই তেঁতুল গাছের পাশের রাস্ত! দিয়ে যান__- 

আধঘণ্ট| পরে সে সইমাকে প্রণাম করিয়া তাহার প্রদত্ত পিঁড়তে বসিয়! 
কথাবার্তী বলিতেছিল। নীরেন দেখিল তাহার সইমার বয়স খুব বেশি নয়, 
মাথার চুল এখনও একগাছি পাকে নাই, রং বেশ ফস, দোহারা চেহারা, এক 
সময়ে যে ইনি সুন্দরী ছিলেন, এখনও দেখিলে বোঝ| যাঁয়। 

সইমা গোখের জল ফেলিলেন। অনেক আশীর্বাদ করিলেন। পাকা বেলের 
সরবত, মুগের ডাল ভিজানো ও আখের গুড় খাইতে দিলেন। সইমাকে পাই! 
নীরেন যেন হারানো মায়ের সান্নিধ্য বহুদিন পরে অনুভব করিল। সে সইমাকে 
কখনে! দেখে নাই এর আগে। সইমা কিন্তু তাহাকে দেখিয়াছিলেন সে যখন 
ছুই বৎসরের খোকা, তখন। প্রো! মহিলার বহু পুরানো দিনের শোকম্থৃতি 
উথলাইয়া উঠিল আজ তাহাকে পাইযা। এমন কত লোকের নাম করিতে 
লাগিলেন যাহাদ্দের কথ! মায়ের মুখে আলিগড়ে নীরেন শুনিত বাল্যকালে_-কত 
বাল্যম্থৃতিজাগানো৷ নামাবলী। দেশেব ঘবের সব লোকের নাম । বাঁচিয়া আছে 
কেউ কেউ এখনও-_তবে বেশির ভাগই মাবা গিয়াছে। 

সইমা বলিলেন-_ তোর মুখে সইয়ের মুখ যেন মাখানো রয়েচে -- 

নীরেন হাসিয়া চুপ করিয়া রহিল। 

--সই বড সুন্দরী ছিল। গ্র'মের কাজকম্মে যখন সেজেগুজে নেমতনন খেতে 
কি বিয়ে থাওযায় জল সইতে যেতো! তখন লোকে ছু দণ্ড চেয়ে দেখতো । এদানি 
রোগে শোকে আর কিছু ছিলনা চেহারার। এখান থেকে চলে যাওয়ার পরে 
আর কখনো দেখা হয় নি সইয়ের সঙ্গে । সে কতদিন হবে রে নীরু ? 

নীরেন মনে মনে হিসাব করিয়া বলিল-_তা' প্রায় তেইশ চব্বিশ বছর হোল । 

--সই মারা গিয়েচে কতদিন ? 

--বেশি দিন না» বল্লাম যে পছর পাচেক হবে। 

--তাহোলে সই বেঁচে থাকলে এই পর়তালিশ বছর বয়েস হোত-- 


১১৬ অসাধারণ 


-_তা হবে, আমারও হোল ছাবিবশ। আপনার ছেলেও তে]? আমার বয়সী 
হবে, না সইমা ? 

সইম৷ ত্বাচলে চোখ মুছিয়া বলিলেন-কোথান ছেলে বাবা? সে ধাকি 
দিয়ে চলে গিষেচে অনেক কাল। 

রাত্রে নীরেন খাইতে বসিয়াছে, সইমা সামনে বনিবা খাওয়ার তদারক 
করিতেছেন | 

নীরেন বলিল__-আপনার আর দিদিমার রান্না সমান। এমন রান্না অনেকিন 
খাইনি। 


সইমা বপিলেন-_তো'র মাও ভাল রাধতো রে--যখন কপাল পুডলো, এ দেশ 
থেকে সেই পশ্চিমে চলে গেল, তখন সে কি কানন! বলে__সই, আরকি তোব 
সঙ্গে দেখা হবে? এই যাওদাই আমার শেষ বাওযা । সে ভাগ্যিমানী স্বগগে 
চলে গেল, আমিই রইলাম পড়ে । 


নীরেন হাসিয়া বলিল-আপনি না থাকলে আজ কার মুখ চেয়ে এখানে 
আসতাম বলুন সইমা? সইমা ছুধের বাটি নীরেনের সামনে .রাখিযা পাখার 
বাতাস দিযা দুধ জুডাইতে জুডাইতে বলিলেন- তোকে যত্ব করবার দিন যখন 
আমার ছিল, তখন এলিনে। এখন কি আছে সইমার, কি দিয়েই বা তোকে 
যত্ব করবে।? হ্য।রে এতদিন পরে কি মনে কবে এলি ঠিক বল্‌ তো? 

- বলি সইমা, আপনি বুঝতে পারবেন। জানেন, আমি ছুবছর বয়সে বাংল! 
দেশ ছেড়ে গিয়েছিলাম ? 


-_-নে তো খুব জানি। 

আর কখনে। এদেশে আসিনি এর মধ্যে? 

--তাও জানি। 

- এতকাল পরে মায়ের ও বাবার বাক্সের কতগুলো! পুরনো চিঠি পড়লাম 


বংশলতিকার সন্ধানে ১১৭ 


সেছিন। পড়ে মনটা বড় ব্যাকুল হল জন্মভূমি দেখবার জন্তে। সে সব চিঠিতে 
আপনার নাম আছে, আমার এক পিসিমার নাম আছে । আমি বাঝকে কখনে। 
দেখিনি, তার সম্বন্ধে, আমার ঠাকুরদার সন্বন্ধে--আরও অনেক নাম আছে বাবার 
এক পুবানে! খাতার মধ্যে--সকলের সম্বন্ধে আমাব জানবার খড় ইচ্ছে হোল। 
আমি জ্ঞান হয়ে পধ্যন্ত মামার বাড়ীর সকলকে দেখে আসচি, বাপের বাড়ীর বা 
নিজের বংশের কিছু খবর রাখি নে। সেই সব খুঁজে পেতে বার করবো বলেই 
এলাম। 

--ওম। আমার কি হবে! কোথাকার পাগল ছেলে গাখো-- 

_ _ন। সই মা, আপনি ভেবে দেখুন আমার মনের অবস্থা । আমার ছাব্বিশ 
বছর বধ হ্য়েচে কিন্ত এ পর্যন্ত আমাদের বংশের কোনো খবর রাখি নে। 
বাপেব বাডীর কোন লোকের কথা জানি নে। অথচ আমার ভয়ানক ইচ্ছে 
জানবার। আপনি হয়তো ভাববেন এ আবার কি, আমাব কিন্তু সইমা ঘুম হয 
না৷ এই সব ভেবে--সত্যি বলচি_-নাপনি আমার বলে দিন কি ভাবে আমি তা 
করতে পারি-আমি তে! কাউকে চিনি নে__ঝাংলাফেশের ছেলে, কিন্তু কোনো 
খবর রাখি নে দেশের । 


_ সব বলে দেবো, এখন খেয়ে শুষে পড়ো দিকি দুষ্ট ছেলে আমাব! 

নীরেন হাসিল। অনেকদিন পবে যেন হারানে! মাকে ফিরিয়া পাইয়াছে, 
সেই ধরনের হাসি সইমাব মুখে । ভাগ্যিস নে আসিযাছিল। শ্যামল বাংল] ম! 
যেন সইমার মুর্ভিতে তাহাঁকে সন্গেহ অভ্যর্থনা জানাইতেছেন । 


ত্র মাসের বাত্রি। হু হুদক্ষিণ হাওয়া খোল! জানালা দিয়া বহিতেছে। 
কি একট! ফুলের তীব্র সুবাস বাতাসে । নীরেন বাংলাদেশের অনেক কিছু 
গাছপালা চিনে না-_কিন্ত তাহার কি ভাল লাগে এই সব পলীগ্রামের আগাছা 
জঙ্গল! আজ ছুদিন তিন দিন মাত্র ইহাদের সহিত পরিচয়--তবুও যেন মনে হয় 


১১৮ অসাধারণ 


কত দিনের নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় তাহার শিরা-উপশিরার রক্তের সহিত আবদ্ধ 
ইহাঙ্জধর প্রাণম্পন্দন । এই সব বনস্পতির সহিত সেও একদিন এই তাহার প্রিয় 
জন্মভূমির মাটিতে জন্মিয়াছে। 

সে একখানা খাত আনিয়াছে সঙ্গে । 

খাতাখানা তাহার পিতামহ ৬গদাধর মুখোপাধ্যাযের স্বহস্ত-লিখিত। 
তাহাদের গ্রামের কত প্রাচী নদিগের তুচ্ছ গ্রাম্য ঘটনা ইহাতে কেন যে তাহাব 
পিতামহ টুকিয়া রাখিয়াছিলেন, তিনিই বলিতে পারিতেন। ক্ষুদ্র এক অধ্যাত 
পলীগ্রামের প্রাচীন ইতিহাসে কার কি ফল? অমন কত গ্রামঃ কত অগ্তন্তি 
গ্রাম বাংলা দেশে। কে জানিতে চাহিতেছে তাহাদের ইতিহাস? গরজই ঝ 
কাহার? 

আজ রাত্রে আলোর সামনে বসিয়! খাতাখান1! সে খুলিষ। দেখিল। সইমা 
তাহার বিছান! নির্দেশ করিয়! দিয় চলিয়া গিযাছেন। ঘরে সে একা। মাটির 
ঘর। ছোট জানালা, কাঠের গরাদে। জানালা বাহিরে একটা কি গাছে 
থোক1 থোক1 গাদা গাদা ফুল ঝুলিতেছে-কতক ফাটিয়া তাহাদের ভিতরকার 
রাঙা রাঙা বীচি বাহির হইয়াছে-__দিনমানে নীরেন লক্ষ্য করিয়াছিল। 

খাতার পাতায় লেখা আছে-_ 

«২২শে চৈত্র। ১২৭২ সাল******” 

এইটুকু পড়িয়াই নীবেন অবাক হইয়া যাঁয়। কত কালের কথা! ১২৭২ 
সালেও পৃথিবী এমনি সুন্দর ছিল, এমনি বসন্ত নামিত এ পাড়াগয়ের বনবুকে, 
এমনি কোকিল ডাকিত রাত্রি দিনে? সে তখন ছিল কোথায়? কোন্‌ অতীত 
দিনের কাহিনী এ সব? 

মনে পড়ে আলিগড়ে তাদের দোতলার পড়ার ঘরে বসিয়৷ এই ডায়েরির 
পুরাতন তারিখগুলো সে পড়িয়৷ বিশ্মিত হইত-_কিন্ত তাহার চেয়েও অনেক 
বেশি বিন্ময় ও রহশ্ডের অনুভূতি আজ তাহার মনে। 


বংশলতিকার সন্ধানে ১১৯ 


তারপর লেখ! আছে, 'আজ রাঁমলোচন রায়ের প্রথম পক্ষের স্ত্রী উহাদের 
আমবাগানে হারাধন মুস্তফির সহিত ধর] পড়িলেন। ইহা লইয়া আজ জ্যাঠা- 
মশায়দের চণ্তীমগ্ুপে সারাদিন ভ'মাডোল চলিতেছে । রামলোচনের স্ত্রী 
বলিধাছেন তিনি নিদ্দষি। আমেব গুটি ঝড়ে পড়িতেছে, তাহাই কুড়াইতে 
গিয়াছিলেন, হারাধন মুস্তফির কথা কিছু জানেন না। আজ রামলোচন রায়ের 
স্ত্রীকে দেখিয়াছি । বয়স হইলেও চাহিয়া থাকিতে ইচ্ছা কবে। খুব সুন্দরী । 
বুমোরের বৌ ইহার কাছে দীডাইতে পারে না| 

নীরেন এই ভায়েরিটুকু পড়িয়া কতবার মনে মনে হাসিয়াছে। 

পিতামহ গদাধর মুখুয্যে ব্ুকাল সাধনোচিত ধামেই সম্ভবত প্রস্থান 
করিয়াছেন, নীরেনের মায়ের বিবাহ তখনও হয় নাই। সে পিতামহের কার্য্যের 
সমালোচনা করিতেছে না, তবুও মনে হয় এই বুস্তকাব বধূৃষ্টর এইখানে উল্লেখ 
থাকার কারণ কি? বিশেষ করিয়া ঠাকুরদাদা ইহারই নাম করিলেন কেন? 
গ্রামের সথন্দগীশ্রেষ্ঠা বলিয়া ? না 

হা রে সে ১২৭২ সাল! আজ রামলোচন রায়ের নিরপরাধ] *নুন্দরী পত্বী 
ধিনি নির্জন দুপুরে বাগানে আমের গুটি কুড়াইতে গিয়! হারাধন মুস্তফির সঙ্গে 
নিজের নাম যোগ করিবার সুযোগ দিয়! মিথ্য! কলঙ্ক কুড়াইয়াছিলেন একদিন 
প্রায় আশি বৎসর পূর্বের এক সুমধুব কোকিলমুখবিত, পুষ্পন্থবাসামোদিত, 
প্রেমোচ্ছল বসন্তপিনে_ কোথায় তিনি আর কোথায় তাহার রূপের প্রততিদবন্দী 
সোন! বুস্তকারের রূপপী বধূ? আজ এই সব পলীগ্রামের মাটিতে তাহাদের 
নাম নিশ্চিহ্ন হইয়া মুছিয়াই যাইত যদি না তাহার পরোপকারী পিতামহ গদাধর 
দুখুষ্যে এত ঘটা করিয়] উক্ত বধূঘয়ের ইতিহাস তাহার ডায়েরিতে নিঃস্বার্থ ভাবে 
ন] লিখিরা রাখিতেন ! 

” হাপি পাইবার কথাই তো। 
নীরেন ডায়েরি বন্ধ করিয়া শুইয়া পড়িল, কিন্ত আজ রাত্রে তাহার বংশের 


১২০ অসাধারণ 


পূর্বপুরুষেরা যেন ভিড় করিয়া আশেপাশে তাহাদের অদৃশ্য অস্তিত্ব জ্ঞাপন 
করিতেছেন। তাহাদের ইতিহাস ভাল করিয়া জানিবার জন্তই তো সে এত 
কষ্ট ত্বাকার করিয়া বাংলাদেশে তাহার জন্মভূমি অঞ্চলে আসিয়াছে এত কাল 
পরে। তাহার! ঘুমাইতে দিবেন না। 

সকালে সইমা ডাঁকিরা ঘুম ভাঙাইলেন-_-ও নীরু, ওঠ বাঁবা, বেলা 
ঝঁ ঝা? করচে-- 

নীরেন ধড়মড় করিয়া বিছানার উপর উঠিয়া বসিল। 

সইমা বলিলেন_-তোর আবার চা খাওয়ার অভ্যেস আছে, না? 

--ছিল তো! সইমা। 

- এখানে কি করি উপায় তাঁই ভাবচি-_- 

ভাবতে হবে না। এখানে না হোলেও চলবে । 

--তা কি হয় বাবা? দেখি। যার যা অন্যেস-- 

স-ন] সইমা, কিছু চেষ্টা করতে হবে না। তা হলে আমি দুঃখিত হবো। 

সইম! কিছু না বলিয়া চলিয়া! গেলেন। কিস্তু আধ ঘণ্টা পরে এক পেয়ালা! 
ধূ্মায়িত চা আনিয়া তাহার সামনে রাখিলেন এবং একটা বাটিতে একবাটি মুড়ি। 
রায়বাড়ী হইতে:চা চাহিয়া আনিয়াছেন, সেখানে বাডীন্ুদ্ধ সবাই চা খায়। 

নীরেন চা পাইয়া মনে মনে খুশি হইল। মুখে বলিল--কেন বলুন তো এ 
সব-_-পরের বাড়ী থেকে আনতে যাওয়া? 

সইমা বলিলেন-- তোর ম] থাকলে করতো ন1? 

_--তাকিজানি। 

- করতে! রে করতে1। শুনবি তোর মায়ের কথা? 

»-কি, বলুন । 

--তোর মা বড্ড শাস্ত ছিল। 

-_ মাকে আমি দেখেচি, শাস্ত ছিলেন সবাই বল্‌্তো। 


বংশলতিকার সন্ধানে ১২১ 


--একবার সই আর আমি নাইতে গিয়েছি ঘাটে । জীতার দিরে ছুই সঙ্ই 
মিলে নদীর মাঝখানে গিয়েচি । এমন সময় ঘাট থেকে কে চেঁচিয়ে বল্লে নদীতে 
কুমীর এসেচে। আমরা তো! তাডাঠাডি ঘাটের দিকে এগুচ্ছি, এমন সমর 
সইকে আমি ভয়ে জড়িয়ে ধরলাম । সই যত বলে ছাড়ো ছাড়ো ছুজনেই ডুবে 
যাবো, আমি ততই ভয়ে সইকে জড়াই। 

নীরেন রুদ্ধ নিশ্বাসে বলিল-_তারপর ? 

তারপর আর কি? ছু জনেই বেঁচে উঠলাম, একখানা নৌকো আমাদের 
ওই অবস্থায় দেখতে পেয়ে ছুটে এল। 

--তখন আপনারা একগ্রামেই থাকতেন ? 

_ইাবে, নইলে আর সই বলবো কি করে। পাগল ছেলে আর কি! 
কথাট। নীরেন সন্ধ্যাবেল! তাহাব খাতার লিখিয়। রাখে । 

গ্রাম্য জীবনের কোন কথা সে বাদ দিতে চায় না। মরুপর্ধত ভেদ কবিয়া 
সুদূর পাঞ্জাব হইতে ছুটয়! আসা (কোন কটাক্ষ কেহ করিবেন না) তবে 
কিসের জন্য ? 

সইমার শ্বশুরবাডী এটা । কিন্তু একটি দেওরপো ছাড। এখানকার বাডীতে 
কেহ থাকে না। ছুটি দেওর বাহিরে চাকুরী করে, মেখানেই পরিবার লইয়া 
থাকে ; যে দেওরপো। এখানে "মাছে ওটি পিতৃমাতৃহীন অনাথ । জ্যাঠাইমার কাছে 
মানুষ হইতেছে। জ্যাঠাইমা ভালও বাস্নে। 

দেওরপোর নাম কানু । কান্থ নীরেনকে খুব ভাল চোখে দেখে নাই! 
এই দুর্মুল্যের বাজারে ইনি আবার কোথা হইতে উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া 
বসিলেন! কেন রে বাবা। যে তিন বিশ ধান হইয়াছিল, ইনি এখানে 
আসিলেন,__তাহাতে ক'দিন যাষ? জ্যাঠাইমাও দেখিতেছি নীরু বলিতে 
অজ্ঞান । 

কানু আসিয়া বলিল--যাত্র! দেখতে যাবেন ? 


১২৭ অসাধারণ 


--কি যাত্রা! ? 

-এই দিগি_ গোনাই যাত্রা ? 

-সেআবার কি? 

- দেখবেন এখন | দিন দ্িখি একট] টাকা চাদ । নীরু একটা টাকা 
বাহির করিয়া কানুর হাতে দিল। 

গোনাই যাত্রার আসরে বসিয়া নীরেন যাত্রা তত দেখে নাই, যত সে এই 
সুন্দর রািটি ও যাত্রার আসরের পরিবেশের কথা চিন্ত। করিয়াছে । যেখানে 
যাত্রার আসর, সেটা ছোট একট! মাঠ, তার চারিপাশে বনজর্গল, একদিকে 
বনের প্রান্তে একটা কামারের দেকান, €পখানে এখনও হাপরে আগুন 
জলিতেছে। বাশের খু'টিতে পাল টাঙানো হইয়াছে । পান বিডির দোকান 
বসিয়াছে, চাষা লোকে যাত্রা দেখিতে আসিয়া! পানের দোকানের সামনে ভিড় 
করিতেছে। একটা মূচুকুন্দ টাপার গাছতলায় ফুল পড়িয়া বিছাইয়া আছে। 
বাতাসে মুচুকুন্দ টাপার সুবাস | 

একটি গ্রাম্য মেরে ছিল গোনাই বিবি। তাঁরই সখ ছুঃখের কাহিনী । 
নীরেনের পক্ষে এমন বিশেষ কিছু নর, কিন্তু যারা শ্রোতার দল, তাদের সারারাত্রি 
জাগিয়৷ দেখিবার বস্ত। ভ্রাত্তার বিরহে কাতরা তরুণী গোনাই বিবির সে করুণ 
গান, “ও বছির, বছির রে, ঠা হাতে নিলি রে” অনেকের চোখে জল 
আনিয়৷ দিল। 

নীরেন ভাবিতেছিল বহুদুরের লিপুলেক গিরিবর্মে বরফ গলিয়াছে। দলে 
দলে ঝববর পিঠে বোঝাই দিয়! যাত্রীরা চলিয়াছে মানস সরোবর ও কৈলাসের 
পথে। গুরেলা মান্ধাতার তুষারাবুত শৃঙ্গ সায়াহুদিনের স্র্ধ্যকিরণে সোনার 
রং ধরিয়াছে। তাহার দাদামহাশয়ের বন্ধু করালীচরণ মজুমদার সন্ত্রীক এই 
মাসের শেষে মানস সরোবরে রওনা হইবেন, সঙ্গে বাইবেন নীরেনের দিকিমা ও 
বড় মামীমা, বাড়ীর গোমস্তা নাছ চক্তত্তি। আলিগড় হইতে আলমোড়া। 


বংশলতিকার সন্ধানে ১২৩ 


আলমোডা হইতে ধারচুল1। ধারচুল! হইতে লিপুলেক পাস। লিপুলেক 
হইতে মানস সরোবব। সে নিশ্চয় যাইত ওখানে থাকিলে । 

কিন্তু সেজন্য তার দুঃখ নাই। 

বাংলাদেশে সে আসিয়াছে মাতৃভূমির সঙ্গে নিবিড পরিচযের সন্ধানে । 
গাছপালা পাখীর কাকলীর মধ্যে দিয় সে পরিচয দিনে দিনে ঘনিষ্ঠ হইয়া 
উঠিতেছে। এ মুচুকুন্দ টাপার ফুল থেন কতকাল পূর্বের কোন বিশ্বত অতীত 
শৈশবদিনে তাহার অজ্ঞাতসারে একদা দৌবভ বিতবণ করিয়াছিল--মাবেষ 
মুখেব সঙ্গে সে দিনটির ছন্দ একই তারে গাঁথা হইয়া আছে তার মনের বীণায়। 

পরদিন গ্রাম্য নদীব ধারে একটা বড নিমগাছেব তলায় সে দীাডাইরা। 


পচ নাজ হাহা 


/কমপিটিশন 


শিবশঙ্কর সকালে উঠেই ছুশ্দফা ফোন করলেন । একবার আযাটগি রায় ও 
মিত্রের জীবনধন রায়কে ও আর একবার প্রসন্নদাস বড়ালের অংশ্রীদার ও কর্তা 
হরিদাস বড়ালকে ; কারণ ওদের আপিল এখনো খোলেনি। 

- নমস্কার, কি খবর? 

-আন্থন একবার। কতদূর করলেন ? 

আসবো এখন ? 

_ এখানেই চা খাবেন। 

একটু পরে বাড়ীর বাইরে মোটরের শব্দ শোনা গেল এবং জীবনধন রায় ঘরে 
ঢুকলেন । জীবনধন রায়ের পরনে সাহেবি পোশাক, চোখে স্টীলের ফ্রেমের 
চশমা, পায়ে পেটেন্ট চামড়ার চকচকে বুট, বগলে ফোপিও ব্যাগ ৷ 

-আম্থন, মিঃ রায়, বন্ুন। নমস্কার । 

-সনমন্ধার। 

--ওরে, চা নিয়ে আর । তারপর ? 

»-তৈরি। সরেজমিন তদারক করবেন না? 

- রেডেস্ত্রী আপিস সার্চের রেজাণ্ট কি? 

_ভালো। দাগী মাল নয়, তবে দেড়-_দেড়ের কমে হবে না। আমাদের 
তিন পাসেন্ট। 

শিবশঙ্কর বাবু হরিশ মুখুব্যের স্রাটে তিনতলা বড় বাড়ী কিনচেন এদের 
ফালালিতে। দেড় লক্ষ টাক] দাম, আটনিরা তিন পাসেণ্ট কমিশন নেবেন 
--আসল কথা হচ্ছে এই । বূপোর ট্রে ভরে টোস্ট, ডিম সেদা, আলু সেন্দ ও 
লেটুস সেদ্দ এল, তার সঙ্গে চায়ের লিকার, ছুধ আলাদা, চিনি। 

শিবশঙ্কর বাবু বলেন মিষ্টি দিইনি-__কাঁরণ আমাদের এ বয়সে-_- 


কমপির্টিশন ১২৫ 


_নানা। থাক। তারপর আমার গাড়ী রেডি, চলুন একবার সরেজমিনে । 
জিনিসটা দেখুন । 
--বেড রুম কতগুলো? 


-উনিশটা রুম সবস্থদ্ধ ওপরে নিচে। ছ'টা বাথকম, এ বাদে বাইবে 
তিনটে আলাদা পাইথানা। খুব ভালে বাড়ী। কুগু কোম্পানীকে রাজি 
করতে বেগ পেতে হয়েছে খুব। বুড়ো একেবারে বেঁকে বসেছিল শেষকালে। 

--এখন যেতে পারবে। না_-মাপ করুন। এখন বেল! দশট। পধ্যন্ত মরবার 
ফুর্দৎ নেই--এক্ষুনি আবার লোক আসবে-_ 

--আচ্ছা উঠি তাহলে । ওবেলা আপিসে ফোন করবেন এখন-_-ওখান 
থেকে যাওয়া যাবে। 

একটু পরে হগ্দাস বড়ালকে আবার ফোন করা হোল। 

_নমঙ্কার, কি খবর? হ্যা, একবার করেছিলাম- হ্যা-_এই আধ ঘণ্টা 
আগে। হ্যা। সোনাটার কি হোল? বারের দাম কত বলেন? তিন 
আনা? আমার চাই কিছু--ইযা-হ]াঁ-হ্যা--আচ্ছা। আজ ?.*হ্যাঁ 
আচ্ছা। আপিসে? আচ্ছা । 

সাধারণ লোকে এ কথাবার্তা থেকে বিশেষ কিছু বুঝবে না, কিন্তু প্রায় পঞ্চাশ 
হাজার টাকার ওপর "বড়াল বার' নামক বিখ্যাত স্বর্ণের বাট কিনবার 
পাকাপাকি ব্যবস্থা হয়ে গেল। 

ক্রয়-ধিক্ররের পালা শেষ হোতেই শিবশঙ্করের অফিস ম্যানেজার ও 
তদারককার মিঃ ঘোষাল ঢুকে শিবশঙ্করকে খাণিকটা নিচু হয়ে নমস্কার জানিয়ে 
একটা চেয়ারে বসলেন | ছুজনের মধ্যে যে কথাবার্ত স্থরু হোল তা স্কোয়ার ফুট 
রেট, পার্সেন্ট, ইম্পাতের জালতি* সিমেণ্ট, এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম, গ্যারিসন্‌ 
এনজিনিয়ার গ্রভৃতি শব্দে পরিপুর্ণ ও কণ্টকিত। আজই মিঃ ঘোষালকে 
আপিনের কাজে তেজপুর যেতে হচ্ছে, ফোনে এখুনি আসাম মেলে বার্থ রিজার্ভ 


১২৬ অসাধারণ 


সম্বন্ধে শেয়াল?” স্টেশনের কর্মচারীর সঙ্গে আলাপ হোলো । অন্ত অন্য কথার 
পরে বেল! নষ্টার সময়ে মি: ঘোষাল বল্পেন__তা হোলে আমি উঠি-_- 

-কত টাকার দরকার ? 

--সতেরো হাজার তো ওদের পেমেণ্ট করতে হবে, আর পুজোর ব্যবস্থা 
--তাও তিন হাজার নেবে স্থুপারিণ্টেণ্ডেে, হাজার খানেক দিতে হবে 
উপদেবতাদের | মিসেস বশ্মণকে একটা প্রেজেণ্ট দিতে হবে ভাল দেখে । কি 
দেওয়া যায়, স্তার, আপনিই বলুন। 

--একটা জড়োয়ার কিছু দাও গিয়ে--হাজার খানেকের মধ্যে। বিশ 
হাজারের একট! চেক নিয়ে যাও-_ 

--আজ্জে ্তার, ব্যাঙ্কে টাক ভাঙানোর আমার স্থবিধে হবে না। একটায় 
আসাম মেল। তার আগে আমার অনেক কাজ। একবার আপিসে যেতে 
হবে। ডুয়ারের মধ্যে কাগজপত্র রয়েছে, নিয়ে যেতে হবে । গহনাই বা কিনবো 
কখন? 

_ আচ্ছা, গহনার জন্যে আমি স্থুরেশকে পাঠিয়ে দিচ্ছি বত্রিদাসের বাড়ী। 
যদি কিছু ভালো থাকে ,.দেখে আন্ক। সেজন্তে তোমায় ভাবতে হবে না। 
তুমি এখান থেকে বাড়ী যাও-_নেয়ে খেয়ে গাড়ী নিয়ে ব্যান্কে গিয়ে আগে চেক্‌ 
ভাঙাও। ওথান থেকে ই্টিশানে চলে যাও-_গহন! যদি পাই স্ত্ুরেশকে দিয়ে 
ট্রেনে পাঠাবো | মিসেস বশ্মণকে খুশি রাখা চাই মোটের ওপর। দেবতাকে 
তুষ্ট রাখতে হোলে দেবীর পুজে। না দিলে হয় না। কমপিটিশনের বাজার, বুঝে 
কাজ করবে। 

ডাক এল। এক গাদা চিঠি। হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি একবার দেখে 
নিতে নিতে শিরশঙ্কর ডেকে বল্লেন-__ও রিতুযা, নিয়ে যা-বড় বৌমার চিঠি, 
নিয়ে বা_হছলেখার--ছোট বৌমার-_ওপরে দিগে যা! আর শোন্--বলে আয 
আমি চান করবে৷ এখুনি । 


কমপিটিশন ১২৭ 


খাবার ঘরে বড় পুত্রবধূ নন্দা ভাত নিয়ে এলো টেবিলে। ছোট বাটিতে 
কাচামুগের ভাল, বে-মশলার মৌরল! মাছের ঝোল আর কাগজি লেবু কাট। 
পৃথক ডিশে। সামান্য একটু ঘরেপাতা দই শ্বেতপাথরের বাটিতে । শিবশ্হ্কর 
খেয়ে হজম করতে পারেন না, লিভারের রুগী। পুত্রবধূ বল্লে--ও বেল! কথন 
ফিরবেন বাবা? 

-তা কি বলতে পারি কখন ফিরবো? নানা কাজ। তারপর আজ 
আযাটপির সঙ্গে গুরুতর কাজ রয়েচে । কেন? 

পুত্রবধূ হেসে বল্লে-আমরা ভাবচি বেহাল! যাবো পিকনিক করতে । 
গাড়ীখানার দবকার ছিল-_ 

--ও। তা--কটার সময় যাবে। গাড়ী না হয় শোভা সিং আপিস 
থেকে নিযে আসবে এখন। তোমাদের পৌছে দিয়ে চলে আসবে। আপবার 
সময় তোমর] ট্যা্সিতে এসো । পৌছে গাড়ী ছেডে দিও--বিমান কোথায়? 
ওপরে আছে? 

পুব্রবধূ মুখ নত করে বলে_-তা তো জাননে বাবা । 

--তার মানে? বেরিয়েচে? 

পুত্রবধূ পাষের নখে মাটি খু'্টতে খুটতে সেদিকে চেযে থেকে উ্বধ ছিলে__ 
উনি কাল বান্তিবে তো বাড়ী আসেন নি। 

-_সেকি কথা! কালও আবার আসে নি-_ হুঁ 

শিবশঙ্কর ভ্রু কুঞ্চিত করলেন, আব কিছু বল্লেন না। 

বেলা একটা । ঞ্টিবণক্করের আপিস কেটিস্ক স্ট্রীটে। বেশি বড আপিস 
নয়। জন আট নয় কেরাণী বিবিধ খাতা নিয়ে ব্যস্ত। একজন ছ্থোকর৷ 
টাইপরাইটারে ঠকঠক টাইপ করচে। শিবশসঙ্করকে আপিসে ঢুকতে দেখে 
সবাই একটু সন্্স্ত হয়ে উঠলো! । সন্ত্রস্ত হবার কথা। 

দেখতে আপিস ছোট হোক, কিছু দিন আগে এই আপিসে বসেই শিবশঙ্কর 


১২৮ অসাধারণ 


সরকার চালের কারবারে কম করেও স।ত লক্ষ টাকা মনাফ! পেয়েচেন। তেরশ+ 
পঞ্চাশ সালে ছুভিক্ষের বছর । তেরো সিকে দরে ধানের মণ কিনে সাড়ে ষোল 
টাকা মণ দরে ধান বিক্রী করেন। চালের কন্ট্রাক্ট নিয়ে এক হাজার টন চাল 
খরিদ করেন ত্রিপুরা জেল। থেকে । তারপরে সে দেশে চালের দর উঠে গেল 
চলিশ টাক] মণ। 

ভালো কাজ করেন নি তা নয়। দেশের বাড়ীতে প্প্রায় ছ'হাজার লোককে 
ফেন-ভাতের খিচুড়ি খাইয়েচেন, কাপড় ধিতরণ করেচেন কত লোককে। 
সম্প্রতি ছুটি মিলিটারী কন্ট্রাক্টের কাজে শিবশঙ্কর অনেক টাকা রোজগার 
করেচেন। ছুহাতে ঘুষ বিলিরেও ছ'লক্ষ টাকা ঘরে এনেচেন। এ বাদে খুচরো 
কারবার তার অনেক রকম আছে, এই ছোট আপিসটাতে বসে সারা বাজারের 
ব্হু গুপ্ধ খবর রাখচেন। টেলিফোনের বিরাম বিশ্রাম নেই এক মিনিট। 
বাজারে তার বহু চর সর্বদা ঘোরাঘুরি করচে, শেয়ার মারকেট থেকে সর্ষে পর্যন্ত 
কোনে! বাজারের গুপ্ত খবর ওদের জানতে বাকি নেই। 

মোটের উপর শিবশঙ্করের দিন যাচ্ছে ভালো, ধুলো-মুঠো ধরলে সোনা! মুঠো 
হচ্ছে। আর কি অসম্ভব খাটিয়ে লোক শিবশঙ্কর |! চরকির মত ঘুরচেন 
এখানে ওখানে, এ আপিস ও আপিস, কত লোকের সঙ্গে টেলিফোনে 
আলাপ করচেন, কত লোক তীর বাড়ী গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করচে-যে লোক 
এমনি নরম হয় না, তার স্ত্রীকে সন্থষ্ট করে অগ্রসর হতে হচ্ছেঃ ছু'চ যেখানে 
গলে ন, সেখানে হাঁতী গলিয়ে দিচ্ছেন শিবশস্কর,__পয়সা কি অমনি হয়? 

শিবশঙ্করের অভিজ্ঞতা এই যে, অর্থ উপাজ্জনের ক্ষেত্রে দয়া মায়। চক্ষুলজ্জ। 
ইত্যাদি দুরর্বলত। | যে বিচক্ষণ কারবারী সে এ সব মানবে না। কম্পিটিশনের 
ঝজার, চক্ষুলজ্জ। এখানে খাটে না। 

আর একটা অভিজ্ঞতা, অবিশ্ঠ বড় মুঙ্গ্যবান অভিজ্ঞতা যে, ঘুষ অসাধ্য সাধন 
করতে পারে । শিবশঙ্করবাবু বলেই থাকেন--ওছে এমন লোক দেখলাম না 


কমপিটিশন ১২৯ 


যে পুজো পেলে খেতে চায় না । তবে বেশি আর কম। কেউ চায় যোড়শো- 
পচারে পূজো, কারে! বা চাল কলা, কারো চিনির নৈবিদ্যি--ঢের ঢের দেখলাম 
হে, যেখানে ভেবেচি এর কাছে কেমন করে যাবো, এত বড় পদস্থ লোক-_ 
পুজে! দাও, বান্‌ সব ঠিক ! সবাই সমান, তবে ওই যে বল্লাম, বেশি আর কম। 
চুরি করার স্থবিধে জোটেনি যাঁর, সেই সাধু। 

বেল। একটার সময় একটি রোগা, দীর্ঘ চেহারার সাহেবি পোশাকপরা লোক 
শিবশঙ্করের আপিসে এসে ঢুকলে।। 

শিবশঙ্কর বল্েন--কি খন্র ? আম্মন, বস্থুন। 

--বড্‌ড বেশি চায়। | 

-_ কত? 

_ সাড়ে পাঁচ কোরে কাঠা । 

শিবশঙ্কর বিস্ময়ের স্থরে বলেন_-জমি কার? ব্যাঙ্কের? 

--আজ্ঞে না, মাগনলাল মুখনলাল ক্ষেত্রীর। একবার মর্টগেজ আছে। 
রেজিস্্রী আপিস সার্চ কর! হরেচে। 

--বড় বেশি দব বললে না? 

__ও অঞ্চলে ওর কম দর নেই। এর পরে সাত পধ্যস্ত উঠবে। ন; কাঠা 
একসঙ্গে আর পাওয়৷ যায়না স্তার। আপনি কাল নিজে একবার চলুন-_ 
বায়নাপত্বর রেজেস্্রী না করলে ছ তিনটে খদ্দের মুখিয়ে রয়েচে । 

এই সময় টেলিফোন বেজে উঠলো! । অল্প খানিকক্ষণ কথা বলে শিবশঙ্কর ফোন 
রেখে সামনের লোকটিকে বল্েন__অ]াটনির আপিস থেকে বলচে হরিশ মুখুষ্যের 
্্রীটের বাড়ীট1 এখুনি দেখতে যেতে হবে । চলুন না বাড়ীটা দেখে আসবেন-_ 

উভয়ে মোটরে বার হোয়ে সোজ! হরিশ মুখুষ্যে স্ত্রীটে সেই নম্বরের বাড়ীর 
সামনে এসে দেখলেন মিঃ ঘোষাল তাদের পূর্বেই মেখানে মোটর থামিয়ে অপেক্ষা 
করচেন। 

টা 


১৩ অসাধারণ 


বাড়ীর ওপরের নিচের সব ঘর, বাথরুম, দরদালান, ছাদ সব ঘুরে দেখা 
হোল। মিঃ ধোষাল বল্লেন--মতামত দিন মিঃ সরকার । 

--মতামত আর কি, নেওয়া হবে। 

সতিন পাসেণ্টের কথা স্মরণ রাখবেন। ও আমাদের একটা সর্ত। নয়তো 
আমারই হাতে ছটো খদ্দের। আপনি ক্রেতা, আপনার কাছ থেকে কমিশন 
নেওয়া নিয়ম নয় জানি-_কিস্ত এখানে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা 

_সেষযা হয় হবে। ইলেকটি,ক ইন্স্টলেশন নেই কেন? অত বড় বাড়ী-- 

সছিল। ওয্যারিং করে নিতে য! খরচ পড়বে তা তো আপনি এমনি বাদ 
পাচ্চেন। ওই বাড়ী কি ছুইএর কমে হয়-চার লক্ষ সত্তর হাজার পচাত্তর 
হাজার তো উইদাউট এনি ডাউট! আপনি বলুন, এখুনি এক মাড়োয়।রি 
থদের-_ 

না, না, সে কথা বলিনি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন-_ 

শিবশস্কর একাই আপিসে ফিরলেন, তখন বেলা পৌনে তিন। 

আপিসের চাকব কাক্য়া বল্পে-_হুজুর, টেলিফোন ছুবার বাজিয়েচে । হামি 
লদ্বর লিয়ে রাখিয়েসে। 

_-কই নম্বর ? 

_ হুজুরের ঘরের টেবিলমে আছে । মস্ত বাবুকে দিয়ে লিখিরে রাখিয়েসে। 
এক তো সাউথ ওয়ান ফাইভ-_ 

শিবশঙ্কর চাকরকে থামিয়ে দিয়ে বল্লে আচ্ছা, আচ্ছা, তুই যা--এক পেয়াল! 
চা জলদি তৈরী কর-- 

- আউর কুছ, বাবু! 

- আজ বাড়ি থেকে টিফিন আনেনি কেউ ? ফলটল? 

স্পনা হুজুর । সড়া পোচা ছ আপেল হুজুরের টেবিলমে ছিল, ও হামি 
ফেকিয়ে দিয়েসে--ও কালওয়ালা-_ 


কমপিটিশন ১৩১ 


--বেশ করিচিল। যা চা নিয়ে আম_ 

কারুর অনেক দিনের চাকর) আগে শিবশঙ্বরের বাড়ীতে ছিল, এখন 
কাজকর্মের স্থবিধের জন্তে ওকে আপিসে নিজের খাসকামরার চাকর রেখেচেন 
শিবশঙ্কর । শিবশঙ্কর কি খান না খান, কি তার অভ্যেস, কারুয়! এ সব জানে । 
কারুয়ার আনীত চায়ের পেয়ালাতে চুমুখ দিয়ে শ্িশঙ্কর ঝ|বু ভাবছিলেন আরও 
কিছু জমির সন্ধান নিতে হবে। 

জমি বড় দরকার। 

এই সব অঞ্চলে বড় বড় প্লটের সন্ধানে আছেন । 

শিবশস্কর কাগজকলমে ছোট্ট একটু হিসেব করে নিলেন। লাখ ছুই টাকার 
জমি কিনে রাখতে হবে। টালিগঞ্জের দিকে কিছু জমি এখনো আছে। ব্যাঙ্কের 
জাম কিছু আছে লেক আর ঢাকুরে যাদবপুর অঞ্চলে । 

“টাকা হোলে মাটি করো, মন্ত বড় কথ|।। অত বড় ইনভেস্টমেপ্ট নেই 
টাকার । দালালের! নানারকম সন্ধান নিয়ে আসে। তার টেবিলের ড্রয়ারে 
আছে জমিজমা-সংক্রান্ত নানা রকম খবর, দালালদের দেওয়া । শিবশঙ্কর বাবু 
ড্য়ার খুলে অর্ধ-অন্তমনস্ক ভাবে সেগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে যেতে লাগলেন । 
মেদিনীপুর জেলায় শালের জঙ্গল একশো কুড়ি বিঘে এক প্রটে। ধানের জমি 
ওই সাথে এক প্রটে সত্তর বিঘে, মাঝখানে বড় পুকুর। 

বর্ধমান জেলায় ধানের জমি নব্বই বিঘে। বনপাশ স্টেশনের কাছে। 

কুমারভি কয়লাখনির এক তৃতীয়াংশের মালিকানা স্বত্ব, বড় বাংলোর, 
ইদ্ারা, ছোট বাগান একজে । 

রানাঘাট টাউনে রেলের নিকট স্টেশন রোডের ওপর দুখান1 বাড়ি, রেলের 
ওপ[রের বাইশ বিঘের সেগুন বাগান, ইটের ভাট। 

যশোর জেলায় মৌজা ধরমপুর ও মৌজা চণ্তীরামপুর--হ্‌ইাটি বড় মৌঙ্জা 
নীলামে উঠেচে। সামনের মাসের বারোই তারিখে যশোর সদরে নীলাম হবে। 


১৩২ অসাধারণ 


লোক পাঠিয়ে শিবশঙ্কর জেনেচেন মৌজার আদায় ভালো, একাত্িরটি জমার মধ্যে 
উনিশটি খাস হয়ে গিয়েচে এবং আশা আছে আরও আটটি জম! এই বছরের 
মধ্যেই খাস হবে। বাকী খাজনা পড়ে আছে প্রজাদের কাছে কয়েক 
হাজার টাক1। 

হাজারীবাগ জেলায় সিংজানি-ভোজুড়ি অভ্রের খনি ও শালবন, বাংলো, ইদারা 
এবং কিছু ধানের জমি। 

উল্টোডিডির খাল ধার থেকে সামান্ত দূরে ৬মহেশচন্ত্র সিমলাইয়ের বাগান- 
বাড়ী ও পুকুর, বাগানে জমির পরিমাণ দশ বিঘে। কলমের আম, লিচু, ফলস! 
ম্যাঙ্গোস্টিন প্রভৃতি ফলের গাছ। দৌতিল! বাড়ী। 

অভ্রের খনির ওপর ঝেোক বেশী শিবশঙ্করের | ছু* পার্সেপ্টের অনেক বেশী 
আসবে টাকার ওপর। স্বাস্থ্যকর স্থান, মাঝে মাঝে গিরে থাকাও যাবে, 
কলকাতায় তো য| খান হজম হয় না, লিভারের রোগে কষ্ট পাচ্ছেন । 

আর বাকী সব পাড়ার্গেয়ে জমিজমা, ধানক্ষেত__নাঃ ওদের কি মূল্য আছে? 
জমি কিনতে গেলে কলকাতায় । কলকাতার সম্পত্তির মত সম্পত্তি নেই-_- 
বাড়ী বাজমি। মহেশ সিমলাইয়ের বাগানবাড়ী ভালো, ফলবান গাছ অনেক- 
গুলো, নার্সারি করবার জন্তে কেউ ভাড়া নিতে পারে, অনেকখানি জমি-_মূল্যবান 
সম্পত্তি হয়ে উঠতে পারে ছুচার বছর পরে। দালালে বলচে আটষটি হাজার, 
তিনি বলচেন পঞ্চাশ হাজার। যদি ওই! হয়, তবে খুবই ভালে! । 


শিবশঙ্কর ফেঁপে উঠলেন তো মেদিন। ক'বছরের কথা আর? কি ছিল 
শিবশঙ্করের ? বারাসাতের কাছে ভবনহাটি বিষুণপুর, ক্ষুদ্র গ্রাম, সেখানেই 
পৈতৃক বাড়ী। অবিগ্ঠি নিতাস্ত গরীব ছিলেন না, সেকেলে বড় গৃহস্থ, তবে 
ইদানীং নামেই ছিল তালপুকুর, ঘটি ডুবতো না। 

নিজের বুদ্ধিতে শিবশঙ্কর সব করেচেন। বীরের মত করেচেন, বীরের মতই 


কমপিটিশন ১৩৩ 


ভোগ করে যাচ্ছেন শিবশঙ্কর। এখনো হয় নি, লেক অঞ্চলে বড় একখান৷ বাড়ী 
করবার সখ তার, কিন্ত পছন্দসই জমি পাচ্ছেন না। 

তেজপুরের কাজট। যদি হাতে এসে যায়, তবে নির্থাত তিন লক্ষ ঘরে আসবে। 
হিসেব করে দেখা আছে তার। এই বছরের শেষেই টাকাট। হাতে আসতে 
পারে, যদি বিলের টাকা গভর্ণমেণ্ট এ বছরেই শোধ করে। পুজে! দ্রিলে শেষের 
ব্যবস্থা চট্পট্‌ হয়ে যাবে । শিবশস্করকে কাজ শেখাতে হবে না, ঘুবু হয়ে বসে 
আছেন তিনি। অনেস্টি বলে জিনিস নেই এ বাজারে । অনেস্টি একটা মুখের 
কথা মাত্র। কমপিটিশনের বাজার, অনেস্টিতে হয় না। টাক1.*টাকা"শশনচাই, 
টাকাঁ। ছুনিয়াতে টাকা ছাড়া আর কিছু নেই। টাঁকা যে পথে আলে আস্মক। 
টাক? রোজগারের এই তো সময় । যুদ্ধেব বাঁজারে যে যা করে নিতে পারে। 
কলকাতার হাওয়ায় টাকা উভচে***যার বুদ্ধি আছে ধরে নাও । কিছুই এখনো 
রোজগার করা হয় নি। অনেক কিছুই বাকী। 

কেবল একটা ব্যাপার শিবশঙ্করকে বড় চিস্তিত করে তুলেছে । 

বড় ছেলে বিমান প্রায়ই রাত্রে বাড়ী আসে না। নিজের আলাদা একখান! 
মোটর কিনেচে। নানা রকম কথা কানে গিয়েচে শিবশঙ্করের | ঠিক বুঝতে 
পারচেন না৷ এখনও তিনি । বিমান এমন ছিল না। বড বৌম! প্রারই কাদেন, 
স্থলেখার মুখে শুনতে পান তিনি। গিন্নি কিছু বলেন না, এজন্তে গিন্লিব ওপর 
শিবশঙ্কর সন্তুষ্ট নন। গিন্লির প্রশ্রয না পেলে বিমান এমন হোতে পারতো ন1। 
যত নির্বোধ নিয়ে হযেচে তার সংসার | 

টেলিফোন বেজে উঠে শিবশঙ্করের চিস্তাজাল ছিন্ন করে দিলে। 
-হ্য১ কে? ও আচ্ছাস্বেশ, বেশ। তুমি চলেই এসে। এখানে । দেরি 
করে৷ না। 

একটি সৌখীন বাবুমত লোক, চোখে সোনাব।ধানো। চশমা, ঘরে ঢুকলো দশ 
মিনিট পরে। এই লোকটি ঘরে ঢোকবার পরে শিবশঙ্কর সতর্ক দৃষ্টিতে ঘরের 


১৩৪ অসাধারণ 


দরজার দিকে ছু-তিনবার চাইলেন। লোকটি চাপা মৃছুম্বরে মিনিট দশেক কথা৷ 
বলে তারপর হঠাৎ শ্বাভাবিক স্থরে ফিরে এসে বল্লে--বেশ, যাই তা হোলে । 
স্বোসোঃ বোসো- 

-_ বুঝতে পারলে না? সামলে রাখতে বলিগে যাই । সিনেমায় আজকাল 
নাম করে উঠেচে ঠেলে, দেখতে পরমা রূপসী- মৌমাছির ঝাঁক কম নয়। 
বুঝতে পারলে না? ঠিক আটটাতে-_ 

বেল! ছ'টার পরে শিবশস্কর ড্রাইভারকে ডেকে বলে দিলেন--শোভা সিং, 
চল! যাও বেহালামে। বৌমাদের লে আও । হাম ট্যাক্সিমে যায়েঙ্গে । ঠিক করে 
লে আও যেন মিলিটারি গাড়ীমে ধাকা মৎ লাগে-_ 


বিছুৎ আচ্ছা! হুছ্ুর” বলে শোভা! সিং গ|ভী নিযে চলে গেল। 


সন্ধ্যা পর্য্যস্ত আপিসে নানা কাঁজ সেরে সাডে সাতটার সময় শিবশ"স্কর ট্যাক্সি 
নিয়ে বার হোলেন। ভবানীপুরের একটা ছোট গলির মধ্যে গাডী ঢুকলে! । 
আগের সৌখীন লোকটি বারান্দা থেকে নেমে এসে বল্লে--এসো ভায়া, এসো-- 
চ] খাবে না? 

আর এখন চা নয়। চলো-_ 

এখনে! দেরী আছে। ত্াামি কাপড পরে নি। আসচি_- 

দুজনে আবার গাড়ী নিয়ে চল্লেন__বেলতল। রোডের পার্কের কাছাকাছি 
একটা বাজীর সামনে এসে গাড়ী দাড়ালো । ছু'জনে সিডি বেয়ে ওপরে 
উঠতে লাগলেন। লোকটি বল্লে-_-আমি ফোন করেছিলুম, আটটার সময় সব 
সরিয়ে দিও। খুব সুন্দরী, আর বয়েস উনিশের বেশী নয়। নিজের চোখেই 
হ্যাথে! ভায়া, এ শশ্মার নাম গোপাল চক্কোত্তি। মাসে চারশোতেই রাঙ্তি করিয়ে 
দেবো তুমি শুধু দেখে যাও- সিনেমাতে আজকাল নাম কি! যত সব চ্যাংড়। 
ছোকরার ভিড় সেই জন্তে-_ 


কমপিটিশন ১৩৫ 


ওপরে দিব্যি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সুন্দর বারান্দা, ফুলের টব সাজানো । 
'অকিডের টব ঝুলচে বারান্দার ছাদের প্রান্ত থেকে। 

সঙ্গী লোকটি কড়া নাড়তেই ওদিকের দরজা! দিয়ে যে তরুণ সিগারেট মুখে 
বেরিয়ে এসে পাশের সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে গেল--শিবশঙ্কর যেন ভূত 
দেখলেন তাকে দেখে। 

শিবশঙ্করের সঙ্গী বলে__ওই দ্যাখো, যত সব ছেলে ছোকরার মরণ-ছ্িনেমার 
ইয়ে কিনা? 'আাসল কমপিটিশন্‌ হচ্ছে এদেব কাছে টাক্াব-সে কমপিন্টশনে 
ঈাড়ানে চ্যাংড়াদের কন্্ নযর়-_ও কি ! ফড়ালে যে? কি হোল? 

শিবশঙ্কর ততক্ষণ দম নিলেন । 

যে ওদিকের সিডি দিয়ে নেনে গেল, সে বিম।'ন, তার ছেলে বিদান। 


পাশা শী 


/ব্ল্যাকমার্কেট দমন কর 


চিঠিখান! পাইয়া বড়ই রাগ হইল। সকালে চা পান করিয়া সবে সেরেস্তায় 
আসিয়৷ বসিয়াছি, আর অমনি পিওন আপিল। ঘড়িতে দেখিলাম মাত্র আটট1। 
বলিলাম--আজ এত সকালে? 

পিওন বলিল--ন৷ বাবু, সকাল আর কই? আপনার ছুটো মনিঅর্ডার 
আছে, ভাবলাম আগে বিলি করে তবে অন্ত জায়গায় যাই--একটু পরে মক্কেলের 
ভিড় হোলে তখন আপনি ফুরসৎ পাবেন না হয়তো | নিন, সই ছুটো করে দ্রিন 
- পঞ্চাশটাক। আর আটাশটাক এগারো আনা-- 

মক্ষেলদের টাক1 অবিশ্টি। কোর্টের খরচা । বিজন মুহুরীকে ডাকিয়া 
বলিলাম-গ্যাখো তো এসমাইল বদ্দি বাদী, ফজলুল গাজি বিবাদী । কেসের 
তারিখটা কত? 

বিজন আমাদের সেরেশ্ায় অনেকদিন মুহুরী । আমার ও আমার দাদার। 
আমার পুজ্যপাদ পিতৃদেবের আমল হইতে উহার] এখানে আছে । বিজনের বাব! 
৬রামলাল চত্রবর্তী আমার স্বর্গীয় পিতৃদেবের মুহুরা ছিলেন। আমাকে ও আমার 
দাদাকে কোলে পিঠে করিয়া মানুষ করিযক্লাছিলেন। বিজনের সঙ্গে বাল্যে খেলা- 
ধুলা করিয়াছি, আবার সেই বিজন আমাদের সেরেস্তায় মুহরীগিরি করিতেছেও 
আজ বাইশ বৎসর। খুব হুশিয়ার লোক । 

বিজন খাতা দেখিয়া বলিল-_২২শে আগস্ট। কত টাকা পাঠিয়েচে 
এসমাইল ? 

- আটাশ টাক। এগারো আন1-_ 

-_-ফেরৎ দিন মনি মর্ডার, সই করবেন না বাবু- 

কেন? 


ব্যাকমার্কেট দমন কর ১৩৭ 


-আপনার চার টাক! আর কোর্টফির দরুন আমার কাছে ধার ছ্টাক! ওর 
যধ্যে ধরা নেই । 

_ঠিক তো? 

ঠিক বাবু, এই দেখুন খাতা _ 

লিখিয়া দিলাম 'রিফিউজড”। অন্যটি সই করিয়া লইলাম, মুহুীকে বলিলাম 
--টাকা দেখে নাও। ভঙজু চাকর আসিয়া বলিল__ব'বুঃ বাজারের টাক1_ 

দাদার কাছে নিগে যা 

_তিনি বাড়ী নেই। বেডিয়ে ফেরেননি এখনো । মা ঠাঁককন বলে 
দিলেন, মাছ এক দের আর মাংস এক সের লাগবে । 

--ম!ংস আবার কি হবে আজ ? আঃ বিরক্ত করলে সব। খরচ করেই সব 
উড়িয়ে দিলে। রোজ মাংস। নিয়ে যা একখানা! নোট--বিজন একখান দশ 
টাকার নোট দাও তো ফেলে এদিকে । দুধের তিন টাকা! শোধ কবে দিয়ে আসবি 
'আজ। বুঝলি? 

পিওন হাসিয়া বলিল-_-বাবু, আপনাদের বড সংসাবে আপনারা যদি রোজ 
মাংস না খাবেন তো খাবো কি আমর? আপনাদের দিয়েচেন ভগ্ন খেতে । 
আপনারা খাবেন না? ও আড়াই টাক] মাছের সের হোলেও আপনাদের গায়ে 
লাগে না, তিন টাকা হোলেও আপনাদের গায়ে লাগে না। আমরা এক 
টাঁকাতেই মরি । 

পিওন ও চাকর চলিয়! গেল। যাইবার সময় আমার ইঙ্গিতে বিজন পিওনকে 
একটা সিকি ফেনিয়া দিল। ছুজন চাষীলোক ঘরে ঢুকিয়। বলিল-_বাবু ছালাম। 
শরৎ বাবু উকিলের বাড়ী কি এড? 

হ্যা» কেন? 

»একটী মকদ্মা আছে বাবু। আজ্জি করে দিতে হবে একটা-_ 

-কি কেস? কোথায় বাড়ী? 


১৩৮ অসাধারণ 


__বাবুঃ আমার বাড়ী রাইপুর আর এ আমার খালাতো ভাই, এর বাড়ী 
ন'হাটা। আমাদের একটা আমবাগান ছেল-_তা1 আমার চাচ। হবিবর 
সেখ-- 

মকেল জটল গল্প ফাঁদিবে বুঝিয়া বিজন মুহুরীকে বলিলাম-_-এদের কেস 
শোনো । আমি ততক্ষণ ডাকের চিঠিগুলো দেখে নি-_খবরের কাগজখান। চোখ 
বুলিয়ে যাই । যাও তোমরা ওদ্দিকে যাও--টাকা এনেচ সঙ্গে ? 

_ হ্যা বাবু! 

কত টাক1? আরজি করার ফি হ'টাকা লাগবে । সব জিনিসের দাম 
বেড়েছে, চার টাকায় আর হবে না। 


-_-তা দেবো বাবু ঝা লাগে-_- আমাদের শুন্টন তবে বাবু কি নেগগেরো, এই 
আমার খালাতো ভাই-_ 


--যাঁও ওদিকে যাও 


এইবার ডাকের চিঠি খুলিতে খুলিতে এই চিঠিখানা পাইলাম । পড়িয়া 
বিপ্ক্তি বোধ হইল।' চিঠিখানা এই-- 


শুভাশীর্ববাদমন্তর রাশয় বিশেষ: 

বাপজীবন অত্র সকল কুশল জানিবা। তোমাদের অনেকদিন কোন সংবাদ পাই 
নাই। পরে লিখি যে আমাদের গৃহদেবতা শালগ্রামের পুজার জন্য তোমরা যে 
২।৩/০ প্রতি মাসে পাঠাইয়া থাক, তাহা এ যাবৎ নিয়মিত পাইয়া আসিতেছি। 
কিন্তু লিখি যে বর্তমান অবস্থায় সকল জিনিস আক্রা। এক পের আলো চাউলের 
মূল্য মাখমহাটির বাজারে আট হইতে দশ আন।। একটি পাকা কলা এক পয়স! 
মূল্যে হাটে বিকায়। এ অবস্থায় পুক্তার দরুন প্রতি মাসে ছয় টাকা করিয়া না 
দিলে আর পার যাইতেছে না। সকল দিক বিবেচনা করিয়া আগামী মাস 
হইতে ছয় টাকা করিয়া পাঠাইবে। খুড়া মহাশয় রামধন চক্রবর্তী সম্প্রতি পারে 


ব্ল্যাকমার্কেট দমন কর ১৩৯ 


আঘাত পাইয়া বড় কষ্ট পাইতেছেন জানিবা1। বধৃমাতাদের আনীর্বধাদ 
জানাইবা | 
ইতি-- 
নিত্যাশর্বাদক 
শ্রহরিসাধন দেবশর্শ। 
সাং বাহিরগাছি। বদ্ধনান জেলা । 

একটু পরে দাদা বেড়াইয়া ফিরিলেন, তার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। 
বিজনকে বলিলাম- একবার বড়বাবুকে ডাক দাও তো। উনি বোধ হয় 
সেরেনার গিয়ে বসেচেন | 

দাদা আসিয়া বলিলেন__কি রে? 

-এই দেখে! হরি ভটচাজ আজ দেশ থেকে চিঠি লিখেচে, ছ' টাকা না 
পাঠালে মাসে মাসে আর সে ঠাকুরপুজো করবে না। 

দাদা পত্র পড়িয়! জ্রকুঞ্চিত করিয়া বলিলেন_-ও ! ঠাকুর-পুজোতেও ব্র্যাক 
মার্কেট! দয়া করে তো টাকা দিচ্চি। নামেই পৈতৃক ভিটে, কখনো! যাইও নে। 
জ্ঞাতির বাড়ীতে আছে। ওটাক1 তে] ষ্রাইপেগ্ডের সমান চিন- আমরা। 
বেশ, না পূজো করেন, না করবেন । টাকা একদম বন্ধ করে দাও সামনের মাসে । 
গৃহই নেই তো গৃহদেবতা । 

তাহাই করিলাম। ছুমাস কোনে! টাক। গেল না। চিঠিপত্রও নয় | 

ছ' মাস পরে আর এক চিঠি দেশের । খুলিয়া পড়িলাম-_ 

শুভাশীর্ববাদমস্ত রাশয় বিশেষ: 

অত্র পত্রে কুশল জানিবা। পরে লিখি যে বাপাজীবন তোমাদের পৈহক 
গৃহদেবতা শালগ্রাম সেবার জন্ত যে ২1৬ করিয়৷ মাসে মাসে পাঠাইর1 থকো 
তাহ! আজ ছুই মাস বন্ধ হওয়ার কারণ কিছু বুঝিলাম না। আমরা তোমাদের 
বংশের কুলপুরোহিত। বর্তমানে অবস্থা দরিদ্র হইয়া! পড়িয়াছে। যাহা 


১৪৩ অসাধারণ 


পাঠাইতেছিলে না৷ দিলে পুজাও বন্ধ হয়, সংসারের সাহাফ্যও পাও যায় না। 
অতএব টাকা পাঠাইতে বিলম্ব করিবা না। খু! মহাশয সম্প্রতি সুস্থ হইযা 
উঠিগ্পাছেন । পক্রপাঠ টাঁকা মনি অর্ডার যোগে পাঠাইবা। বধূমাতাদের 
আশীর্বাদ দিবা । 
ইতি 
নিত্যাশীর্ব্বাদক 
শ্রহরিসাধন দেবশশ্মা 
সাং বাহিরগাছি, বর্ধমান জেল! । 


দাদাকে পডাইলাম। দাঁদা বলিলেন__দাও পাঠিষে। বদমাইসি ঠাণ্ডা হয়ে 
গিয়েচে। ব্র্যাক মার্কেট করতে এসেচে ঠাকুরপূজোয 

সেইদিনই দাদার বড ছেলে__শুভেন্দু কলিকাতা হইতে বাড়ী আসিল। 
তাহার পরনে কচি ধুতি দেখিয়। বলিলাম-_-এ কোথাব পেলিরে? কত 
নিলে? 

শুভেন্দু প্রেসিডেন্দী কলেজের ছাত্র। দাদার বড় ছেলে। বেশ সৌখীন। 
€সে হাসিয়া বলিল-_কাকা, কত বলো তো! ? 

--কি জানি বাপু, আমর! বুড়ো মানুষ । ও সব আগে তো পাঁচ ছ, 
টাকা ছিল। 

__ত্রিশ টাকা একখানা । তাও লুকিয়ে এক দোঁকান থেকে সন্ধ্যের পর 
কেনা । এমনি কোথাও মেলবার জে! নেই। ভাল না? জরির আজি 
ছাখো- 

এই স্ময়ে দাদাও আসিলেন। ছুজনেই কাপড় দেখিলাম। দেখিয়া 
শুভেন্দুর ক্র-নৈপুণ্যের যথেষ্ট প্রশংস। করিলাম । 





হাক 

আমি সকালে উঠে বলে কাগজপত্র নিয়ে ঘাটচি, এমন সময়ে একটি তেরো 
চৌদ্দ বছরের ছোট মেয়ে রাঙা শাড়ী পরে আমাদের বাড়িতে ঢুকলো । আমাদের 
গ্রামেরই মেয়ে নিশ্চয়, তবে একে কোথাও দেখিনি বলে চিনতে পারলাম না। 
মেয়েটির এই অল্প বরসেই বিয়ে হয়েচে, ওর কপালে সি'ছুর, হাতে সোনা বাধানে! 
শাখা। শ্ঠামবর্ণ, একহারা চেহারার মেয়ে। মুখখানি বেশ ঢলঢল, বড় বড় 
চোখ ছুটি । কানে ছুটি সোনার ছল। জিজ্ঞেস করলুম-_কার মেয়ে তুই রে? 

মেয়েটি সামান্য একটু হেসে মাটির দিকে চোখ রেখে ব্পে-_বিশ্বনাথ 
কামারের। 

_বিশুর মেয়ে? বেশ, বেশ। তোর দেখচি বিয়ে হয়েচে এই বয়সে। 
কোথায় শ্বশুরবাড়ি? 

মেয়েটির খুব লজ্জা হোল শ্বশুরবাড়ির কথায়। সে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে 
বল্ে-_নারানপুর । 

- কোন্‌ নারান্পুর ? ধিবে-নারানপুর ? 

স্হ্যা। 

- কদ্ছিন বিয়ে হয়েচে? 

_-এই ফাল্তুন মাসে । 

_ শ্বশুরবাড়ি থেকে এলি কবে? 

--পরশু এসেচি কাকাবাবু । 

-_আচ্ছা য! বাড়ির মধ্যে ফা। 

গ্রামের মেয়ে বাপের বাড়ি এসেচে, এ পাড়া ও পাড়ায় সব বাড়ি ঘুরে 
বেড়াচ্চে। বড় সেহ হোল খুকিটির ওপর | এই গ্রামেরই মেয়ে, আহ! 


১৪২ অসাধারণ 


কিন্ত খানিকক্ষণ পরে বাড়ির মধ্যে ঢুকে দেখি মেয়েটি মাঝের ঘরের 
মেজেতে চুপ করে বসে আচল নিয়ে নাড়চে। কেউ ওর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে 
না, কেউ ওর সঙ্গে কথা বলচে না। প্রথম প্রথম হয়তে। কথ! বলেছিল মেয়েরা, 
এখন আর ওর কাছাকাছি কেউ নেই, ও একাই বসে আছে। কামারদের 
মেয়ে, তার সঙ্গে কে কথা বলে বেশিক্ষণ? 

আমায় দেখে মেয়েটি বল্লে-_কাকাবাবু, ও কিসের ছবি? 

--ও আমার ফটো । 

- আপনার ছবি ? 

মেয়েটি টে! কথা বে।ধ হয় বুঝতে পারেনি । বলুম--হ্য| আমার ছবি। 

--কে করেচে কাকাবাবু? 

মেয়েট এতক্ষণ বিস্মম ও প্রশংসার দৃষ্টিতে ঘরের দেওয়ালের কতকগুলো 
ফটো, সিগাবেটের বিজ্ঞাপনের মেমসাহেব, ক্যালেগারের ছবিগুলোর দিকে চেস্সে 
চেয়ে দেখছিল। পলীগ্রামের ঘরের দেওদালে অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, যামিনী 
রায় বা রেংব্রাণ্টের ছবি 'অবিপ্তি টাঙানো ছিল ন]1। 

--ও মেমসায়েব কি করচে কাকাবাবু? 

- সিগারেট খাচ্চে। 

--ওমা, মেয়েমাহষ নিগারেট খায়? 

-মেমসায়েবরা খায়। দেখেচিস্‌ কখনো মেমসায়েব ? 

হু" । 

স্কোথায়? 

_ রানাঘাট ইঙ্টিশানে। আডংঘাটা যাচ্ছিলাম যুগলকিশোর দেখতে, তাই 
দেখি রেলগাড়িতে বসে আছে । সাদ! ধপ ধপ করচে একেবারে । 

দেখলুম ও এক] বসে থাকলেও দেওয়ালের ওই অকিঞ্চিৎকর ছবিগুলো! দেখে 
'বেশ আমোদ পাচ্চে। আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমি আবার ঢুকলাম 


তুচ্ছ ১৪৩ 


খরে কি কাজে। মেয়েটি সেখানে ঠায় বসে আছে সেই ভাবেই । ওকে কেউ 
গ্রাহও করচে ন| বাড়ির মেয়েরা । তাতে ওর কোলে! ছুঃখ নেই, দিব্যি একা! 
একা বসে আছে । চলেও যায় নি। 

ও যে আমাদের ঘরে ঢুকে ঘেজের ওপর বসে আছে, এই আনন্দে ও ভরপুর । 
দিব্যি লাল রং দেওয়! মাজাঘসা মেজে, ঘরের বিছানা আসবাবপত্র দামী লয়, 
কিন্ত পরিষষার পরিচ্ছন্ন । দেওয়ালে যে শ্রণৌর ছবি, সে তো বলাই হোল। 
একখানা টেবিল, একটা চেয়ারও আছে । টাটার টেবিল ল্যাম্প আছে একটা । 
কতকগুলো মাটির পুতুল-_-যেমন গণেশ-জননী, গক, হরিণ টিয়াপাখী, রাধাকুষ্ণ 
প্রভৃতি--একটা কাঠের তাকে সাজানো আছে । 

গৃহসজ্জার এই সামান্য বূপই ওর চোখে আশ্চধ্য ঠেকেছে, খুকির চোখ দেখলে 
তা বোঝা যায়। আমার কষ্ট হোপ ওকে কেউ আদর করে ওর সঙ্গে কথা বলছে 
না। ও সেট! আশাও করেনি। আমাদের গ্রামে তেমন ব্যবহার কামার 
কুমোরদের মেয়েদের সঙ্গে কেউ করে না। ওরা ঘরে ঢুকে বসতে পেয়েছে, 
এতেই ওর অত্যন্ত খুশি আছে। 

আমি হেল মেখে নাইতে যাবো । নারকোল তেল আজকাল *'০1 যায় না 
বলে বাড়ির মেয়েদের ফরমাজ মত গন্ধতেলের বোতল আসে দোকান থেকে-_- 
হেন কল্যাণ, তেন কল্যাণ । 

আমি বোতল থেকে তেল বের করে মাথায় মাখচি দেখে ও চেয়ে রইল । 

আমি বল্লাম-_গন্ধতেল একটু মাথবি, খুকি? 

মেয়েটি অবাক হয়ে গেল! এমন কথা কেউ ওকে বলে নি, কোনো! ব্রাহ্ষণ- 
বাড়ির কর্তা তো নয়ই । 

বল্লে--হ্যা ! 

স-সরে আয় দিকি মা। 

তারপর তার চোখছুটির অবাক দৃষ্টিকে অবাকৃতর করে দিয়ে আমি নিজের 


১৪৪ অলাধারণ 


হাতে তার মাথায় খানিক গন্ধতেল মাধিষে দিলাম, খোঁপা বাধা চুলেব শুপরি 
ওপর। ও হেসে ফেল্লে। অনাদৃূতা আদর পেয়ে লঙ্জা পেলে। 

বলাম--কি রকম গন্ধ? 

-চমৎকাব, কাকাবাবু! 

--কি তেল বল দ্িকি ? 

_জানি? 

_ খুব ভাল গন্ধতেল। 

ভারি খুশি হয়েচে ও । 

বলে-_ আসি তা! হোলে কাকাবাবু? বেল! হয়েচে। 

-এসো মা। আবাব এসে। একদিন-- 

চলে গেল খুকী। কতটুকু আর তেল দিলাম ওর মাথায। কিন্ত কি আনন 
আমার মান কবতে নেমে নদীজলে। উদার নীল আকাশে কিসের যেন সুস্পষ্ট 
সৌন্দধ্যময় বাণী। অন্তরের ও বাইরের বেখায় রেখাষ মিল। চমৎকার দিনটা । 
কুন্দর দিনটা । , 


পিদিমের নীচে 


একটিম ত্র গ্রামে আমর বাল্যে এই ধরণের এক ব্যক্তিকে আমি 
দেখেছিলাম । কেউ তার জীবনচরিত লেখেনি, কেউ জানেও না তাকে, কিন্তু 
আমি জানি এবং যতটুকু জানি বা নিজের চোখে দেখেছিলাম, লিখে রাঁখা উচিত 
ভেবে লিখে"রাখলাম | 

আমার ছেলেবেলায় ধিন কতক মাসীর বাড়ীতে কাটিয়েছিলাম সে গ্রামে। 
আম|র তখন বয়স ন” দশ বছরের বেশী নয়। 

গঙ্গার ধারের পথ দিষে একদিন মাসতুতো ভাই নন্দর সঙ্গে পাশের গ্রাম 
আমিনপুরে চাল আনতে যাচ্ছিলাম । বিকেল বেলা, বর্ষ কাল, গঙ্গার জলে খুব 
ঘোল! এসেচে, জল বেড়ে সাতনলির বড ঢডা ডুবে গিয়েছে, ঝিঙে পউলের ক্ষেত 
জলের অত্যন্ত ধারে এসে পডেচে। 

হঠাৎ নন্দ আমায় ধমক দিযে বল্লে--এই, সরে আয়। 

-কিরে? 

আমার মুখ থেকে কথা বেকতে না বেরুতে ঝুপ করে অনেকখানি পাড় ভেঙে 
পড়লে! অনেক নিচে ঘোল! জলের আবর্তের মধ্যে। আমার শরীর ঝিমঝিম 
করতে লাগলো । 

নন্দ বলে__এখুনি গিইছিলি যে। 

সত্যই তাই। আর একটু হোলে আমি গিয়ে পড়তাম গঙ্গাগর্ডে। তখন 
সাতার জানতাম না। জলে পড়লে আর বচবার উপায় ছিল না। আমার বড় 
ভয় হোল, গঙ্গার ধার বেয়ে বেয়েই রাস্তা অনেক দূর চলে গিয়েচে! যি আবার 
পাড় ভাঙে, বিশ্বাস কি। 

নন্দকে বল্লাম__নন্দদা, আমি যাবে! না, তুই যা। আমি বাড়ী যাই-_বলেই 
দ্বীকার করতে এখন লজ্জা হয়, কেঁদে ফেললাম । 

১৩ 


১৪৬ অসাধারণ 


নন্দ কাছে এসে বল্লে-_ওই গ্/খো, নাও, কেঁদে উঠলি কেন? কি মুস্কিলেই 
পৃড্রী'গেল দ্যাখো । বাড়ী যেতে পারবি নে একলা। চল্‌ তোকে পাগল গঠ্রাকুরের 
আস্তানায় রেখে আসি । 

এইভাবে এই অদ্ভুত লোকটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটলো! । 

এ ঝুঞ্চলে আমি আছি আন্ত মাল ছুই। পাগল ঠাকুরের সম্বন্ধে অনেক 
কথ শুনে আসচি এতদিন । শুনেছিলাম প্রথম আমাব মাসিমার মুখে । আমি 
বলেছিলাম--সে কে মাসিমা ? 

__গঙ্গার তীরে থাকে । সাতনলির চরেব এপারে । 

-কে সে? 

--জেতে বু'না। ওখানে আস্তানা! করে আছে ঘর বেধে আজ বিশ ত্রিশ 
বছর । আমার তো! বিয়ে হয়ে এখানে এসে এন্তক শুনে আসচি। অনেক 
ছোট জেতের গুরুদেব । মাঘ ম'সে তাব ওথানে মেলা বন্দে লোকজন আসে, 
দেকান পসার জমে । 

-আ[ম একদিন দেখতে যাবো ? 

না, যায় না। বুনো বাগ্দি, ছোট জেতের কাণ্ড, সেখানে কি দেখতে 
যাবি তুই ? ছুলে যাদের গঙ্গান্নান না করলে শুদ্ধ, হয় না। 

সেই বিকেলে আমার মাসতুতো৷ ভাই নন্দ আমার পাগল ঠাকুরের আস্তানা 
বসিরে রেখে চলে গেল। বল্লে-ফিরে না আসা পয্যন্ত বসে থাকবি-_ 

একটা বাবলা বনের মধ্যে ছু"'খানা খডের ঘর। একটা ছোট গোয়াল ঘর, 
তাতে ছুটি গাই-গরু বাধা । একখানা ঘরের দাওয়া অত্যন্ত নিচু, সেখানে 
খানকক পিশডি আর খেজুরের চেটাই পাতা। বাবল! গাছে ফুল ধরেচে, 
ফুল ঝরে ঝরে নিকোনে। পুছোনো পরিষ্কার উঠোনটা ছেয়ে রেখেচে। একটি 
বৃদ্ধা স্ত্রীলোক গোয়াল ঘরে ঘুটের সাজাল দিচ্ছে। আর কেউ কোথাও নেই। 

এমন সময় একটি লোক বাবলা বনের ওধার থেকে বড় ঘরখানার দাওয়া 


পিদিমের নীচে ১৪৭ 


এসে একখান] দা রেখে দিলে । তার কাধে এক বোঝা সবুজ জোলো ঘাসের 
আটি। লেকটার লম্বা! দাড়ি বুকের উপরে পড়েচে, মাথায় লম্বা ল্থা জট পাকানো 
চুল, পরনে অতি মলিন এক কাপড়--দেখে পাগল বলে মনে হয়। 

লোকটা আমাঁকে লক্ষ্য করে বলে--কে ওখানে? কে গা? 

আমার ভর হয়েচে। আমি আমতা আমতা করে বল্লাম--এই-_এই--ওই 
আমার মাসীর বাড়ী-_ 

সেই বৃদ্ধা বল্লে--বাওনদের ছেলে । বোধ হয় বাবুদের বাড়ীর । ভূপেনবাবুর 
নাতি নন্দ বসিয়ে রেখে গেল। ভয় কিখোক1? ভয়কি? শসাখাবা? 

শসা খাবে কি, লোকটার হাব্ভাবে ও রক্তবর্ণ বড় বড চোখ দেখে আমার 
প্রাণ তখন উড়ে গিয়েচে। আমি কাঠেব পুতুলের মত আষ্ট হয়ে বসে আছি। 
দহ্য-ডাকাতের গল্প শুনেচি, সেই দক্ষ্য-ডাকাতদের একজন নয় তো? 

হঠাৎ লোকটা আমার দিকে এগিয়ে আসতে ভাঁনতে বলে -_-ভয় কি, 
বাবাঠাকুর? ভযকি? কিছু ভয় নেই। বোসে। 

তারপর একেবারে কাছে এসে অত্যন্ত মোলাযেম মেহের হাসি হেসে বল্লে-_ 
'আহ1, বালক ! 

আমি চুপ করে বসে আছি। বোবার শক্র নেই। 

লোকটা বল্লে-_নাম কি বাবাঠাকুর ? 

ভয়ে ভয়ে বল্লাম--পতিতপাবন মুখোপাধ্যায় 

_-পতিতপাবন ? বাঃ) বেশ, বেশ। পতিতপাবন যিনি, তিনিও তোমার 
মত। আহ'-হা! আহা! 

লোকটা শেষের কথাগুলো ক।দে কাদে! স্থরে জোরে জোরে উচ্চারণ করলে। 
তরপর বল্ে-ওগো, পতিতপাবন্রে ভোগ দেবে কি দিয়ে? আমার বাড়ী 
এসেচেন দয়া ক'রে, সে অনৃষ্ট করিনি যে বাবাঠাকুর। তোমার ও মুখে কি তুলে 


১৪৮ অসাধারণ 


দেবো? পাকা তাল একটা নিয়ে যাও--ালের বড়া ভেজে দিতে বোলো 
তোমার মাসিমাকে-__ 

আমার কথাগুলে। ভাল লাগলে! এবং ভয়ও অনেক চলে গেন। কিন্তু ওর 
রকম সকম দেখে মনে হোল লোকটা পাগল ঠিকই । তাই ওকে পাগল 
ঠাকুর বলে। 

পাগল ঠাকুর ছোট ঘরটার দাওয়ায় গিয়ে বসে আমায় কাছে ডাকলে। 
হাতছানি দিয়ে বল্লে-_-এসে? পতিতপাবন, এসো, এসো 

বৃদ্ধা বলে-_-ওকে ডেকো না, ভয় পেয়েচে। 

কিন্ত আমি সম্প্রতি নির্ভয় হর়েটি দেখাবার জন্তে পাগল ঠাকুরের পাশে গিরে 
বসলাম। পাগল ঠাকুর একখানা খেজুরের চেটাইয়ের উপর বসে এক কন্ক 
তামাক না গাজা কি সাজলে। আমায় বল্ে_তুঁম বাওন? 

_হ্যা। 

__পায়ের ধুলো দেবা একটু? 

আমায় ছু-য়ো না৷ মাসিমা বারণ করেছে । 

পাগল ঠাকুর হেসে উঠে বল্লে-_কেন, নাইতে হবে বুঝি? তা আমায় ছুঁলে 
তোমায় নাইতে হবে না। আমি বাওন নই, কিন্ত দয়াল গুরুর নামে থাকি। 
তিনি আমাদের সকলের চেয়ে বড়। দাও, পানের ধুলো 

পাগল আমার পায়ের ধূলো নিয়ে মাথায় দিলে । 

সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরে কি বেন একটা অন্তত ভাব হোল। একটা অদ্ভুত 
আনন্দের ভাব, সে মুখে বলে বুঝিয়ে দিতে পারবে ন।, বিশেষত তখন আমি 
বালক, বিশ্লেষণ ও তুলনা করে দেখবার ক্ষমতা ছিল না। এখন এক একবার 
ভাবি, পাগল ঠাকুরের পায়ের ধূলে৷ নেওয়াট। হয়তো৷ একটা ছু তো--আমাকে স্পর্শ 
করবার জন্তেই ও পায়ের ধুলো নিতে চেয়েছিল । 

তারপর ও একট! গান করলে। গান আমার মনে নেই, কিন্তু বেশ গলার 


পিদিমের নীচে ১৪৯ 


সর ওর। গান গাইতে গাইতে ওর চোখে জল এল, গাল বেয়ে জল পড়তে 
লাগলো। “ও আমার হৃদ্-কমলের পরমগ্ডুরু সাঁই”__ এই কথাট! বার বার ছিল 
গানের মধ্যে । 

গান শেষ করেও বার বার বলতে লাগলো-_কিছু খাওয়াতে পারলাম না, 
বাবাঠাকুর। একটা পাকা তাল নিয়ে যাও, বড়া করে দিতে বলো তোমার 
মাসিমাকে। 

আমার ভয এখন সম্পূর্ণরূপে কেটে গিয়েছিল। আমি বল্লাম_তুমি কি 
কর এখানে? 

পাগল ঠাকুর হা হা করে হেসে উঠে আমার দিকে চাইল। তারপর সন্ষেহ 
স্থুরে বল্লে__বাবাগাকুরের কথা শোনো । হাসতে হাসতে মরি যে! খুব আনন্দ 
জুটিয়ে দিলেন আজ সন্দেবেলা গুরুগোর্পাই। বলে কিনা-কি কর? আমি 
এখানে থাকি বাঁবাঠাকুর। আর কি করবো? গুরুগোসাইকে ডাকি । 

-কেসে? 

__ ওই, গই-- 

পাগল আল তুলে আকাশের দিকে দেখিয়ে বল্লে-_উনি। 

আমার খুব ভাল লাগছিলো! এই অদ্ভুত লোকটাকে | এই অল্লক্ষণের মধ্যেই 
আমি তার দিকে যথেষ্ট আকৃষ্ট হয়ে পড়েচি, দেখলাম । এই সময় সন্ধ্যের 
অন্ধকার নামলো । গায়ের রোয়া আর দেখা যায় না। ও উঠে দোরে জল 
দিয়ে ধূনো জাললে ৷ উঠোনের একট! ইটের মত উচুমত জায়গাতে প্রদীপ 
নিয়ে গিয়ে রেখে দিলে। আমি বল্লাম__তোমাদের তুলসীগাছ নেই? 

_-কেন বাবাঠাকুর? 

--আমাদের বাড়ী আছে। মাসিম| পিদিম দেয় সন্দেবেল!। 

_- তুলসী রাখিনে তো! বাবাঠাকুর। গুরুগোর্সাই ওই পিঁড়িতেই আছেন। 
তুলসী কি হবে? 


১৫০ অসাধারণ 


-_তুমি পুজো কর ন! বুঝি? তুলসী পাতা না হোলে পূজো হয় না। 

পাগল ঠাকুর হেসে বল্ে-হ্‌য় বাবা, হ্য়। কেন হবে না? সক 
ফুলে, সব পাতাতেই তার পুজো! হয়। তবে পুজে।-আচ্চা৷ আমি করিনে বাবা। 

-কর না? 

না, বাবাঠাকুর। আমি ছোট জাত, বুনো । তেনার পুজো কি কত্তে 
পারি আমি? গুরুগোসাই পাবে রাখেন যদি তবে আর পুজোর দরকার কি? 
ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজো৷ করবে তোমরা-_বাঁওনেরা । আমাদের ছোট জেতের 
হাতে ও সাজে না। পুজো কত্তে নেই আমাদ্রে। 

--তুমি তো ভাল লোক । 

-কে বলে আমি ভাল লোক? 

--সবাই বলে, আমি শুনিচি। 

_ তুমি যখন বলচো বাবাঠাকুর, তখন ভালই হবে]। 

এই সময় আমার মাসতৃতে। ভাই ফিবে এসে আমায় ডাক দিল, তার সঙ্গে 
আমি বাডী চলে গেলাম। বাড়ী বাওয়ার আগে ওরা আমাকে তাল দিলে, শস) 
"দিলে, আবার আসতে বলে দিলে । 

পাগল ঠাকুরের সঙ্গে আমার এই প্রথম দেখার পরে প্রায় পাঁচ বছর কেটে 
গেল। মাসিমার বাড়ীর সেই গ্রামে আমাব যাওয়া! ঘটেনি এই পাচ 
বছরের মধ্যে। 

১৯১৩ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে প্রমোশন পেয়ে ইস্কলের ঝক্কি কিছুদিন এড়াবার 
জন্তে চলে গেলাম আবার মাসিমার বাড়ী । 

মাসিমা বল্লেন-_-এসো, এনে বাবা । বুড়ো মানীকে ভুলেই গেলে। থাক্‌ 
- থাক্‌--বেঁচে থাকো, দীর্ঘজীবী হও । 

আমার মনে আছে, ছু”একটা কথার পরে আমি বুড়ীকে জিগ্যেন করলাম - 
মাসিমা, সেই পাগল ঠাকুর আছে তো? 


পিদিমের নীচে ১৫১ 


মাসিমাকে বুড়ী বল্লাম বটে কিন্তু তিনি সত্যিকার বুড়ী এখনও ঠিক নন। 
যৌবনে তিনি স্থন্দরী ছিলেন। আমি যখনকার কথ! বল্চি তখন তিনি তত 
মোটা হন নি, বেশ দোহারা, সুঠাম চেহারা, ফস৭ রং, বড় বড় চোখ । মাথার 
চুল কেবল ছোট ক'রে ছেঁটেছিলেন বিধবা হওয়ার পর। দেহে জরার 
আক্রমণের কোনে! চিহু তখনো স্পষ্ট ওঠে নি। তার ওপর মাপিমা হিলেন 
গ্রাম্য জমিদারের ঘরের বধৃ। চাল চলনে একটা দেকেলে বনেদি ও ম্পর্শ-ভীরু 
ঈষৎ গর্বিত আভিজাত্য সদা-সর্ধদ] বর্তমান থাকতো। মাসিম৷ তাচ্ছিল্যের 
ব্বরে বল্েন_-কে? ও সেই পাগল ঠাকুর-হ্য» বেঁচে আছে। কেন, তার 
খোজে তোমার কি দরকার ? 

এখানে “তোমার কথাট।র প্রয়োগ বে বিরক্তিদ্থ5চক তা আমার বুঝতে দেরী 
হোল না। মাসিন। জযিদাঁবের বাড়ীর বৌ। তাঁর বোনপো যে তাদেরই 
গমের এক ছোট জাতের গুক্কর সঙ্গে মিশবে এটা তার ভাল লাগলো না। 
অবিশ্যি এটুকু 9 বল! উচিত যে, তারা নামেই তখন জখ্দার, কিছুই ছিল ন! 
তখন, সংসারে বিষম টানাটানি চলছিল, তাঁও জানতাম । নতুবা নন্দ জমিদারের 
ছেলে হয়ে কাটাদ”র হাট থেকে বেগুন বয়ে আনবে কেন ফি হাটে? 

মাসিমার প্রশ্নের জবাব দিলাম__আম!র কোনো দরকার নেই লেখানে। 
সেবার আলাপ হঘেছিল, তাই বেঁচে আছে কি না জানতে চাইচি। 

--বাচবে নাতো যাবে কোথায় ? 

-- মেলা হয়? 

- পাগল ঠাকুরের মেল'? কেন হবে না, যত বেটা বুনো বাগ্দির গুন্দেব, 
শুধু ব্যাটার৷ এসে পায়ের ধুলো নেয়, হৈ হল্লা করে। ঝাঁটামারে!! গুরু- 
গুরু! গুরু এমনি গাছের ফল কিনা! 

আমি কিন্তু বিকেলেই পাগলঠাকুরের বাড়ী গিয়ে হাজির। সেবারকার 
সেই প্রথম দর্শনের স্মৃতি আমার বালক-মনে একটি রহশ্তজনক স্থান অধিক'র 


১৫২ অসাধারণ 


করে আছে তখনও । আবার তাদের সেই হুখান। খড়ের ঘর, নিকোনো৷ পুছোনে। 
গোবর-লেপা উঠোন, ঝিডের-ফুল-ফোটা গঙ্গার তীরে অপরাহ শোভা কতকাল 
পরে দেখলুম। 

পাগল ঠাকুরের দাড়ি আরও শাদা! হয়ে নারদ মুনির মত দেখতে হয়েচে। 
তবে বার্ধক্যজনিত কোনো শীর্ণত্ব বা দৌর্বল্য নেই শরীরে । খুব শক্ত সমর্থ, 
লাঠি লাঠি চেহারা । মুখে সেই হাসি। এবার আর আমি নিতান্ত বালক 
নেই। অনেক জিনিস বুঝি। আগের ভয় আর নেই। 

বল্লাম-- তোমাকে বড় ভাল লেগেছিল সেবার--ণ্ডড মনে হোত তোমাকে 

হেসে বল্লে- গুরু-গোসণাইয়ের কপ! বাবাঠাকুর, তুমি ষে পতিতপাবন, 
পতিতকে উদ্ধার করতে আসবা ন1? 

_-ওসব কথা আমাষ বল্তে নেই। তুমি আমার নাম মনে রেখেচ যে 
দেখচি? 

-তুমি আমায় মনে বেখেছিলে, তাই আমিও তোম'র কথ! মনে 
রেখেছিলাম । আয়নায় মুখ যে বাবাঠাকুর। যেমন দেখাও তেমনি দেখি। 

_-একটা গান কর-_ 

ওকে আর দ্বিীর়বার খোসামোদ করতে হোল না। সেবারকাঁবের সেই 
বুদ্ধাকেও দেখলাম এবার। তাকে ডেকে বল্ে-স্একতারাটা গাও তো। 
পতিতপাবন ঠাকুরকে একটা গ।ন শোনাই-_কিন্তু বাবা, একটা কথা বলি? 

বলে সে হাসি-হাসি মুখে আমার দিকে জিজ্ঞান্ নেত্রে চাইলে । 

আমি বল্লাম--কি? 

ও একটা আলাভোলা, অসহায় ধরণের অনুরোধ যেন করচে, এমনি ভাবে 
বল্লে--আমি যেমন তোমায় গান শুনিয্বে গেলাম, তুমি পতিত উদ্ধার করতে 
এমনি ধার1 আসবা তো...বলি হ্যা গা? ও ঠ/কুর ?". 

নাঃ ও পাগলামি সুরু করেচে আবার । কাকে কি বলেযে! 


জে 


পিদিমের নীচে ১৫ 


পাগল ততক্ষণ একতার। বাজিয়ে গন সুরু করে দিয়েচে- 
ও আনার হদ্‌-কমলের পরম গুরু সাই, 
রেতে আলে! দিনে তার! রাঁত নাই দিন নাই। 
| তোমার সেথা বাশের ঝাড়ে 
অরূপ রূপের পাথার পাড়ে 
বাশের ফুলে ভুবন আলো! দেখতে এলাম তাই। 
চলার পথে বাদল দিনে তোমার সেই 
বাশতলাতে দিও ঠাই, 
ও আমার হৃদ্‌-কমলের গরম গুরু সই***: 
সেই ছেলেবেলার শোন! গ।নটা ।*.*ওর গান গাওয়ার ধরণটা আমার বেশ 
লাগে। চোখ উল্টে উদাস নেত্রে ওপর পানে চেয়ে_ সে ভাবই ভালাদা। গলা 
ভাল নর, ভাঙা গল!, দুটো বেসুরো স্থুর যেন গল! থেকে বেরিয়ে আসচে--তাই 
কি, চোখ দিয়ে যখন ওর দরদ্র জল নেমে এল, তখন আমাদের গ্রামের বিখ্যাত 
যাত্রার জুড়ি দাস্থ পরামাণিকের চেয়েও ওকে স্থকণ্ঠ বলে মনে হোল । 
আরও একটা, তারপর আর একটা | সারাটির চরে বিউেছুল ফুটেছিল 
সেবার, ঝিঙে ফুলের হলুদক্ষেত আর পাগল ঠাকুরের গানের 1ঢাপাটে স্থর 
একতাঁরে বাধা। ধূ ধু সরাটির চরে, নির্জন সরাটির চরে ঘুলি ঘুলি আধ অন্ধকারে 
কেউ ঝিঙের ফুল ফুটতে দেখেছিলে ত্রিশ বছর আগের এক ভাদ্র সন্ধ্যায়? তা 
হোলে পাগল ঠাকুরের গান বুঝতে পারবে । 
আমি এক মনে শুনচি। হঠাৎ গন থামিয়ে ও বলে_কি খাবা? 
--কিছু না। 
--সে বললে হবে কেন? আমারে পেরসাদ দেবে এখন কে? 
-আমি খেতে আসিনি তোমার কাছে । তোমাকে দেখতে এসেচি। 
পাচ বছর পরে এলাম । 


১৫৪ অসাধারণ 


পাগল ঠাকুর বিস্ময়ের স্থুরে বল্লে--পাঁচ বছর হয়ে গেল এরি মধ্যে? কি 
জানি, দিন রেতের হিসেব তো রাখিনে। হ্যা, তা তুমি অনেক বড় হয়ে 
গিয়েচ বাবাঠাকুর। তখন ছিলে এত বড়-_-ওগো শোনো 

সেই বুড়ী কাছে এসে বল্লে-_কি বলচো? খোকাবাবু কে? 

আমি বল্লাম-_-চিনতে পারলে না? সেই এসেছিল।ম পাঁচ বছর আগে? 
নন্দর মাসতুতো ভাই, আমার নাম পতিতপাবন। 

__বাবাঠাকুর, বড় খুশি হলাম তুমি এয়েচে। আর গোখে ঠাওর হয় না 
আগেকার মত। ভালো আছো? 

_ হ্যা, তা আছি। এখন ইস্কুলে পড়টি-এবার থার্ড ক্লাসে উঠেচি ফাস্ট 
হয়ে। 

_-তা হবে। তোমাদের সব ভালে! হোক, গুরু গোঁসাইযের দগ্নায় সব 
নিরুগী হয়ে থাকো। 

পাগল ঠাঁকুর বল্লে--ঘরে কিছু আছে? বাবাঠাকুরের সেবায় লাগাও । 

আমার দুর্বল প্রতিবাদ সত্বেও সেবা লাগানোর কাজে এল একটি পাকা 
পেঁপে । আমি খাঁচ্চি, ও হাত পেতে বালকের মত সরে অথচ নারদ মুনির মত 
দাড়ি নিযে আমার ঠাকুরদাদ্াার বয়পী লোক নিঃসস্কোচে বলে-ছ্যাও একখান] । 

দিলাম । যেন আমার সমবরসী খেলুড়ে । ক্ল্লাম-তোমার এখানে থাকতে 
ভালে। লাগে। 

পাগল ঠাকুর হেসে বল্পে-তোমাকেও যে আমার রাখতি ভাল লাগে। 
থাকব! এখানে ? 

-_ ইচ্ছে তো করে। বাড়ীর লোকে থাকতে দেবে না যে। 

পাগল ঠাকুর একটা মাটির পাত্র থেকে গুড় তুলে নিরে দাঁকাটা তামাক 
মাথলে বসে বসে । একটা কন্কে ভরে তামাক সেজে হাতে করেই টানতে 
লাগলো । নিজেই একট] হাড়ি চড়ালে উঠোনের এক উন্নে । 


পিদিমের নীচে ১৫৫ 


আমি বল্লাম- হাড়িতে কি হবে? 


- বাবাঠাকুর, খিদে পেরেছে, কিছু খাবে! | ছটে। চাল দিয়ে যাও গো-_- 

হাডিতে একখু'চিটাক মোটা বাঙা আউশ চাল ফেলে দ্রিরে একটু পবে বড 
বড় গোটকতক পাকা যজ্ভিডুমূর সামনের জঙ্গলের থেকে পেডে নিয়ে আঠা স্ুদ্ধই 
ফেললে হাডিতে। আবি বসে বসে ওর খাওয়ার মজা দেখচি। ও আবাব 
আমার পাশে এসে তামাক খেতে লাগলো । আমাৰ বল্লে-বাবাঠাকুব, ওপারের 
বুনোপাড1 উচ্ছন্নে গেল ওলাউঠোতে । রোজ সেখানে যাই, সারা্দন থাকি, 
এই খানিকটা আগে এইচি, তাই বড্ড খিদে পেয়েচে। 

--সেখানে কি কব? 

- আমি কি কিছু করি? ঠিনি-গুক-গোর্সাই কবান। যাদ্েব কেউ 
নেই, আমাৰ অকেছে| হাত দিঘে তিনি তাঁদেব মুখে জল দেন, ওচুদ দেন । 
আমার হাত ধন্য হয়ে গেল, আমাব হাত না নিয়ে অন্য কাবো হা নিলেই 
পাবতেন। তেনাব কৃপা । 


_ গুরু-গোরীই কে, আজ বলতে হবে । 


-_-ওই যে উনি--নিরাকাব, সব ঘটে আছেন যিনি । তাই ০ এমি আমার 
পতিতপাবন ঠাকুব। তুমিও যা, তিনিও তা-তোথার মধ্যেই তিনি । যাবা 
রুগী, ওলাউঠ্োয় বমি করচে, হলদে হয়ে গিয়েচে চোখের শিব, হাতে পাষে 
খিচুনি ধবেচে, গলা ঘডঘড করচে-_তাদেব মধ্যে জনা জনায় তিনি । তিনি উকি 
মারেন ওদের চোঁখেব মধ্যে থেকে | বেশ দেখতে পাই-_বমি ঘটি, ঘেন্র। আসে 
না, মনে হয় গুক-গোর্সাইযের সেবা করচি। খেলা, সব তার খেলা । তাঁর 
আবার রোগ! লীল]! 

--আমায় 'নয়ে যাবে বুনোপাড়ায়? তোমার সঙ্গে যাবো। 

-_ওরে বাবা রে! অমন কচি সুন্দর নতুন হাত বমি ঘাঁটবার জন্তে নয় 


১৫৩৬ অসাধারণ 


তার এখন দেরী আছে, ও সবের জন্তে তাড়াতাড়ি কি? পড়ো, এখন খুব মন 
দিয়ে পড়ো। 

একটু পরে ও ভাত নামালে। একটা আউট কলার পাতে ঢেলে 
ঘজ্জিডূমূরগুলে! টিপে টিপে হন তেল দিয়ে মাখলে । আমায় বল্লে_কিছু মনে 
কোরো না বাবাঠ।কুর, আমি খাই ? হুকুম করো-__ 

আমার অনুমতির প্রয়োজন কি, বুঝলাম না। তবু বল্লাম-__বারে, খাও, 
আমি কি বলবো? খাও-_শুধু ডুমুর ভাতে ভাত খেতে পারবে ? 

-কেন পারবো না, বাবাঠাকুর । একটা যা হয় হোলেই হোল। জিবের 
স্থুখ যত বাড়াবে, ততই বাড়ে। ওর মধ্যে কিছু নেই। কে হাট-বাজারে ছোটে 
ভুটো খাওয়ার জন্তে ? জঙ্গলে গুরু-গোরণাই সব করে রেখেচেন। ডুমুর আছে, 
তেশ্সাকুচে' ফল আছে-_ 

আমি আশ্চর্ধ্য হবে বল্লাম- তেলাকুচো ? 

_হ্যা ঝবাঠাকুর, তেলাকূচো ভাতে খাও, ভাজা খাও, তেল।কুচোর পাতা 
ভ!জ! খাও--দিব্বি জিনিস । পেয়ারা ভাতে ভাত খেবে একমাস কাটিগ্ে দিই। 
উঠোনে ওই ছ্যাখে পেয়র। গাছ । পেরারা হয়নি, তাহলে তোমায় দিতাম। 
কেন যাবো বলো হাটে-বাজাবে ? 

- তোমার উঠোনে তরি-তরকারি কর ন। কেন ? 

_বড্ড খাটতে হয় ওর পেছনে । ঝঞ্ধাট। কে অত ঝঞ্চাট করে? সে 
সময়টা গুরু-গোসাইয়ের নাম নিলে কাজ হবে। ওই শনংর গাছ করা হয় শুধু 
গুন গোসাইয়ের সেবার জন্তে। 

পাগলঠাকুর খেয়ে উঠে এঁটো পাতা ফেলে দিলে । রাজ্যির কুকুর জড়ো 
হয়েছিল আগে থেকে, পাতের অনেকগুলে। ভাত ওদের সামনে ছড়িয়ে দিলে । 

আবার তামাক সাজতে বনলে!। তামাক খেতে খেতে বুড়ীকে বল্পে-- 
পাকাটি গাও গোটাকতক, একটা মশল করি । 


পিদিমের নীচে ১৫৭ 


আমি বল্লাম__কি হবে? 

--এখুনি আবার বুনোপাডায় যেতে হচ্চে। দ্টো রুগী এডিমে আছে, 
দেখে এসেচি । তাদের ফেলে থাকতে পারবো না। নবীন ডাক্তারকে বলে 
এসেচি যাবার জন্তে ৷ এখন গুক-গেসাইয়ের কপ] হোলে মেরে উঠতে পারে। 
আর তিনি যদি চরণে টানেন--তবে হয়েই গেল__আহা-হা ! 

ওর চোখে প্রায় জল এসে পড়লো । অ।মার হঠাৎ ব্ড উদ্বেগ হেল ওর 
জন্যে । ও ধেন আমাব আত্মীবকত কালেব। আম দািযে উঠে বগ্কাম 
তুমি যেও না সেখানে । যদ্দি তোম'র হয়? বক্ড খারাপ বোগ-_ 

পাগল ঠাকুর হেসে বল্পে__-ওই ছ্য/খো, বাবাঠাকুরের কথা-তার নিদে সব। 
তীর যদি ইচ্ছে হঘ এই খোলসট]1 বদলাবো, ভবে তাই ভবে। তিনি যেখানে 
নিয়ে |াচ্চেন, সেথানে যেতেই হবে। আমি তো বাচ্চি নে, তিনি নিয়ে যাচ্ছেন 
_-তাই যাচ্চি। আমি কেউ নই। 

একট? অদ্ভুত ভাব ওর মুখে ফুটে উঠলো কথা কটা বলবার সমব। বুডী 
বলে-রাত্তিরে ফেরবা তো? 

ও বল্ে--তা বশা যার ন।। তুমি ঝাপ খুলে রেখো, আমি তে' ঝাপ খুলে 
ঢুকবৌ। চলে। বাবাঠাকুর, সন্দে হয়েচে, তোমার পৌছে দিয়ে ওহ পথে *চলে 
যাই । 

আমি বল্লাম আমায় এগিরে দিতে হবে না, একাই যেতে পারবো, কারণ 
মাসিমা টের পেস্ে যাবেন যে আমি এতন্গণ কোথায় :ছিলাম। তিনি পছন্দ 
করবেন না জআামাব এখানে আসা যাওয়াটা । মনে মনে তা আমি জানি। 
ক্তরাং কথবেলতল! িগ়্ে একাই বাডী চলে গেলুম। মাসিমাকে পাগল 
ঠাকুরের কথা কিছু বলিনি । তিনি নিজেই জিগ্যেস করলেন--ওদিকে গিইছিলি 
নাকি? 

-.কোন্‌ দিকে? 


১৫৮ অসাধারণ 


--পাগল ঠাকুরের আখড়ায়? 

--ই্যা। একটু বসেছিলাম। বেশ ভালো লোক। কোথায় কলেরা 
হয়েছে, নিজে গিরে তাদ্দের সেবা করচে র।ত্তির বেঙ্গাতে । 

- হু” | 

এঁ পথ্যন্ত। উনি চুপ করে গেলেন, বুঝলুম না রাগ করলেন কিনা। 

তার পরদিন আবার বিকেলে পাগলের আখড়ায় গিয়ে হাজির হই । কিসের 
একট] টান অনুভব করলাম, না গিয়ে থাকা গেল না । 

পাগল ঠাকুর আপন মনে বসে গান করছিল একখান! তালপাতার চেটাই 
পেতে। ওর গানই ওর উপাসনা, ওর মুখে গান শুনলেই আমার তা মনে 
হয়েচে। আমার বয়েস কম হোলেও আমি তখন অনেক বুঝি। ওর মত 
ভক্তি আমি কারো দেখিনি । মাসিমাকে বাড়ী ফিরে কথাটা আম বলেছিলাম । 
মাসিম। গীতা নিয়মিত পাঠ করতেন ১ রামায়ণ মহাভারত তার বড় প্রির ছিল, 
ব্রত উপবাস করতেন, রোজ ভোরে গঙ্গান্নান করে পুজো-আচ্চা করতেন বেলা 
নণ্টা পধ্যন্ত। কৃষ্ণ ঠাকুরের ছবিতে চন্দন মাখাতেন, ফুল দিতেন। পাগল 
ঠাকুর ওসব কিছু করে না অথচ সে ভক্ত লোক, এ কথা মাপিম| বুঝাবেন না। 
তবুও মালিম! মন দ্রির়ে কথাটা শুনলেন, শুনে চুপ করলেন । 

পাগল ঠাকুরকে বললাম-_-কখন এলে কাল রাত্তিরে ? 

স্সারা রাত ছিল।ম বাবাঠাকুর। ছুটোই মারা গেল, শ্মশানে গেলাম 
তাদের ভাসিয়ে দ্রিতে । 

--পোড়ালে না? 

_-গরীব লোকদের পোঁড়াচ্চে কে বাবাঠাকুর ! কাঠকুটো কোথায়? 
গুরুগোর্পাইয়ের নামে গঙ্গার বুকে ভাসিরে দ্িলাম---আর ভাবনা কিসের? 
দেহটা হাঙ্গর কুমীরে খেলেও দেহ দিয়ে জীবের উপকার হোল। পুড়িয়ে দিয়ে 
ফল কি, বলো? ওদের একট! ছেলেকে নিয়ে এলাম আমার এখানে । ওই 


পিদিমের নীচে ১৫৯ 


গ্যাখো, কাঠ কুড়িয়ে আনচে, ছোট ৮ছলে, কেউ নেই -গুরুগোসাই তাই আমার 
ঘাড়েই চাপালেন। তার হুকুম । 


ও এমনভাবে কথ! বল্‌চে যেন ভগবান ওর সঙ্গে পরামর্শ করেন সব কথ 
আমার হাসি পেল। যা হোক, ওর মন ভারি সরল। 


আমাকে ওই পাগল ঠাকুর ভয়ানক বেঁধেচে, ক্রমে বুঝচি। বিকেল হোলে 
আসতেই হবে যেন ওর এখানে । ও আমাকে কিছু খেতে দেবে, তারপর গান 
শোনাবে । কোন বৈষয়িক কথা ওর মুখে শুনিনি । অনেক পরে বয়েল হোলে 
এ সব ভালো করে বুঝেছিলাম । 


আমি বল্লাম-তুমি মাছ ধর? 

__না, বাবাঠাকুর । 

--তোমার বাড়ী কোথার ছিল? 

অন্য লোক হোলে এ কথার উত্তর দেয় না। কিন্তু পাগল ঠাকুরের মত সরল 
লোকের কোন কিছুই গোপনীয় নেই। সে বল্পে-শস্করপুর। ক'চড়াপাড়ার 
ওদিকে, এখান থেকে আট ন” কোশ। 

_বাড়ী-ঘর আছে সেখানে? 

-কিছু নেই। আমরা গরীব লোক, খড়ের কুঁড়ে ছিল, ভেঙে গিয়েছে, 
ভিটেতে কিছু নেই-মস্ত এক তালগাছ হয়ে আছে, সেবার দেখে এসেছিলাম । 

- আপনার জন কেউ নেই? 


_-এই যে বাবাঠাকুর, ভূল কথা বলে। আপনার জন নেই কেন, এই 
তুমিই তো! আমার আপনার জন। গুরু-গোসাই সবাইকে আপন করে দিয়েছেন 
যে! ক'দিন থাকবা? 

--আর ছুদিন ছুটি আছে মোট । 

--মোটে ছদিন? তারপর চলে যাব? দুগখু দিতে আসা কেন বলো 


১৬০ অসাধারণ 


তো। তুমি চলে গেলে আমার বড্ড কষ্ট হবে দিন কতক। বিকেলট!] কাটবে 
ন।। গুরুগোসাইযের ইচ্ছে 1," 

বলে সে দীর্ঘশ্বাস ফেললে । নেই মুহূর্তে ও আমার বড় কাছে এসে পড়লো, 
আর দূরের লোৌক রইল না। 

বাকি দুদিনও রোজ বিকেলে ওখানে যাই। বুনোদের সেই ছোট ছেলে 
এবই এ হযে গিয়েচে। নে দেখি রান্নাঘরে আউশ চালের পান্ত ভাত 
আর বেগুন পোড়া আপনিই হাড়ি থেকে বেডে নিচ্চে দিব্যি। নিজের ঘরের 
মত। 

পাগল ঠাকুর আমায় নিয়ে ছোট ঘরের দাওয়ায় বসে আর গান করে। 
একতারা বাজিয়ে ওর বেস্থুরে! গলা যখন গান করে, তখন প্রতিদিন এই গঙ্গার 
চরে যেন কোন বিরাট দেবের আবির্ভাব গুত্যক্ষ করি**গদিকে বিষুপুর গ্রামের 
বাশবন, দোষপাডার বাবুদের লিচুবাগান_-সব কেমন অদ্ভুত মনে হয়, সরাটির 
চরের কাশবনের পেছনে মস্ত আকাশ9৷ লাল হয়ে ওঠে অন্ত-হুধ্যের আভায়। 

আমার অল্প বয়েস বলেই হোক বা যে জন্েই হোক, কি অদ্ভুত টান ষে হয়ে 
উঠেছিল পাগল "ঠাকুরের ওপর ! এখন মনে ভাবলে আশ্চর্য্য হই। বাল্যের 
সে কটি দিনের আনন্দ আর ফিরে পাবো না, তেমন ধরণের আনন্দও আর 
পাইনি কখনে।। 

প/গল ঠাকুর গান থামিয়ে একতারা নামিয়ে রেখে একগাল হেসে বলে_ 
আনন্দ করো, আনন্দ করে! আনন্দ করবার জন্তেই এই একপাশে পড়ে আছি । 
গুরু-গোর্সাইয়ের দয়ায় শুধু আনন্দ নিযে আছি। 

ওর হাসিভরা উজ্জল চোখ ছু'টি-আর নারদের মত সাদ দাড়ি, শিশুর মত 
সরল মুখ ওর কথার সত্যত! সপ্রমাণ করতে)-*সেই আনন্দ ছোয়াচে রোগের মত 
পেয়ে বসতো সবাইকে, যে ওর সংস্পর্শে আসতো । 

এর একটা উদাহরণ মধ্যে একদিন প্রত্যক্ষ করলাম । কোথা থেকে একদল 


পিদিমের নীচে ১৬১ 


মেয়ে-পুরুষ ওর ওখানে এল। বৌঁচকা ঝুঁচকি এক একটা পিঠে বাধা । 
শুনলাম ওর] পাগল ঠাকুরের শিষ্/। ওই যে মাসিমা বলেন, ছোট 
জেতের গুরু । 

কিন্তু গুরুর মত সম্ত্রমস্থচক ব্যবহার করে ওর! দূরে রইল ন1। সবাই 
একসঙ্গে বসে তামাক খেলে হাতে হতে কন্ধে পরিবেষণ করে । পাগল 
ঠাকুরের চারদিকে গোল হয়ে ধসে একতারা বাজিরে গান করলে, হাসিখুশি, 
আনন্দ, খাওয়! দাওম়।। ওদের মুখ দেখে মনে হোল জীবনে ওদের কোন 
ছঃখকষ্ট নেই। খাওয়া দওয়া তো ভারি, প।গল ঠাকুরের ভাণ্ডার কারো আপন 
নয়, যার খুশি নিজের হাতে চাল বার করে নিচ্ছে, বুনোপাড়া থেকে দুটো রাঙা 
শাকের ডাটা নিয়ে এল, ডুমুর পাড়লে- চড়ালে ভাত, নূন ছড়িয়ে সবাই আউট 
কলার পাতায় ভাত ঢেলে এক সঙ্গে খেলে, গুরুও বাদ গেলেন না। দিনট! 
আনন্দ করে সন্ধ্যের দিকে সবাই বেঁ চক। বুচকি নিয়ে চলে গেল। 

আমিও চলে এলাম তাঁর পরের দিন। 


এরপরে আব'র পে গ্রামে যাই যেবার ম্যাট্রিক পাঁস দিয়ে কলে, টুকেচি। 
***মাসিমা আগের চেয়ে বৃদ্ধা হয়ে পড়েচেন, চোখে ভাল দেখতে পান ন]। 

বল(ম--পাঁগল ঠাকুর বেচে আছে? 

মসিমা বলেন-_আছে না তো যাবে কোথায়? তোমার বুঝি সেখানে 
যাওয়া! চাইই--আহা-হা, কি ঘে দেখেচ ওর মধ্যে তুমি! ছেলেবেলা থেকে 
দেখে আসচি এই কাণ্ড-- 

পাগল ঠাকুরকে অন্য চোখে দেখলাম। সেই ছোট খড়ের ঘরের আশ্রম, 
সেই সদানন্দ সাদা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ, সব তেমনি আছে । চার বছর আগের মত 
চেহারাই আছে, বিশেষ কোনো পরিবর্তন নেই। আমাকে দেখে বল্লে-_ 
বাবাঠাকুর যে! আরে, এসো, এসো, তোমর কথা কত বলি। কবে এলে? 

১১ 


১৬২ অসাধারণ 


--আজই। তুমি ভাল আছ? 

__গুরু-গোপাইয়ের কৃপায় আছি ভালোই । বসো, গান শোনব1? 

--গান শোনবার জন্তেই তো৷ আসা । 

--শসা খাবা না ছেলেবেলাকাব মত ? 

না, শোনো, এখন আর ছেলেমান্গৰ নই। তুমি যা খুশি খেতে দিতে 
পারো, ভাত পর্য্যস্ত। ছেলেমান্ঘ নই আর, কারো এম্তজারির মধ্যে নেই 
এখন | তোমার এখানে খাবো» তাতে দোষ কি? রাধো না তেমনি ডূমুব 
ভাতে ভাত? 

পাগল ঠাকুর ভযেব ভাণ কবে হেসে বলে__ও বাবারে, বাওনের জাত মেরে 
দিই এই সন্দেবেলা। তা হবে না_আব কি খাবা বলো? ওগো শোণে। 
ইদিকে--এঁকে চেনো ? সেই যে-- 

বুড়ী কুঁজো হয়ে পডেচে আরও, চোখেও ভাল দেখে না মনে হোল। কাছে 
এসে বল্পে- কে? 

_ওই সেই €ষ ভূপেন বাবুদের বাডীব ছেলেটি কতব্ড হয়েচে আব কি 
চমৎকার দেখতে হয়েচে গ্/খো | শোনো, ছুটে চাল আব কাটাল বীচি ভাজা 
ভেজে নিয়ে এসো তো» খেতে দিই। চা খাও বাবাঠাকুর? চা করে দিতে 
পারি। একজন এখানে চা রেখে গিয়েচে, সে মাঝে মাঝে এসে চা খায। 
থাবে? 

_করো। 

চ1 করতে গিয়ে ওরা ছু'জনে বিষম বিপদে পড়লো | বুডো-বুডী নান৷ 
পরামর্শ করে, একবার জল ফোটায়, আবাব নামায়--আধঘণ্ট। হয়ে গেল, 
রাম়্াথঘর থেকে বেরোয় না। কাসাব ঘটাতে গবম জল আর চা একসাথে গুড় 
সহযোগে সিদ্ধ করে অবশেষে এক ব্যাপার করে নিষে এল, সবাই মিলে অর্থাৎ 
তিনজনেই মহা আলন্দে তাই পান করা গেল। 


পিদ্িমের নীচে ১৬৩ 


তারপর তামাক সাঁজতে সাজতে বলে_-এইবায় কি খবর বলে! বাঁবাঠাকুর-_ 

-- তোমায় দেখতে এলাম । 

- আমায়কি আর দেখতে আসবা? ভালোবাসো তাই; নইলে আমি 
কি একটা দেখবার মতো! লোক ? 

- জানো, তোমাকে একজন দার্শনিক বলে মনে হয়? 

সে কি বাবাঠাকুর? 

_-আমার মনে হয় তুমি একজন দাঁশশিক। সত্যিকার দর্শনিক-_খষির 
মত লোক। তোমাকে লোকে চেনে না। 

--ওসব কথা আমায় বলো না। আমাকে ঠিনি পায়ের দাস করে 
রেখেচেন। তার দরা। আমার কেন গুণ নেই, বাবাঠাকুর। আনন 
রেখেচেন, আনন্দে আছি । গান শোনো-__ 

আমার চোখ অনেকটা খুলেচে আগেকার চেয়ে। বৃদ্ধের সরল পবিত্র মুখভাব 
আর সহজ আনন্দ ওকে আমার চোঁখে খষের পদবীতে উঠিয়ে দিয়েচে। 

প|গল ঠাকুর যদি খষি নয় তবে খ্ষ কে? লেখাপড়া জানলে, আর ছু'(তিন 
হাজার বছর আগেকার ভারতবর্ষের লোক হে।লে এই লোকে: ১পনিষদ রচনা 
করতো--সরাটির চরের মত উদার হোত তার বাণী, ঝিডে ফুলের সৌন্দর্য্য 
থাকতো৷ তার ভাষায়, সন্ধ্যের সকালে বাশবনের পক্ষীকৃজনের মত শান্ত সহজ 
আনন্দ মিশিয়ে থাকতো তার অঙ্গে অঙ্গে। 

কিন্তু একে কেউ চিনলে না। 

আমার সারা জীবন ওর দত্ত মহজ আনন্দের মন্ত্রে দীক্ষিত। যেবার বিবাহ 
করি, মাসিমাকে নববধূ দেখাতে গিয়েহিলাম গুদের গ্রামে, ভেবেছিলাম পাগল 
ঠাকুরের ওখানেও নিয়ে যাবো, আসল উদ্দেশ্য ছিল সেটাই-_কিন্ত পাগল ঠাকুরকে 
আর দেখতে পাইনি । 

সেও এক বিকেলে গেলাম ওর আখরাতে। বাবল! গাছের তলায় ওর 


১৬3 অসাধারণ 


সমাধি। ওদের সম্প্রদার়ে নাকি সমাধি দেওয়াই নিয়ম। মাটির একট। লম্বা 
টিবি, বাবলাফুন ঝরে ঝরে পড়েচে তার ওপর । কোনো শিষ্য কতকগুলো 
দোপাটি ফুলের গাছ রোপণ করে দিয়েচে মাটির টিবিটার চরিপাশে-_-পাগল 
ঠাকুরের নশ্বরদেহের হাড় কণ্থানা ওরই তলায় মাটি মুড়ি দিয়ে আছে। 

ওকে এখানকার কেউ চিনলে না। আমার মাসিমা তো এত গীতা পাঠ 
করেন, মন্ত্র জপ করেন, তিনিই বলেন--হ্থ্যা বাপু, তোমার সেই পাগল ঠ।কুব 
আজ বছর ছুই হোল কি তিন হোল মারা গিষেচে। কে জানে, ওসব ছোট- 
লোকের খবর রাখিনে, রাখবার সময়ও পাইনে-__সেই বুডী কেবল বেঁচে আছে 
আজও । তাকে সন্ধ্যের পিদিম জাঁলতে দেখলাম সমাধির সামনে । রেডির 
তেলের মাটির পিদিম। খড়ের ঘবেব খড উড়ে পড়চে। আখড়ার অবস্থ। অতি 
খারাপ, কারো দৃষ্টি নেই এদিকে মনে হোল। সংসারে এমনিই হয়।